ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতির আহ্বান ও হুঁশিয়ারিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে শুরু হয়ে গেছে রক্তক্ষয়ী ও বিধ্বংসী পাল্টাপাল্টি যুদ্ধ। সোমবার ইরানের কয়েকটি সামরিক অঞ্চলে ইসরাইলি বিমান বাহিনী ভয়াবহ হামলা চালানোর পর, ইসরাইলের বুক কাঁপিয়ে দ্বিতীয় দফায় ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়েছে তেহরান।
একই দিনে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরাও ইসরাইলি ভূখণ্ড লক্ষ্য করে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে চলমান এই যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে যে কোনো মুহূর্তে এক সর্বাত্মক আঞ্চলিক মহাযুদ্ধের আশঙ্কায় জরুরি বৈঠকে বসছে ইসরাইলের নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিশেষ মন্ত্রিসভা, যার নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
রোরববার রাতে ইসরাইলের বিভিন্ন জায়গায় প্রথম দফা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরান। তেহরানের দাবি, মার্কিন মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি হওয়ার পরেও ইসরাইল লেবাননে হিজবুল্লাহর ওপর হামলা অব্যাহত রাখায় তারা এই প্রতিশোধমূলক হামলা চালাতে বাধ্য হয়েছে।
এর জবাবে সোমবার ভোরে তেহরান ছাড়াও ইরানের তাবরিজ ও ইসফাহানসহ বিভিন্ন শহরের সামরিক ঘাঁটিতে দফায় দফায় বিমান হামলা চালায় ইসরাইলের প্রতিরক্ষা বাহিনী আইডিএফ। ইসরাইলি হামলায় ইরানের তিনটি অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ রাডার স্থাপনা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে বলে জানা গেছে। একই সাথে ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মাহশহরে অবস্থিত একটি বিশাল পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্সেও নিখুঁত হামলা চালিয়েছে আইডিএফ, যার ফলে কমপ্লেক্সের বিভিন্ন অংশে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলতে দেখা যায়।
ইসরাইলের এই আগ্রাসী জবাবের পর সোমবার বেলা বাড়তেই ইসরাইলের নেভাতিম এবং তেল নোফ বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে দ্বিতীয় দফায় শক্তিশালী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বর্ষণ করে তেহরান। ইরানের এই ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র বৃষ্টির কারণে নিরাপত্তার স্বার্থে জেরুজালেমে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের সমস্ত কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
এদিকে পাল্টা ইসরাইলি বিমান হামলার আশঙ্কায় তেহরান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বাইরে থেকে আসা সমস্ত যাত্রীবাহী ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। এছাড়া পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ইমাম খামেনি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সব ধরনের বিমান ওঠানামাও সম্পূর্ণ স্থগিত করা হয়েছে।
একই দিনে ইয়েমেন থেকে ইসরাইলের দিকে ধেয়ে আসা একটি বড় ক্ষেপণাস্ত্র আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার (এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম) মাধ্যমে মাঝ আকাশেই প্রতিহত করেছে তেল আবিব। অন্যদিকে, সৌদি আরবের আল-খারজ বিমানঘাঁটিতেও সোমবার বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে; তবে এই ঘটনার সাথে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে তেহরান।
এর আগে ইরান ইসরাইলে প্রথম দফা হামলা চালানোর পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরাইলকে পাল্টা হামলা না চালাতে এবং ইরানকে আর বাড়াবাড়ি না করতে কঠোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। ইসরাইল প্রথমে ট্রাম্পের কথায় সম্মত হলেও পরে, তা উপেক্ষা করেই ইরানের ওপর এই ভয়াবহ হামলা চালায়।
তবে এই চরম যুদ্ধ পরিস্থিতির মাঝেই রবিবার মার্কিন গণমাধ্যম এনবিসি’কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তির একেবারে দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। ট্রাম্প স্পষ্ট করে বলেন, খুব দ্রুতই একটি চুক্তি হবে। দুই-একটা ছোটখাটো বিষয়ে আমরা এখনো একমত হতে পারিনি, তবে সেগুলো ততোটা গুরুত্বপূর্ণ না। ইরান আমাদের গ্যারান্টি দিচ্ছে যে, তারা কোনো পারমাণবিক অস্ত্র বানাবে না। তবে ট্রাম্প তেহরানকে হুঁশিয়ারি দিয়ে আরও জানান, চূড়ান্ত শান্তি চুক্তি সই না হওয়া পর্যন্ত মার্কিন ব্যাংকে জব্দ থাকা ইরানের ২,৪০০ কোটি ডলারের সম্পদ ছেড়ে দেয়া হবে না।
এর পাশাপাশি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেয়া অপর এক সাক্ষাৎকারে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে এক প্রকার হুঁশিয়ারি দিয়ে ট্রাম্প বলেছেন, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে যে ধরণের চুক্তিই হোক না কেন, নেতানিয়াহুকে সেটি মুখ বুজে মেনে নিতে হবে। ট্রাম্প সগর্বে ঘোষণা করেন, মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে সব চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই নেন, অন্য কেউ নয়। এখন দেখার বিষয়, ট্রাম্পের বার্তার পর নেতানিয়াহু যুদ্ধ থামান, নাকি যুদ্ধের আগুন ইসরাইল-আমেরিকাকেও গ্রাস করে!
তথ্যসূত্র: রয়টার্স-আল জাজিরা-সিএনএ-বিবিসি