টেন ডাউনিং স্ট্রিটের নয়া দাবিদার কে এই অ্যান্ডি বার্নহাম?

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের নাটকীয় পদত্যাগের পর এখন সবার নজর লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টারের দিকে। সোমবারই সেখানে নতুন এমপি হিসেবে শপথ নিতে যাচ্ছেন গ্রেটার ম্যানচেস্টারের অত্যন্ত জনপ্রিয় সাবেক মেয়র অ্যান্ডি বার্নহাম। কয়েক দিন আগেই উত্তর-পশ্চিম ইংল্যান্ডের মেকারফিল্ড আসনের উপ-নির্বাচনে এক দুর্দান্ত ও ল্যান্ডস্লাইড জয় পেয়েছেন তিনি।

আর এই জয়ের মাধ্যমেই মূলত তাঁর ডাউনিং স্ট্রিটের যাওয়ার পথ সুগম হয়, কারণ এমপি না হওয়ায় তিনি এতদিন স্টারমারের নেতৃত্বকে আনুষ্ঠানিকভাবে চ্যালেঞ্জ করতে পারছিলেন না। স্থানীয় নির্বাচনে লেবার পার্টির ভরাডুবির পর মেকারফিল্ডে উগ্র ডানপন্থী ‘রিফর্ম ইউকে’ দলকে যেভাবে বার্নহাম ধুলিসাৎ করেছেন, তা দেখে লেবার পার্টির ভেতরে এখন একটাই আওয়াজ, স্টারমার যা পারেননি, লেবার পার্টির এই পতন ঠেকাতে তা শুধু বার্নহামই পারবেন।

Andy Burnham 09
টনি ব্লেয়ার থেকে করবিন যুগ:
৫৬ বছর বয়সী অ্যান্ডি বার্নহামকে বলা হয় ব্রিটেনের এই মুহূর্তের অন্যতম ক্যারিশম্যাটিক ও জনপ্রিয় রাজনীতিবিদ। তবে তাঁর এই ‘আউটসাইডার’ বা সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি ইমেজের পেছনে কিছু দারুণ বৈপরীত্য রয়েছে। তিনি নিজেকে লন্ডনের অভিজাত রাজনীতির বাইরের মানুষ দাবি করলেও, মাত্র ২৪ বছর বয়সে তিনি পার্লামেন্টারি গবেষক হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করেন, ২৮ বছর বয়সে হন বিশেষ উপদেষ্টা এবং ৩১ বছর বয়সেই প্রথমবার এমপি নির্বাচিত হন।

টনি ব্লেয়ার এবং গর্ডন ব্রাউনের লেবার সরকারে ১৬ বছর এমপি থাকার সময় তিনি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দায়িত্বও সামলেছেন। এর আগে ২০১০ এবং ২০১৫ সালে দুবার লেবার পার্টির প্রধান হওয়ার লড়াইয়ে নেমেছিলেন তিনি, কিন্তু দুবারই ব্যর্থ হন। বিশেষ করে ২০১৫ সালে কট্টর সমাজতান্ত্রিক নেতা জেরেমি করবিনের কাছে তিনি শোচনীয়ভাবে হেরে যান। তবে করবিনের ছায়া মন্ত্রিসভায় কিছুদিন থাকার পর, ২০১৭ সালে তিনি ম্যানচেস্টারের মেয়র নির্বাচিত হয়ে লন্ডন ছেড়ে চলে যান।

Andy Burnham 04
এই সিদ্ধান্তটিই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। করবিনের অতি-বামপন্থা এবং স্টারমারের অতি-ডানপন্থার (সেন্ট্রিস্ট) ভেতরের যে কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি, তা থেকে বার্নহাম সম্পূর্ণ দূরে ছিলেন।

লেবার পার্টির ভেতরে অ্যান্ডি বার্নহামের যে কোনো ট্রেন্ডের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা নিয়ে একটি বিখ্যাত কৌতুক প্রচলিত আছে, ‘এক ব্লেয়ারপন্থী, এক ব্রাউনপন্থী এবং এক করবিনপন্থী একসঙ্গে মদের দোকানে ঢুকলেন। বারটেন্ডার জিজ্ঞেস করল, অ্যান্ডি, তুমি কোনটা খাবে?’ অর্থাৎ, বার্নহাম সমাজতন্ত্রের সব ধারার সাথেই নিজেকে মেলাতে পারেন। তবে, রাজনৈতিক গবেষকদের মতে, বার্নহাম মূলত লেবার পার্টির নরমপন্থী বাম ধারার নেতা, যিনি স্টারমারের চেয়ে কিছুটা বামে কিন্তু করবিনের চেয়ে ডানে অবস্থান করেন।

