একদিকে নিষেধাজ্ঞা, অন্যদিকে আলোচনার প্রস্তাব!

ইরানের অর্থনীতিকে 'অক্সিজেনহীন' করে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করতে আমেরিকা নতুন করে নিষেধাজ্ঞার ছক কষলেও বিন্দুমাত্র দমে যেতে নারাজ তেহরান। উল্টে আমেরিকার এই চাপ সৃষ্টিকারী নীতিকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে কঠোর পাল্টা হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। এর মধ্যেই পর্দার আড়ালে নতুন নাটকের জন্ম দিয়েছে পাকিস্তানের মধ্যস্থতা। তেহরানের সঙ্গে আমেরিকার থমকে যাওয়া রাজনৈতিক আলোচনা পুনরুজ্জীবিত করতে ইসলামাবাদকে ব্যবহার করে ওয়াশিংটন গোপন বার্তা পাঠিয়েছে বলে খবর মিলছে।

ট্রাম্প প্রশাসন সোমবার ৬০ ব্যক্তি, সত্তা ও জাহাজের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা জারি করার পরপরই ইরানের জাতীয় টিভিতে গর্জে ওঠেন দেশটির অর্থনীতি মন্ত্রী আলী মাদানিক জাদেহ। সোজা ভাষায় জানিয়ে দেন, আমাদের প্রতিরক্ষা নীতি এখন আর শুধুই রক্ষণে সীমাবদ্ধ নেই; এবার শত্রুদের আক্রমণের জন্য তৈরি থাকা উচিত। তিনি দাবি করেন, চীন বা রাশিয়া কোনো দেশই যুক্তরাষ্ট্রের এই একতরফা দাদাগিরি মেনে নেয়নি এবং বাকি বিশ্বের বাণিজ্য অংশীদাররাও আমেরিকার এই অন্যায় চাপ প্রতিহত করবে।

Iran War 01
বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেইন মহেবি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, ইরানের পরিকাঠামোতে আঁচ লাগলে আমেরিকার প্রধান জাতীয় স্বার্থ এবং জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে এমন ধাক্কা দেওয়া হবে যা ওয়াশিংটন কল্পনাও করতে পারবে না।

মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট একদিকে হুঙ্কার দিয়ে বলছেন, কেউ মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ক্ষমতার বাইরে নয়, অন্যদিকে পর্দার আড়ালে চলছে জোর কূটনৈতিক দৌড়ঝাঁপ। ইরানি পার্লামেন্টের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির প্রধান আব্বাস গোলরু চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়ে জানান, সোমবার তেহরান সফরে এসে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল অসীম মুনির যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন। তাঁর মতে, স্তব্ধ হয়ে যাওয়া রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ও শান্তি আলোচনা পুনরায় চালু করাই ছিল এই বার্তার মূল উদ্দেশ্য।

Iran War 03
ইরানের প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের কর্মকর্তা মেহেদি তবাতাবাই ইঙ্গিতপূর্ণভাবে সোশাল মিডিয়ায় লিখেছেন, ফিল্ড মার্শাল মুনিরের এই সফর অত্যন্ত মূল্যবান কূটনৈতিক সাফল্য এনে দিয়েছে, যার সুফল খুব শিগগিরই প্রকাশ্যে আসবে। অন্যদিকে, পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ মন্ত্রী মহসিন নকভিও এই আলোচনাকে অত্যন্ত গঠনমূলক বলে বর্ণনা করেছেন।

আমেরিকার নিষেধাজ্ঞার নতুন তালিকায় সবচেয়ে বড় যে জিনিসটি মিসিং, তা হলো চীনা ব্যাংকগুলো। বছরের পর বছর ধরে চীনই ইরানি তেলের প্রধান ক্রেতা। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আগামী মাসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য হাই-প্রোফাইল বৈঠকের আগে বেইজিংকে চটাতে সাহস করেনি ওয়াশিংটন। কারণ চীনের ওপর আঘাত এলে তারা গুরুত্বপূর্ণ খনিজ রপ্তানি বন্ধ করে আমেরিকার অর্থনীতি থমকে দিতে পারে। মঙ্গলবার চীনও পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে, ইরানের সঙ্গে তাদের বাণিজ্য আন্তর্জাতিক আইন মেনেই চলছে এবং এতে কোনো বহিরাগত হস্তক্ষেপ সহ্য করা হবে না।

Strait of Hormuz 01
যুদ্ধের দীর্ঘ ছয় মাসে পারস্য উপসাগরে তেলের প্রবাহ মারাত্মকভাবে থমকে গেছে। আগে প্রতিদিন যেখানে ২ কোটি ব্যারেল তেল হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রবাহিত হতো, তা এখন নেমে এসেছে মাত্র ৫০ লাখ ব্যারেলে! নিষেধাজ্ঞার কথা কাটাকাটির মধ্যেই মঙ্গলবার ওমানের আশ শিসাহ্ এলাকা থেকে মাত্র ১৭ কিলোমিটার দূরে একটি তেলের ট্যাংকার অজ্ঞাত ক্ষেপণাস্ত্র বা প্রজেক্টাইলের আঘাতে পঙ্গু হয়ে পড়ে।

আমেরিকায় নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা তলানিতে গিয়ে ঠেকলেও, মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় সাবেক সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যু এবং ইরানের সেনার বড় ক্ষতির পরও তেহরান এখনো বিশ্ব জ্বালানি বাজারে নাড়া দেওয়ার মতো পূর্ণ ক্ষমতা রাখে। এখন দেখার বিষয়, পাকিস্তানের এই ‘ব্যাকডোর কূটনীতি’ মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে শান্তির বার্তা আনে, নাকি নতুন কোনো ভয়াবহ যুদ্ধের সূচনা করে!

তথ্যসূত্র: রয়টার্স