যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার রক্তক্ষয়ী সংঘাত ছয় মাসে পদার্পণ করার মুখে দুই পক্ষের তীব্র হুমকি-পাল্টা হুমকিতে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি চরম উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। রণক্ষেত্রে সরাসরি গোলাগুলি সাময়িক বন্ধ থাকলেও শান্তির কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। এর মধ্যেই ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে কোণঠাসা করতে ইতিহাস স্মরণকালের সবচেয়ে কড়া মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা আসতে যাচ্ছে।
মার্কিন অর্থসচিব স্কট বেসেন্ট সোমবার ‘ইতিহাসের সবচেয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা’ উন্মোচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এই নিষেধাজ্ঞা শুধু তেহরানের ওপরই নয়, বরং ইরানের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার চীনের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। তথ্য বিশ্লেষণকারী সংস্থা কেপলারের ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, ইরান থেকে সমুদ্রপথে রপ্তানি হওয়া খনিজ তেলের ৮০ শতাংশেরই ক্রেতা চীন। মার্কিন প্রশাসন বেইজিংকে সাহায্য করার আহ্বান জানালেও চীন কূটনৈতিক সমাধানের তাগিদ দিয়েছে।
অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন যে যেসব দেশ ইরানকে কোনো ধরনের সহায়তা দেবে, তাদের কঠোর অর্থনৈতিক পরিণতি ভোগ করতে হবে। চুক্তির বিষয়ে ট্রাম্প বলেন, তারা চুক্তি করতে চায়, কিন্তু আমার মতে তারা সঠিক চুক্তিটি করার জন্য প্রস্তুত নয়।
হরমুজ প্রণালীতে অচলাবস্থা ও জ্বালানি সংকট: আমেরিকা তাদের নৌবাহিনী দিয়ে ইরানি জাহাজগুলোকে নিজেদের বন্দরে কার্যত অবরুদ্ধ করে রাখলেও, কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণ বন্ধ করে রেখেছে ইরান। অনুমতি ছাড়া কোনো তেলবাহী ট্যাঙ্কার চলাচল করলে তা ধ্বংস করার হুমকি দিয়েছে তেহরান। এর ফলে শত শত জাহাজে হাজার হাজার নাবিক আটকা পড়ে আছেন।
সাধারণ সময়ে প্রতিদিন ২০ মিলিয়ন ব্যারেলের বেশি তেল (বিশ্বের মোট ব্যবহৃত তেলের এক-পঞ্চমাংশ) এই পথ দিয়ে সরবরাহ হলেও বর্তমানে তা নেমে এসেছে গড়ে মাত্র ৮ মিলিয়ন ব্যারেলে।
তবে বাগদাদের বারংবার অনুরোধে এবং ইরানি পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফের ইরাক সফরের পর বিশেষ অনুমতির মাধ্যমে কয়েকটি ইরাকি তেলবাহী ট্যাঙ্কারকে হরমুজ প্রণালী অতিক্রমের সুযোগ দিয়েছে তেহরান।
দুই দেশের অভ্যন্তরীণ অবস্থা ও প্রতিক্রিয়া: মার্কিন হামলায় ইরানের অর্থনীতি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং দেশটির বিমান ও নৌবাহিনী ধ্বংসস্তূপের মুখোমুখি হলেও, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ক্ষমতার মাধ্যমে তেল পরিবহন ব্যবস্থার লাগাম এখনো তেহরানের হাতেই রয়ে গেছে।
অন্যদিকে, ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধ শুরু করার পর ঘোষিত মূল উদ্দেশ্যসমূহ, যেমন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় করা কিংবা বর্তমান সরকারের পতন ঘটানোর লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। সংঘাতের প্রথম দিনেই ১৬৮ জন ইরানি স্কুলশিক্ষার্থীসহ হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।
ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান মেজর জেনারেল আলী আবদুল্লাহি মার্কিন হুমকির জবাবে ‘পীড়নমূলক ও ধ্বংসাত্মক’ সামরিক জবাব দেয়ার হুঙ্কার দিয়েছেন। তবে দেশের অর্থনৈতিক সংকট স্বীকার করে নিয়ে স্পিকার গালিবাফ বলেছেন, আমাদের যত সামরিক শক্তিই থাকুক না কেন, মানুষ অভুক্ত থাকলে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি না থাকলে আমরা টিকতে পারব না।
একই সুর মিলিয়ে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, আজ যখন আমরা শক্তিশালী ও সম্মানিত এবং পুরো বিশ্ব স্বীকার করছে যে যুক্তরাষ্ট্র নিয়ম ভেঙে আমাদের হাসপাতাল ও স্কুলে হামলা চালিয়ে বিশ্বজুড়ে ঘৃণিত হয়েছে, তখনই যুদ্ধ শেষ করা শ্রেয়।
তেহরানের পক্ষ থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞাকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে তীব্র নিন্দা জানানো হয়েছে। নতুন মার্কিন শুল্ক কার্যকরের পর মধ্যপ্রাচ্যের এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত কোন মোড় নেয়, সেদিকেই এখন নজর পুরো বিশ্বের।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স