‘ম্যানচেস্টারইজম’ ও ‘কিং অব দ্য নর্থ’ হয়ে ওঠা: ম্যানচেস্টারের মেয়র থাকার সময় লন্ডনের কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে উত্তর ইংল্যান্ডের অবহেলিত মানুষের অধিকার নিয়ে বারবার সোচ্চার হয়েছেন বার্নহাম। ব্রিটিশ রাজনীতিতে বহু পুরনো ‘উত্তর-দক্ষিণ বৈষম্য’ নিয়ে তাঁর এই লড়াকু ভূমিকার কারণেই মিডিয়া তাঁকে নাম দিয়েছে ‘কিং অব দ্য নর্থ’ (উত্তরাঞ্চলের রাজা)। তাঁর আমলেই গ্রেটার ম্যানচেস্টারের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটে, গণপরিবহন ব্যবস্থার আমূল সংস্কার হয় এবং গৃহহীনদের জন্য আবাসন প্রকল্প শুরু হয়।

অ্যান্ডি বার্নহ্যাম (বাম দিক থেকে দ্বিতীয়) ২০০১ সালে পার্লামেন্টে নির্বাচিত হন, যখন টনি ব্লেয়ার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ছবি: সংগৃহীত
ব্রিটিশ মিডিয়ায় বার্নহামের এই শাসনপদ্ধতি এখন ‘ম্যানচেস্টারইজম’ নামে পরিচিত। বার্নহামের ভাষায় ম্যানচেস্টারইজম হলো, ‘ব্যবসা-বান্ধব সমাজতন্ত্র’। অর্থাৎ, পুঁজিবাদী ধনকুবেরদের সুবিধা দেওয়া ‘ট্রিকল-ডাউন’ অর্থনীতির অবসান ঘটিয়ে আবাসন, পানি, জ্বালানি ও পরিবহনের মতো জরুরি জনসেবাগুলোকে বেসরকারি খাত থেকে মুক্ত করে সরকারি নিয়ন্ত্রণে আনা। এর সাথে সাথে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ঘটিয়ে লন্ডনের বাইরের শহরগুলোকে স্বাবলম্বী করা। যদিও এই নীতিগুলোর সাথে বর্তমান লেবার সরকারের রেলের জাতীয়করণের মিল রয়েছে, তবে বার্নহামের লক্ষ্য এর গতি আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া।

কাঁটাতারের ওপর বার্নহাম, দল গোছানোর কঠিন চ্যালেঞ্জ: স্টারমারের পদত্যাগের পর লেবার পার্টির হাল ধরা বার্নহামের জন্য মোটেও সহজ হবে না। বর্তমানে ব্রিটেনের রাজকোষ প্রায় খালি, দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি চরম উত্তপ্ত। বার্নহামকে এখন এক কঠিন ভারসাম্য বজায় রেখে চলতে হবে। তিনি যদি অভিবাসন বা অর্থনীতির ইস্যুতে খুব বেশি ডানপন্থী হয়ে যান, তবে শহরের শিক্ষিত ও উদারপন্থী ভোটাররা ‘গ্রিন পার্টি’র দিকে চলে যাবে। আবার খুব বেশি বাম হলে ঐতিহ্যবাহী শ্রমজীবী ভোটারদের হারাবে দল।

২০১৭ সালে গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র নির্বাচনে জয়ের পর অ্যান্ডি বার্নহাম তাঁর পরিবারের সাথে আনন্দ উদযাপন করছেন ছবি: সংগৃহীত
মেকারফিল্ডের নির্বাচনী প্রচারণায় বার্নহাম অবশ্য এই কঠিন সমীকরণ বেশ চতুরতার সাথেই সামলেছেন। মেকারফিল্ডের সাধারণ ভোটারদের মন জয় করতে তিনি অভিবাসন ইস্যুতে বর্তমান সরকারের সুরেই সুর মিলিয়েছেন। শরণার্থীদের স্থায়ী নাগরিকত্ব দেওয়ার বিরোধিতা করেছেন এবং অতীতে অবৈধ অভিবাসীদের সরকারি সুবিধা দেওয়ার যে দাবি তিনি করেছিলেন, তা থেকে সরে এসেছেন। এমনকি ব্রেক্সিট ইস্যুতে গত সেপ্টেম্বরে ব্রিটেনকে আবারও ইউরোপীয় ইউনিয়নে ফিরিয়ে নেয়ার যে ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন, প্রচারণার স্বার্থে তা থেকেও এখন দূরত্ব বজায় রাখছেন তিনি। আজ যখন তিনি এমপি হিসেবে পার্লামেন্টে পা রাখবেন, তখন পুরো ব্রিটেনের চোখ থাকবে তাঁর ওপর। দেখার বিষয়, ‘কিং অব দ্য নর্থ’ এবার ব্রিটেনের মসনদে বসে পুরো দেশকে এক সুতোয় বাঁধতে পারেন কি না।

তথ্যসূত্র: সিএনএন