মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন-ইসরাইলি যুদ্ধের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠা কৌশলগত হরমুজ প্রণালী পুনর্গঠন ও চালু করার বিষয়ে নতুন শর্ত প্রকাশ করেছে তেহরান। মঙ্গলবার রয়টার্সকে দেয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ইরানের এক ঊর্ধ্বতন সূত্র জানিয়েছে, ওমানের সাথে চলমান আলোচনায় ইরান প্রস্তাব দিয়েছে, প্রণালী দিয়ে পারস্য উপসাগরে প্রবেশকারী সব জাহাজের ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এবং বের হয়ে যাওয়া জাহাজের ওপর কঠোর নজরদারি বজায় রাখতে চায় তারা। এমনকি প্রয়োজন মনে করলে যে কোনো জাহাজে হস্তক্ষেপ বা অভিযান চালানোর অধিকারও তারা নিজেদের হাতে রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
প্রস্তাবিত এই সাময়িক পরিকল্পনার আওতায় পারস্য উপসাগর থেকে বের হওয়ার পথটি ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী রুট দিয়ে নির্ধারিত হবে। তবে কোনো জাহাজকে বের হওয়ার চূড়ান্ত অনুমতি বা ক্লিয়ারেন্স দেবে ওমান, সেটিও ইরানকে বিস্তারিত জানানোর পরেই শুধু সম্ভব হবে।
ইরানের ওই সূত্রের দাবি, তেহরান ইতোমধ্যে তাদের প্রাথমিক অবস্থান থেকে কিছুটা সরে এসে নমনীয়তা প্রদর্শন করেছে। শুরুতে তারা প্রণালীর দুইমুখী চলাচলের পুরো নিয়ন্ত্রণই এককভাবে চেয়েছিল। তবে নতুন এই খসড়া প্রস্তাব থেকে সরে আসার কোনো সুযোগ নেই বলে সোজা জানিয়ে দিয়েছে তেহরান।
উল্লেখ্য, গত মাসে ওমানের পক্ষ থেকে প্রণালীর ট্রানজিট রুট দুটি দেশের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে নেয়ার যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, তা প্রত্যাখ্যান করে ইরান। তেহরানের মতে, অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক ও সামরিক স্থায়িত্ব না আসা পর্যন্ত ওই প্রস্তাব তাদের জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগগুলোর কোনো সমাধান করতে পারছিল না।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও চুক্তির আইনি জটিলতা: ৩৪ কিলোমিটার (২১ মাইল) প্রশস্ত এই সংকীর্ণ জলপথটি মূলত ইরান ও ওমানের আঞ্চলিক জলসীমার অন্তর্ভুক্ত হলেও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য রীতি অনুযায়ী এটি মুক্ত আন্তর্জাতিক জলপথ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। ১৯৬৮ সালে জাতিসংঘের নৌসংস্থার অধীনে গৃহীত ট্রাফিক সেপারেশন স্কিমের মাধ্যমে এখানে দুইমুখী জাহাজ চলাচলের সুনির্দিষ্ট পথ তৈরি করা হয়েছিল, যা এতদিন ধরে কার্যকর ছিল।
তবে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং সারসহ অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহনের প্রধান এই রুটটি কার্যত পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।
বর্তমানে জলপথটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যেও বড় ধরনের আইনি দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, গত জুনে যুদ্ধ বিরতির লক্ষ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকে (MoU) পরিষ্কার বলা হয়েছিল যে, ইরানকে অবিলম্বে আন্তর্জাতিক চলাচলের জন্য এই জলপথ খুলে দিতে হবে।
ইরানের পাল্টা যুক্তি, ওই চুক্তির মূল পাঠ্যে সামুদ্রিক চলাচলের ওপর ইরানের নিজস্ব সার্বভৌম কর্তৃত্ব ও আইনি অধিকার স্পষ্টভাবে সংরক্ষিত রাখা হয়েছে।
পারস্য উপসাগর থেকে ভারত মহাসাগরে বের হওয়ার একমাত্র পথ এই হরমুজ প্রণালীটি পুনরায় সচল হবে কি না, তা এখন পুরোটাই নির্ভর করছে তেহরানের এই নতুন নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্র এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলো মেনে নেয় কি না তার ওপর।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স