যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে টানা পাঁচ মাস ধরে চলা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ বন্ধের প্রচেষ্টায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির কথা জানিয়েছে মধ্যস্থতাকারী দেশ কাতার। তবে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিপাক্ষিক আলোচনা শুরু হয়েছে এমন দাবিকে পুরোপুরি নস্যাৎ করে দিয়েছে ইরান।
একদিকে কূটনীতির টেবিলে উত্তেজনা ও ধোঁয়াশা, অন্যদিকে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজে নতুন করে হামলা এবং জ্বালানি তেলের বাজার নিয়ে বিশ্বজুড়ে চরম অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
গত সোমবার ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেন, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের অনুরোধে ইরানের সাথে সরাসরি আলোচনা শুরু হয়েছে। ট্রাম্প সতর্ক করে দিয়ে বলেন, একটি সম্মানজনক চুক্তি সই করার জন্য এটি ইরানের কাছে শেষ সুযোগ।
তবে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই দাবিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে তেহরান। ইরানি কর্মকর্তারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তাদের কোনো সরাসরি আলোচনা হচ্ছে না।
গত জুলাইয়ের শুরুতে দুই দেশের সমঝোতা স্মারক ভেস্তে যাওয়ার পর থেকে ওয়াশিংটনের সাথে প্রকাশ্যে কোনো সংলাপে বসতে রাজি নয় তারা। বর্তমানে তেহরান শুধু ওমানের সাথে হরমুজ প্রণালী নিয়ে কথা বলছে এবং চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বড় ধরনের কোনো বৈঠকের পরিকল্পনা নেই।
মধ্যস্থতাকারীদের দৌড়ঝাঁপ: কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি মঙ্গলবার নিশ্চিত করেছেন, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে চিঠি ও প্রস্তাবনা আদান-প্রদানের মাধ্যমে কূটনৈতিক যোগাযোগ অত্যন্ত উন্নত পর্যায়ে পৌঁছেছে। কাতার, পাকিস্তান ও ওমান একযোগে দুই পক্ষকে অন্তত আনুষ্ঠানিকভাবে টেবিলে বসানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। পাকিস্তানি এক শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ব্যাকচ্যানেলে অনেক দূর কাজ এগিয়েছে।
কাতারের এই খবরের পরপরই বিশ্ববাজারে তেলের দাম এক ধাক্কায় ২ শতাংশেরও বেশি কমে গেছে। ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের এই দরপতনের পেছনে মূল কারণ হরমুজ প্রণালীতে নৌচলাচল দ্রুত স্বাভাবিক হওয়ার প্রত্যাশা। মার্কিন অর্থসচিব স্কট বেসেন্ট সিএনবিসি দেয়া এক সাক্ষাৎকারে আশা প্রকাশ করেছেন, মঙ্গল বা বুধবরের মধ্যেই হরমুজ পুনরায় খুলে দেয়া নিয়ে একটি সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হতে পারে।
হরমুজ প্রণালীতে হামলা ও অবরোধের বাস্তব চিত্র: খাতা-কলমে আলোচনার গুঞ্জন থাকলেও বাস্তবে হরমুজ প্রণালী এখনও কার্যত অবরুদ্ধ। বিশ্বজুড়ে উৎপাদিত জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সরু পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। কিন্তু বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ এবং ইরানের শক্ত অবস্থানের কারণে এই রুট দিয়ে চলাচল বন্ধ রয়েছে।
মঙ্গলবার ওমান উপকূলে প্রণালীর কাছাকাছি একটি বাণিজ্যিক জাহাজে অজ্ঞাত উৎসের ক্ষেপণাস্ত্র বা প্রজেক্টাইল আঘাত হানে। ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা এবং রয়টার্স জানিয়েছে, আক্রমণের পর নাবিকরা জাহাজটি পরিত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং এক নাবিক নিখোঁজ রয়েছেন।
ইরান এই প্রণালীর ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চাইছে। ওমানের পক্ষ থেকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল যৌথ তদারকি এবং জাহাজগুলো থেকে স্বেচ্ছাসেবী ফি আদায়ের, কিন্তু তেহরান তা প্রত্যাখ্যান করে প্রবেশমুখী সব জাহাজের ওপর একক নিয়ন্ত্রণ ও যাচাই-বাছাইয়ের ক্ষমতা দাবি করছে।
মার্কিন রণকৌশল ও মিসাইল ঘাটতি: বিশ্লেষকদের মতে, পাঁচ মাস ধরে চলা এই যুদ্ধে মার্কিন সেনাবাহিনী তাদের অতি-নিখুঁত দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের বড় অংশ শেষ করে ফেলেছে। ফলে মার্কিন বাহিনীর যুদ্ধপ্রস্তুতি এবং ইরানের ভেতরে বড় ধরনের নতুন হামলা চালানোর সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এই মিসাইল সংকটের কারণে ট্রাম্প হয়তো ঝুঁকিপূর্ণ বিমান হামলার চিন্তা বাতিল করতে বাধ্য হয়েছেন।
অন্যদিকে, ট্রাম্প যুদ্ধের শুরুতে যে তিনটি মূল লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা, আঞ্চলিক মিত্রদের ওপর হামলার ক্ষমতা খর্ব করা এবং সরকার পতনের সুযোগ তৈরি করা, তার একটিও অর্জন করতে পারেননি।
পাশাপাশি ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরাও লোহিত সাগরে সৌদি আরবের ওপর নৌ-অবরোধ আরোপ করায় সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। তেহরান বাজি ধরছে যে, বিশ্ব অর্থনীতি ও বাণিজ্যের রুটগুলোতে চাপ সৃষ্টি করে তারা ওয়াশিংটনের চেয়ে বেশি সময় টিকে থাকতে পারবে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স