মধ্যপ্রাচ্যে অব্যাহত সামরিক উত্তেজনা, আঞ্চলিক সংঘাত এবং ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হানার প্রেক্ষাপটে এক অভাবনীয় ও ঐতিহাসিক জোট গঠনে এগিয়ে এল মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী তিন রাষ্ট্র, সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক। শুক্রবার পবিত্র মক্কা নগরীতে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে দেশ তিনটি একটি ত্রিদেশীয় যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করেছে।
‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ নামে অভিহিত এই চুক্তিতে স্পষ্ট জানিয়ে দেয়া হয়েছে, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা চালানো হলে তাকে অপর দুই দেশের ওপরও হামলা হিসেবে গণ্য করা হবে।
ঐতিহাসিক চুক্তির পটভূমি: গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা ও ইসরায়েল কর্তৃক ইরানে বড় ধরনের সামরিক আক্রমণের পর থেকেই পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে আগুন জ্বলছে। জবাবে ইরান এবং তার সমর্থিত আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলো সৌদি আরবসহ পারস্য উপসাগরীয় তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় এবং প্রণালীগুলোতে শক্তি চালানোর পথ রুদ্ধ করে দেয়। সম্প্রতি ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ‘সামুদ্রিক অবরোধ’ ঘোষণা করে দেশটির বিমানবন্দর, তেল শোধনাগার এবং লোহিত সাগরের তেলবাহী ট্যাঙ্কার লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।
ঐতিহ্যগতভাবে মার্কিন নিরাপত্তা বলয়ের ওপর নির্ভরশীল থাকা সৌদি আরব এই আঞ্চলিক তাণ্ডব ও তেল সরবরাহ ঝুঁকির মুখে পড়ে তাদের প্রতিরক্ষা কৌশল পুনর্মূল্যায়ন করতে বাধ্য হয়। বিগত তিন বছর ধরে চলে আসা মধ্যপ্রাচ্য সঙ্ঘাত এবং ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের রেষেই মূলত জন্ম নিয়েছে এই মক্কা চুক্তি।
তিন শক্তির যৌথ বার্তা ও সামরিক তাৎপর্য: মুসলিম বিশ্বের এই তিন দেশের রয়েছে নিজস্ব শক্তিমত্তা। তুরস্কের রয়েছে ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক বাহিনী, সৌদি আরব বিশ্বের শীর্ষ তেল রপ্তানিকারক ও সবচেয়ে প্রভাবশালী অর্থনীতি, আর পাকিস্তান হচ্ছে একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রধারী মুসলিম দেশ।
বিশ্লেষকদের মতে, এই জোট আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে। লন্ডনভিত্তিক থিঙ্কট্যাঙ্ক আরইউএসআই’র গবেষক বুর্কু ওজসেলিক জানান, এই চুক্তির মূল লক্ষ্য ইরানের প্রভাব প্রতিহত করা এবং ইসরাইলের আগ্রাসী মনোভাবের বিরুদ্ধে এক ধরনের যৌথ মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা।
তবে সৌদি গণকূটনীতি বিষয়ক উপমন্ত্রী রায়েদ ক্রিমলি এক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে স্পষ্ট করেছেন যে, এই চুক্তি কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা কোনো সম্প্রদায়িক ব্লকের বিরুদ্ধে সামরিক অক্ষ তৈরি করার উদ্দেশ্যে করা হয়নি। এটি সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক এবং কোনো পারমাণবিক প্রতিযোগিতার সাথে সম্পর্কিত নয়।
কে কী সুবিধা পাবে এই জোট থেকে?
সৌদি আরব: মধ্যপ্রাচ্যের নতুন পরিস্থিতিতে নিজেদের জন্য একটি শক্ত প্রতিরক্ষা বলয় বা নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারল রিয়াদ।
তুরস্ক: এই চুক্তির ফলে তুরস্কের শক্তিশালী সামরিক-শিল্প খাত আরও সম্প্রসারিত হবে। সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সাথে যৌথ অস্ত্র উৎপাদন, প্রযুক্তি বিনিময় এবং নতুন ড্রোন বিক্রির বাজার আরও উন্মুক্ত হবে।
পাকিস্তান: ভারত ও অন্যান্য অভ্যন্তরীণ আঞ্চলিক উত্তেজনার মুখোমুখি থাকা পাকিস্তানের পেছনে এখন অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী সৌদি আরব এবং সামরিক প্রযুক্তিতে উন্নত তুরস্ক সরাসরি অবস্থান নিল, যা ইসলামাবাদকে বৈশ্বিক কূটনীতি ও নিরাপত্তার দিক থেকে বাড়তি শক্তি জোগাবে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও ধোঁয়াশা: এই মক্কা চুক্তি নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া এসেছে তেহরান থেকে। ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের জ্যেষ্ঠ সদস্য ইব্রাহিম রেজাই ক্ষোভ প্রকাশ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছেন, সৌদিদের জানা উচিত যে তুরস্ক ও পাকিস্তানের সাথে এই কাগজের চুক্তি তাদের কোনো নিরাপত্তা দিতে পারবে না, যেমনটা বহু বছর ধরে আমেরিকানদের তোষামোদ করেও তারা নিরাপত্তা পায়নি।
এদিকে ভারত সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানিয়েছেন, তাঁরা কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে এই চুক্তির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছেন। অন্যদিকে, চুক্তিটি প্রতিরক্ষামূলক হলেও এটি কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হবে এবং এক দেশ অন্য দেশের যুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়বে কি না, তা নিয়ে কূটনৈতিক পর্যায়ে এখনও কিছুটা ধোঁয়াশা থেকে গেছে।