ইরানের সাথে যুদ্ধের ১৭তম দিনে পদার্পণ করার সাথে সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল তাদের হামলা অব্যাহত রেখেছে। ইরানও এর পাল্টা জবাবে ইসরাইলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের বিশাল বহর ছুড়েছে এবং প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলোতে আক্রমণ চালিয়েছে।
২০২৫ সালের জুনের হামলার সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে, সেগুলো ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতাকে খর্ব করেছে। কিন্তু বর্তমান সংঘাত সেই তুলনায় অনেক বেশি ভয়াবহ; এটি ইতিমধ্যে অন্তত এক ডজন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। এর ফলে বিশ্বের প্রধান তেল ধমনী 'হরমুজ প্রণালী' বন্ধ হয়ে গেছে এবং এই অঞ্চলে ২,৩০০-এরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। আল জাজিরা গত ১৬ দিনের ঘটনাবলি বিশ্লেষণ করে একটি চিত্র তুলে ধরেছে:
হামলা কোথায় কোথায় হয়েছে?
স্বতন্ত্র সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা 'অ্যাকলেড' ইরানের ৩১টি প্রদেশের মধ্যে অন্তত ২৯টিতে প্রায় ২,০০০টি আলাদা ঘটনা নথিবদ্ধ করেছে, যার মধ্যে তেহরান সবচেয়ে ভারী বোমাবর্ষণের শিকার হয়েছে। প্রতিটি ঘটনার পেছনে একাধিক আক্রমণ থাকতে পারে, যাতে বিমান ও ড্রোন হামলা, কামানের গোলাবর্ষণ, ক্ষেপণাস্ত্র এবং আইইডিসহ বিভিন্ন ধরণের অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে।
লক্ষ্যবস্তু কী ছিল?
মার্কিন ও ইসরাইলি হামলায় মূলত ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামো, পারমাণবিক এবং সামরিক সাইটগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এছাড়া তেহরানের তেল ডিপোসহ ইরানের জ্বালানি স্থাপনা এবং তেল রপ্তানির গুরুত্বপূর্ণ বন্দর 'খার্গ দ্বীপ'-এর সামরিক অবস্থানেও আঘাত হানা হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, অন্তত ১৮টি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলা চালানো হয়েছে। ইরান জানিয়েছে, বেশ কিছু স্কুল ও আবাসিক এলাকা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব ইরানের মিনাব শহরে সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাণহানির ঘটনা ঘটে, যেখানে একটি প্রাথমিক বালিকা বিদ্যালয়ে হামলায় ১৭০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়, যাদের অধিকাংশই ছিল স্কুলছাত্রী।
ইরানও এর পাল্টা জবাবে ইসরাইলের বিভিন্ন স্থানসহ ছয়টি উপসাগরীয় রাষ্ট্রের তেল শোধনাগার, মার্কিন সামরিক ঘাঁটি, বিমানবন্দর এবং বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়েছে। ইরান মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত সব মার্কিন আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য কোম্পানিগুলোকে তাদের বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে ঘোষণা করেছে।
ইসরাইল একইসাথে দক্ষিণ লেবানন এবং রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণ শহরতলিতেও আক্রমণ করেছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর জোরপূর্বক উচ্ছেদের নির্দেশে প্রায় ১০ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে। এদিকে, গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি বোমাবর্ষণ অব্যাহত রয়েছে এবং ১০ অক্টোবরের যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করে সব সীমান্ত বন্ধ করে ত্রাণ সরবরাহ আটকে দেওয়া হয়েছে।
কী ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে?
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে আকাশ ও সমুদ্র থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য উন্নত মারণাস্ত্রের বিশাল বহর ব্যবহার করছে। যুক্তরাষ্ট্র মূলত মধ্য ও দক্ষিণ ইরানকে লক্ষ্য করার জন্য দূরপাল্লার অস্ত্রের ওপর নির্ভর করছে, আর ইসরাইল মার্কিন প্রযুক্তিতে তৈরি উন্নত যুদ্ধবিমানের মাধ্যমে উত্তর ইরানে মনোযোগ দিয়েছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, তারা বিমান, সমুদ্র ও স্থলভাগ থেকে ২০টিরও বেশি স্বতন্ত্র অস্ত্র ব্যবস্থা ব্যবহার করেছে। এর মধ্যে রয়েছে আরব সাগরে নৌবাহিনীর ডেস্ট্রয়ার থেকে ছোড়া টমাহক ক্রুজ মিসাইল। এছাড়া প্রথমবারের মতো 'প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইল' এবং ইরানের শাহেদ ড্রোনের আদলে তৈরি 'লুকাস' ড্রোন মোতায়েন করা হয়েছে। এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন এবং এফ-১৮ ও এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানও নিয়মিত ব্যবহৃত হচ্ছে।
আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র নিচু দিয়ে উড়ে আসা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলায় 'প্যাট্রিয়ট' এবং উঁচুতে ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে 'থাড' সিস্টেম ব্যবহার করছে। ইসরাইল 'আয়রন ডোম' এবং 'ডেভিডস স্লিং' ব্যবহার করে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করছে।
অন্যদিকে, ইরান স্বল্প ও মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং আত্মঘাতী ড্রোনের ত্রিমুখী সমন্বয় ব্যবহার করছে। ইরানের তৈরি সস্তা 'শাহেদ' ড্রোনগুলো রাডার ফাঁকি দিয়ে নিচু স্তর দিয়ে উড়তে পারে বলে তা মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া ইরান 'শাহাব-৩' এর মতো মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে, যা ১,৯০০ কিলোমিটারেরও বেশি দূরে আঘাত হানতে সক্ষম এবং যা ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলায় ব্যবহৃত হচ্ছে।