মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘শান্তি পরিষদ’ যখন আলোচনার তোড়জোড় চালাচ্ছে, ঠিক তখনই ইসরাইলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবির এক মন্তব্য এই অঞ্চলে আগুনের স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে দিয়েছে। হাকাবি ইঙ্গিত দিয়েছেন, নীল নদ থেকে দজলা-ফোরাত নদী পর্যন্ত বিস্তৃত মধ্যপ্রাচ্যের বিশাল ভূখণ্ড ইসরাইল দখল করে নিলে তাতে তাঁর কোনো আপত্তি নেই।
রাষ্ট্রদূতের এমন মন্তব্যকে ‘উগ্রপন্থী’ এবং ‘আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন’ হিসেবে অভিহিত করেছে আরব বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলো।
সাবেক ফক্স নিউজ উপস্থাপক টাকার কার্লসনের সঙ্গে শুক্রবার প্রচারিত এক পডকাস্ট সাক্ষাৎকারে হাকাবি এই মন্তব্য করেন। কার্লসন যখন তাঁকে বাইবেলে উল্লিখিত ‘প্রতিশ্রুত ভূমির’ সীমানা এবং বর্তমান ইসরাইল রাষ্ট্রের সেই দাবি করার অধিকার নিয়ে প্রশ্ন করেন, তখন হাকাবি সরাসরি উত্তর দেন, ইসরাইল যদি এর পুরোটা (ভূখণ্ড) দখল করে নেয়, তবে তাতে কোনো সমস্যা নেই।
হাকাবির বর্ণনা অনুযায়ী এই সীমানার মধ্যে বর্তমান লেবানন, সিরিয়া, জর্ডান এবং সৌদি আরবের একটি বড় অংশ অন্তর্ভুক্ত হয়। কার্লসন যখন পুনরায় জানতে চান যে তিনি সত্যিই পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণ সমর্থন করেন কি না, তখন হাকাবি সুর কিছুটা নরম করে নিজের বক্তব্যকে ‘অত্যুক্তি’ হিসেবে অভিহিত করেন। তবে তিনি যোগ করেন, যুদ্ধের মাধ্যমে যদি ইসরাইল এই ভূমি দখল করে নেয়, তবে সেটি ভিন্ন আলোচনার বিষয় হতে পারে।
হাকাবির এই মন্তব্যের পরপরই মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে নিন্দার ঝড় উঠেছে। সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই বক্তব্যকে ‘অগ্রহণযোগ্য উগ্র আস্ফালন’ হিসেবে বর্ণনা করে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের কাছে এর স্পষ্ট ব্যাখ্যা দাবি করেছে। ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা এবং আরব লীগ এই বক্তব্যকে সাম্প্রদায়িক ও জাতীয়তাবাদী আবেগ উসকে দেওয়ার একটি হীন প্রচেষ্টা হিসেবে নিন্দা জানিয়েছে।
মিশরের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক আইনের সরাসরি লঙ্ঘন এবং ফিলিস্তিনসহ কোনো আরব ভূমির ওপরই ইসরাইলের সার্বভৌমত্ব নেই। জর্ডান একে ‘উদ্ভট ও উস্কানিমূলক’ আখ্যা দিয়ে বলেছে, এটি সরাসরি সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত।
নিজেকে ‘খ্রিস্টান জায়নিস্ট’ হিসেবে পরিচয় দেয়া মাইক হাকাবি দীর্ঘকাল ধরে ফিলিস্তিনিদের আলাদা রাষ্ট্রের ধারণার বিরোধিতা করে আসছেন। ২০০৮ সালে তিনি ফিলিস্তিনিদের আলাদা জাতিসত্তার অস্তিত্ব নিয়েই প্রশ্ন তুলেছিলেন। ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক আদালত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলের দখলদারিত্বকে অবৈধ ঘোষণা করলেও হাকাবি তা মানতে নারাজ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, হাকাবির এই মন্তব্য প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুসহ কট্টরপন্থী ইসরাইলি রাজনীতিকদের ‘বৃহত্তর ইসরাইল’ গঠনের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকেই উসকে দিচ্ছে। গোলান মালভূমি দখল থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক লেবানন যুদ্ধের পর দেশটির ভেতরে পাঁচটি সামরিক চৌকি স্থাপন, ইসরাইলের এমন সব আগ্রাসনের মাঝেই মার্কিন রাষ্ট্রদূতের এই উস্কানিমূলক বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুললো।