দীর্ঘ গোপনীয়তা আর বিশ্বজুড়ে তীব্র জল্পনা-কালের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার ঐতিহাসিক ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’-এর অফিশিয়াল ও চূড়ান্ত লিখিত রূপ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। বুধবার হোয়াইট হাউসের এক শীর্ষ কর্মকর্তা ১৪ দফার এই দলিলটি পড়ে শোনান।
মূলত চুক্তিটির ভাষা ও শর্ত নিয়ে জনমনে তীব্র ধোঁয়াশা তৈরি হওয়ার পরই আন্তর্জাতিক চাপের মুখে এই পদক্ষেপ নিল ট্রাম্প প্রশাসন। আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় এই চুক্তিতে আনুষ্ঠানিকভাবে সই করবেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, যা চূড়ান্ত শান্তি চুক্তির জন্য ৬০ দিনের একটি সময়সীমা নির্ধারণ করে দেবে।
অফিশিয়াল টেক্সটটি প্রকাশের ঠিক আগে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন একটি খসড়া চুক্তি প্রকাশ করেছিল। হোয়াইট হাউস প্রথমে খসড়াটিকে ‘অসম্পূর্ণ’ বলে উড়িয়ে দিলেও দেখা গেছে, আসল দলিলের সাথে তার সিংহভাগ মিল রয়েছে। তবে, মার্কিন কূটনীতির মারপ্যাঁচে আসল দলিলে দুটি অত্যন্ত চতুর ও বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে:
ইউরেনিয়াম ধ্বংসের ন্যূনতম পদ্ধতি: ফাঁস হওয়া খসড়া চুক্তিতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কিছুটা ধোঁয়াশা থাকলেও অফিশিয়াল দলিলে পরিষ্কার বলা হয়েছে, ইরানের বোমা তৈরির উপযোগী উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুতকে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার সরাসরি তত্ত্বাবধানে অন-সাইট (ঘটনাস্থলেই) কম সমৃদ্ধ উপাদানে রূপান্তর করতে হবে।
হরমুজ প্রণালীতে বিনামূল্যে ৬০ দিন: খসড়ায় জাহাজ চলাচলের কথা সাধারণভাবে থাকলেও আসল দলিলের পাঁচ নম্বর দফায় স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে, ইরান বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে কোনো রকম চার্জ বা টোল ছাড়াই নিরাপদ যাতায়াতের অনুমতি দেবে, তবে তা শুধুমাত্র ৬০ দিনের জন্য।
এক নজরে হোয়াইট হাউসের প্রকাশিত ঐতিহাসিক ১৪ দফা: আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে গত রোববার ডিজিটালি সই হওয়া (প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ কর্তৃক) এই ঐতিহাসিক দলিলের মূল বিষয়গুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
১ ও ২. যুদ্ধবিরতি ও সার্বভৌমত্ব: লেবাননসহ সব ফ্রন্টে অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে সামরিক অভিযান বন্ধ করা। একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং লেবাননের আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা।
৩. ৬০ দিনের সময়সীমা: আগামী সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন করা (উভয় পক্ষের সম্মতিতে যা বাড়ানো যেতে পারে)।
৪ ও ৫. অবরোধ প্রত্যাহার ও হরমুজ প্রণালী: চুক্তি সইয়ের ৩০ দিনের মধ্যে আমেরিকা তাদের নৌ-অবরোধ পুরোপুরি তুলে নেবে। অন্যদিকে ইরান ৩০ দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালীর মাইন অপসারণ করবে এবং ওমানের সাথে আলোচনা করে এই রুটের ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা ও টোল নির্ধারণ করবে।
৬ ও ৭. তিনশ’ বিলিয়ন ডলার ও নিষেধাজ্ঞা মুক্তি: মধ্যপ্রাচ্যের ধনী মিত্রদের সহায়তায় ইরানের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের জন্য কমপক্ষে ৩০০ বিলিয়ন (৩০ হাজার কোটি) ডলারের একটি তহবিল গঠন করা হবে। চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ এবং আমেরিকার সমস্ত একতরফা প্রাথমিক ও দ্বিতীয় স্তরের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে।
৮ ও ৯. পারমাণবিক নিয়ন্ত্রণ ও স্থিতাবস্থা: ইরান কোনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। চূড়ান্ত চুক্তি হওয়ার আগ পর্যন্ত ইরান তাদের পরমাণু কর্মসূচি বর্তমান অবস্থায় রাখবে এবং আমেরিকা কোনো নতুন নিষেধাজ্ঞা বা এই অঞ্চলে নতুন সেনা মোতায়েন করবে না।
১০ ও ১১. তেল রপ্তানি ও আটকে থাকা ফান্ড: চুক্তি সইয়ের সাথে সাথেই মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ ইরানের অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল রপ্তানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে ব্যাংকিং ও ইন্সুরেন্সের লাইসেন্স ইস্যু করবে। একই সাথে আন্তর্জাতিক ব্যাংকে আটকে থাকা ইরানের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ফ্রিজড ফান্ড অবমুক্ত করা হবে, যা ইরানের সেন্ট্রাল ব্যাংক যেকোনো সুবিধাভোগীকে পেমেন্ট করতে ব্যবহার করতে পারবে।
১২, ১৩ ও ১৪. নজরদারি ও নিরাপত্তা পরিষদ: চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য একটি যৌথ মনিটরিং মেকানিজম তৈরি করা হবে এবং চূড়ান্ত চুক্তিটি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের একটি বাধ্যতামূলক রেজোলিউশন বা প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদিত হবে।
আমেরিকার রাজনৈতিক চাল ও গোপন চুক্তি: মার্কিন প্রশাসনের এক শীর্ষ কর্মকর্তা সিএনএন’কে জানিয়েছেন, এই সমঝোতা স্মারকটি মূলত একটি রাজনৈতিক দলিল। এটি আসলে একটি রেগুলেটর বা ডায়ালের মতো, ইরান যত ভালো আচরণ করবে, আমেরিকাও ঠিক ততটাই অর্থনৈতিক সুবিধা ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সুযোগ বাড়িয়ে দেবে।
তবে মার্কিন কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, এই চুক্তির বাইরে পর্দার আড়ালে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নিয়ে আরও কিছু গোপন ও ব্যাক-চ্যানেল প্রতিশ্রুতি রয়েছে, যা এই দলিলে প্রকাশ করা হয়নি। অন্যদিকে ইরানের আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজ ফাঁস হওয়া এই নথিগুলোকে ‘ত্রুটিপূর্ণ’ বলে দাবি করেছে। শেষ পর্যন্ত শুক্রবারের আনুষ্ঠানিক সইয়ের পর মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে শান্তির সূর্য ওঠে কিনা, তা নিয়ে এখন সংশয় দূর হয়নি অনেকের।