ইরানের ওপর ব্যাপক মাত্রার বিমান হামলা আপাতত স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে এর সাথে জুড়ে দিয়েছেন এক কড়া শর্ত, তেহরানকে খুব ‘দ্রুত’ আমেরিকার সাথে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে হবে। নিজের সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেন, সম্ভাব্য চুক্তির প্রাথমিক খসড়া তৈরি হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশ ও ইরান তাকে সাময়িকভাবে এই হামলা স্থগিত রাখার অনুরোধ জানিয়েছে।
এর আগে মার্কিন গণমাধ্যমগুলোতে খবর ছড়িয়ে পড়েছিল যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে ইরানের জ্বালানি ও সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে ভয়াবহ হামলার পরিকল্পনা করছে। শুক্রবারে হোয়াইট হাউসের এক ক্যাবিনেট বৈঠকে ট্রাম্প মন্তব্য করেছিলেন, আমরা ওদের ওপর চরম আঘাত হানব, এ কপর্যায়ে বাধ্য হয়ে ওরা বলবে, ‘আমরা আর নিতে পারছি না!’
তবে শনিবার মধ্যপ্রাচ্যে চরম উত্তেজনার আবহ তৈরি হলেও ট্রাম্প তাঁর ট্রুথ সোশ্যাল পোস্টে নতুন বার্তা দেন। তিনি লেখেন, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ছড়াতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে ভয়ংকর রূপ নিয়ে আমেরিকা পুরোপুরি প্রস্তুত । কিন্তু বিশ্বশান্তি এবং একটি সফল ও সমৃদ্ধ ইরানের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার স্বার্থেই এই মুহূর্তে আক্রমণ স্থগিত করা হলো।
ইরানের প্রতিক্রিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের আতঙ্ক: ট্রাম্পের চুক্তি সংক্রান্ত দাবি নিয়ে ইরান সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বার্তা না এলেও দেশটির ভারপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রী মজিদ ইবনে আল-রেজা কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি বলেন, শত্রুপক্ষের কোনো হুমকিকেই আমরা হালকাভাবে নিচ্ছি না, তা মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ হলেও। ইরানের সশস্ত্র বাহিনী কখনোই অসতর্ক হবে না এবং হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিমান হামলার মাধ্যমে এই চলমান যুদ্ধের সূচনা ঘটে। পরবর্তীতে এপ্রিল মাসে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি হলেও জুন মাসে তা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। এর পর থেকে মার্কিন বাহিনী ইরানের বন্দর ও তেল অবকাঠামোতে অবরোধ ও বোমাবর্ষণ শুরু করে। জবাবে তেহরানও মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ড্রোন ও রকেট বর্ষণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক তেল সরবরাহের মূল পথ 'হরমুজ প্রণালী' অবরোধ করে।
যুদ্ধের এই উত্তাপ বিশ্ববাজারে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের দাম আশঙ্কাজনকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। মার্কিন মিত্র সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান শনিবার ট্রাম্পের সাথে ফোনালাপে দ্রুত সংঘাত কমিয়ে কূটনীতির পথে হাঁটার গুরুত্ব তুলে ধরেন। কারণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সীমার বাইরে থাকলেও বাহরাইন, জর্ডান কিংবা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো মার্কিন মিত্র দেশগুলোর মিষ্টি পানির প্ল্যান্ট ও তেল অবকাঠামো সহজেই ইরানি ড্রোনের নাগালের মধ্যে রয়েছে।
আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও মধ্যবর্তী নির্বাচন: বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষণে ক্ষণে চরম হুমকি দেয়া এবং পরক্ষণেই আলোচনার কৌশল অবলম্বন করা, যা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ‘ম্যাডম্যান থিওরি’ নামে পরিচিত, ট্রাম্প এর আগেও প্রয়োগ করেছেন। গত এপ্রিলে তিনি হুঙ্কার দিয়েছিলেন আজ রাতেই এক আস্ত সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে, যার প্রেক্ষিতে পাকিস্তানে দুই দেশের মধ্যে ঐতিহাসিক এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও তা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়।
তবে এবার ট্রাম্পকে আন্তর্জাতিক চাপের পাশাপাশি বড় ধরনের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, প্রায় ৬০ শতাংশ আমেরিকান নাগরিক ইরানের সাথে এই যুদ্ধ সমর্থন করছেন না, যা ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় বড় ধরনের ধস নামিয়েছে। সামনেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচন। নতুন করে সংঘাত বাড়লে তেলের দাম আরও বাড়বে, যা সরাসরি আমেরিকান জনগণের জীবনযাত্রার ওপর প্রভাব ফেলবে এবং ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য তা রাজনৈতিক পরাজয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি ও রয়টার্স