ইরানের নতুন প্রস্তাব, ওয়াশিংটনের সুর নরম!

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যৌথ বিমান হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ছয় সপ্তাহের যুদ্ধ শেষে বর্তমানে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চলছে। এই থমথমে পরিস্থিতির মাঝেই যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি নতুন শান্তি প্রস্তাব পাঠিয়েছে ইরান। দুই দেশের মধ্যকার একমাত্র মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের মাধ্যমে এই প্রস্তাব ওয়াশিংটনে পৌঁছানো হয়েছে।

ইরানের পাঠানো এই নতুন প্রস্তাবের বেশ কিছু শর্ত পূর্বের মতোই, যা ওয়াশিংটন আগেই প্রত্যাখ্যান করেছিল। তবে, সোমবার রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের এক শীর্ষ কর্মকর্তা দাবি করেছেন, বেশ কিছু বিষয়ে এবার মার্কিন অবস্থান আগের চেয়ে কিছুটা নরম হয়েছে।

ইসলামাবাদে নিয়োজিত পাকিস্তানের একটি কূটনৈতিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, গত মাসে একমাত্র দফার শান্তি আলোচনার পর থেকে তারা দুই পক্ষের মধ্যে দূত হিসেবে বার্তা আদান-প্রদান করছে এবং ইরানের সর্বশেষ প্রস্তাবটি ওয়াশিংটনের কাছে হস্তান্তর করেছে।

Strait of Hormuz 1
তবে আলোচনার অগ্রগতি বেশ কঠিন উল্লেখ করে ওই সূত্রটি জানায়, উভয় পক্ষই বারবার তাদের লক্ষ্য ও অবস্থান পরিবর্তন করছে। আমাদের হাতে কিন্তু বেশি সময় নেই।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই তেহরানের এই বার্তা পাকিস্তানের মাধ্যমে মার্কিন পক্ষে পাঠানোর বিষয়টি নিশ্চিত করলেও বিস্তারিত কিছু জানাননি। অন্যদিকে, ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা হয়নি।

ইরানি সূত্রগুলোর তথ্যমতে, এই প্রস্তাবের অনেক অংশই গত সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রত্যাখ্যান করা সেই প্রস্তাবের মতো, যেটিকে ট্রাম্প ‘আবর্জনা’ বলে অভিহিত করেছিলেন।

Iran Defence 04
নতুন প্রস্তাবে প্রধানত তিনটি বিষয়ে প্রথমে জোর দেয়া হয়েছে, যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধ করা, বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি সরবরাহ পথ ‘হরমুজ প্রণালী’ পুনরায় উন্মুক্ত করা এবং সামুদ্রিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মতো অতি সংবেদনশীল ও বিতর্কিত বিষয়গুলো আলোচনার পরবর্তী ধাপের জন্য স্থগিত রাখার প্রস্তাব করেছে তেহরান।

ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তার দাবি অনুযায়ী, ওয়াশিংটন এবার কিছুটা নমনীয় মনোভাব দেখিয়েছে। বিদেশি ব্যাংকে আটকে থাকা ইরানের মোট ফ্রিজড ফান্ডের চার ভাগের এক ভাগ (যার পরিমাণ প্রায় দশ বিলিয়ন ডলার) অবমুক্ত করতে সম্মত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে ইরান তাদের পুরো তহবিলই ফেরত চায়। এছাড়া আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার জরদারিতে ইরানের সীমিত ও শান্তিপূর্ণ পরমাণু কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও ওয়াশিংটন কিছুটা নমনীয়তা প্রদর্শন করেছে।


এরই মধ্যে ইরানের তাসনিম নিউজ এজেন্সির একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, আলোচনা চলার  সময়ে ইরানের ওপর থেকে তেল রপ্তানির নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে তুলে নিতে রাজি হয়েছে মার্কিন প্রশাসন। যদিও ইরানি কর্মকর্তারা এই প্রতিবেদনের বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি।

আমেরিকা ও ইসরাইলের বিমান হামলার পর শুরু হওয়া এই যুদ্ধবিরতি বর্তমানে অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় রয়েছে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় চলতে থাকা এই আলোচনা কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে এবং স্বয়ং ডোনাল্ড ট্রাম্প মন্তব্য করেছেন, এই যুদ্ধবিরতি এখন ‘লাইফ সাপোর্টে’ রয়েছে।

এর আগে ওয়াশিংটন স্পষ্ট জানিয়েছিল, ইরানকে তাদের পরমাণু কর্মসূচি সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে হবে, যে পথ দিয়ে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের এক-পঞ্চমাংশ সরবরাহ করা হয়। বিপরীতে ইরান দাবি করছে, যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ, ইরানি বন্দরগুলোর ওপর থেকে মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার এবং লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরাইলি হামলাসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে।


এই অচলাবস্থার মাঝেই গত সপ্তাহে নিজের সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ইরানকে চরম আলটিমেটাম দিয়েছেন ট্রাম্প। তিনি লেখেন, সময় ফুরিয়ে আসছে। তাদের (ইরান) দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত, খুব দ্রুত! অন্যথায় তাদের অস্তিত্বের কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। সময় অত্যন্ত মূল্যবান! মার্কিন সংবাদমাধ্যম এক্সিওস জানিয়েছে, সামরিক ব্যবস্থা পুনরায় চালুর বিষয়ে আলোচনা করতে মঙ্গলবার শীর্ষ জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের সাথে বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এমন সরাসরি ধ্বংসাত্মক হুমকির জবাবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই একটি টেলিভিশন সংবাদ সম্মেলনে কড়া প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। তিনি বলেন, তেহরান যেকোনো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত।

ট্রাম্পের হুমকির জবাবে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, তাদের হুমকির বিষয়ে আমাদের বার্তা হলো, প্রতিপক্ষের সামান্যতম ভুলেরও কীভাবে উপযুক্ত জবাব দিতে হয়, তা আমাদের খুব ভালো করেই জানা আছে। এ বিষয়ে আপনারা সম্পূর্ণ নিশ্চিত থাকতে পারেন।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স