ইরান যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে এক অভাবনীয় ও নাটকীয় মোড় নিলো মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শনিবার রাতে ধামাকা দিয়ে ঘোষণা করেছেন, মার্কিন-ইসরাইলি যৌথ জোট বনাম ইরানের মধ্যকার যুদ্ধ থামাতে একটি সমঝোতা স্মারক ‘প্রায় চূড়ান্ত’ হয়ে গেছে এবং খুব শিগগিরই এর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসছে। ট্রাম্পের এই আকস্মিক ঘোষণায় যেখানে হোয়াইট হাউসে উৎসবের আমেজ, ঠিক তখনই চরম উদ্বেগে ফুঁসছে তেল আবিব। ট্রাম্পের তথাকথিত এই ‘পিস ডিল’ বা শান্তি চুক্তিকে নিজেদের জন্য এক ‘বিশাল বিপদ’ হিসেবে দেখছে ইসরাইল।
শনিবার ট্রাম্প তাঁর নিজস্ব সোশ্যাল মিডিয়া ট্রুথ সোশ্যালে ওভাল অফিস থেকে পোস্ট করে জানান, মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশের নেতা ও মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে তাঁর অত্যন্ত ফলপ্রসূ কনফারেন্স কল হয়েছে। তিনি আরও দাবি করেন, ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গেও তাঁর ফোনে ‘চমৎকার’ কথা হয়েছে। এই চুক্তির অন্যতম বড় আকর্ষণ হলো, যুদ্ধের শুরু থেকে ইরানের অবরুদ্ধ করে রাখা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের প্রধান রুট ‘হরমুজ প্রণালী’ অবশেষে উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে।
ট্রাম্পের এই একতরফা বার্তার পর ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা- ফারন নিউজ অবশ্য দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালী ইরানের নিয়ন্ত্রণেই থাকবে এবং ট্রাম্পের ঘোষণা ‘অসম্পূর্ণ ও বাস্তবতাবিবর্জিত’।
তবে পর্দার আড়ালের খবর সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিন জন শীর্ষ ইরানি কর্মকর্তা নিউ ইয়র্ক টাইমস-কে নিশ্চিত করেছেন, তেহরান যুদ্ধ থামাতে এবং কোনো ধরনের টোল বা মাশুল ছাড়াই হরমুজ প্রণালী দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিতে রাজি হয়েছে। এর বিনিময়ে বিদেশে ফ্রিজ বা অবরুদ্ধ হয়ে থাকা ২৫ বিলিয়ন (২ হাজার ৫০০ কোটি) মার্কিন ডলারের বিশাল তহবিল ফেরত পাবে ইরান। একই সঙ্গে এই চুক্তির আওতায় লেবাননসহ সমস্ত ফ্রন্টে একযোগে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে।
মজার ব্যাপার হলো, এই চুক্তির প্রাথমিক খসড়ায় ইরানের বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচি এবং ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত ধ্বংস করার মতো আমেরিকার মূল ও কড়া শর্তগুলোর কোনো উল্লেখই নেই! এমনকি ইরানের ব্যালেস্টিক মিসাইল ইস্যুটিও আলোচনার টেবিলে তোলা হয়নি। ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, পারমাণবিক ফাইলটি এই চুক্তির অংশ নয়, এটি পরে আলাদাভাবে আলোচনা করা হবে।
এই বিষয়টি নিয়েই মূলত চটেছেন নেতানিয়াহু। ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম চ্যানেল ১২ অত্যন্ত ঝাঁঝালো মন্তব্য করে পুরো বিষয়টিকে খতিয়ে দেখে বলেছে, এই চুক্তিটি ইসরাইলের জন্য চরম বিপর্যয়কর। তাদের ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে নগদ টাকা (ক্যাশ) দিয়ে দিচ্ছে, আর ইরান তাদের শর্তপূরণের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে বাকিতে (ক্রেডিট), যা তারা আদৌ কোনোদিন শোধ করবে কি না তার কোনো গ্যারান্টি নেই।
এই আলোচনা প্রক্রিয়া থেকে ইসরাইলকে কার্যত একঘরে করে রাখা হয়। ট্রাম্প যখন শনিবার মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান ও কাতারের সঙ্গে হাই-প্রোফাইল কনফারেন্স কল করছিলেন, তখন নেতানিয়াহুকে সেই লাইনেই নেয়া হয়নি। ট্রাম্পের দূত স্টিভ উইটকফ এবং জামাতা জ্যারেড কুশনার এই চুক্তিটি করার জন্য ট্রাম্পের ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করেছিলেন, যাতে আমেরিকা নতুন করে আর যুদ্ধে না জড়ায়।
পাক ও কাতার সূত্রের খবর, আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই পাকিস্তানের তৈরি করা এই ১৪ দফার অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিটির ভাগ্য নির্ধারিত হতে যাচ্ছে। ট্রাম্প অবশ্য এক সাক্ষাৎকারে সাংবাদিকদের হুংকার দিয়ে রেখেছেন, যদি চুক্তি শেষ মুহূর্তে ভেস্তে যায়, তবে ইরান এমন বিধ্বংসী মার খাবে যা পৃথিবীর কোনো দেশ ইতিহাসে কখনো খায়নি। কিন্তু পর্দার আড়ালে ট্রাম্পের এই ‘নরম’ সমঝোতা নীতি নেতানিয়াহুর এতদিনের প্রকাশ্য হম্বিতম্বিকে এক নিমেষেই জলঘোলা করে দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, ট্রাম্পের এই ‘শর্টকাট শান্তি’ মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ থামায়, নাকি ইসরাইলকে চটিয়ে নতুন কোনো মার্কিন-ইসরাইলি কোন্দলের জন্ম দেয়!