ইসলামাবাদে শনিবার শুরু হওয়া আমেরিকা ও ইরানের ঐতিহাসিক শান্তি আলোচনার মাঝেই ‘টক অব দ্য টাউন’ হয়ে দাঁড়িয়েছেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির। তবে, কোনো রণকৌশল নয়, বরং তাঁর পোশাক বদলের ‘কূটনীতি’ আর ক্ষমতার দাপট নিয়েই এখন মুখরোচক আলোচনা চলছে আন্তর্জাতিক মহলে। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফকে এক প্রকার আড়ালে ঠেলে দিয়ে যেভাবে আসিম মুনির লাইমলাইট কেড়ে নিয়েছেন, তাকে অনেকেই ‘এক ঢিলে তিন পাখি’ মারা হিসেবে দেখছেন।
শনিবার ইসলামাবাদের নূর খান বিমান ঘাঁটিতে যারা উপস্থিত ছিলেন, তারা শুধু কূটনীতি নয়, বরং এক সুপরিকল্পিত ‘ফ্যাশন শো’র সাক্ষী হলেন। তবে, এটি সাধারণ কোনো পোশাক বদল ছিল না, এটি ছিল জেনারেল আসিম মুনিরের এক চরম চতুর রাজনৈতিক চাল। ইরানের প্রতিনিধিদের সামনে তিনি হাজির হলেন রণাঙ্গনের ‘যোদ্ধা’ বেশে, আর কয়েক ঘণ্টা পরই মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্টের সামনে তিনি হয়ে গেলেন নিখুঁত এক ‘কূটনীতিক’।
ইরানের জন্য ‘কম্ব্যাট গিয়ার’: ৭১ সদস্যের বিশাল ইরানি প্রতিনিধি দলকে স্বাগত জানাতে যখন আসিম মুনির এলেন, তখন তাঁর পরনে ছিল ‘ক্যামোফ্লেজ কম্ব্যাট ড্রেস’ বা যুদ্ধের পোশাক। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি ইরানের জন্য একটি কড়া বার্তা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরান ও পাকিস্তানে যে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ও সীমান্ত উত্তেজনা চলেছে, মুনির যেন সেই স্মৃতিই মনে করিয়ে দিলেন। তিনি বোঝাতে চাইলেন, ইরানের সামনে তিনি একজন কঠোর সামরিক শাসক, যিনি প্রয়োজনে লড়তেও জানেন। প্রটোকল ভেঙে একজন সেনাপ্রধানের এই রণসাজে বিদেশি প্রতিনিধিদের বরণ করাকে অনেকেই ‘অশোভন’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
ভ্যান্সের জন্য ‘স্যুট-বুট’: ঠিক কয়েক ঘণ্টা পরেই যখন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে.ডি. ভ্যান্সের বিমান অবতরণ করল, আসিম মুনির ভোল পাল্টে ফেললেন। এবার আর ইউনিফর্ম নয়, তিনি হাজির হলেন দামী কালো স্যুট আর চকচকে বুট পরে। মজার ব্যাপার হলো, এর আগেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় মুনির স্যুট পরেছিলেন, যার ফলে ট্রাম্প তাঁকে রসিকতা করে ‘প্রিয় ফিল্ড মার্শাল’ বলে ডাকতেন। ভ্যান্সের সামনে স্যুট পরে তিনি এই বার্তাই দিলেন, তিনি শুধু একজন জেনারেল নন, বরং একজন আধুনিক ও প্রজ্ঞাবান রাষ্ট্রনায়ক, যার রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা আকাশচুম্বী।
শাহবাজ বনাম আসিম: এই পুরো আয়োজনে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের উপস্থিতি ছিল ম্লান। প্রটোকল অনুযায়ী বিদেশি শীর্ষ নেতাদের স্বাগত জানানোর কথা রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রীর। কিন্তু আসিম মুনির নিজেই রেড কার্পেটে হেঁটে ক্ষমতার কেন্দ্রে নিজের অবস্থান জানান দিলেন। সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইয়াহিয়া খান বা জেনারেল জিয়ার মতো একনায়কদের স্টাইলে মুনির বুঝিয়ে দিলেন যে, পাকিস্তানে বেসামরিক সরকার শুধু নামমাত্র, কলকাঠি নাড়ছেন তিনি নিজেই।
আমেরিকার চতুর জবাব: তবে পোড়খাওয়া মার্কিন কূটনীতিকরা এই নাটকীয়তা ঠিকই ধরতে পেরেছেন। জেডি ভ্যান্স যখন আসিম মুনিরের সঙ্গে হাসিমুখে হাত মেলাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই তিনি পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের পিঠ চাপড়ে এক চিলতে হাসি বিনিময় করেন। বিশ্লেষকদের মতে, ভ্যান্সের ওই ছোট ইশারাটি ছিল পাকিস্তানের বেসামরিক প্রশাসনের প্রতি মার্কিন সমর্থনের এক সূক্ষ্ম সংকেত।
দিনশেষে শান্তি আলোচনার ফলাফল যাই হোক না কেন, আসিম মুনির অন্তত নিজের লক্ষ্যে সফল। তিনি বিশ্বকে এবং দেশের মানুষকে স্পষ্ট বুঝিয়ে দিলেন, তিনি একাধারে যোদ্ধা এবং কূটনীতিক, আর এই মুহূর্তে পাকিস্তানের সবচাইতে ক্ষমতাধর ব্যক্তিটি তিনিই। তাঁর এই ‘ওয়ার্ডরোব ডিপ্লোম্যাসি’ বা পোশাক পাল্টানোর খেলাটি দীর্ঘকাল আন্তর্জাতিক রাজনীতির আলোচনার টেবিলে মসলাদার খোরাক হয়ে থাকবে।
তথ্যসূত্র: ইন্ডিয়া টুডে-পাকিস্তান অবজারভার