যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি বাহিনীর সাথে ছয় মাস ধরে চলা যুদ্ধ ও পারস্পরিক হামলার ধারাবাহিকতায় পারস্য উপসাগরে নতুন 'বিধিনিষেধ অঞ্চল' ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইরান। একই সাথে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলের জন্য একটি নতুন আন্তর্জাতিক নৌ-করিডোরের মানচিত্র প্রকাশের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। বিগত সপ্তাহান্তে উভয় পক্ষের মধ্যে নৌ-হামলা তীব্র হওয়ার পর সোমবার বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৯৭ ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মহসেন রেজাই রাষ্ট্রীয় টিভিতে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান, যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত তেল অবরোধ সীমানা থেকেই ইরানের এই নতুন বিধিনিষেধ অঞ্চল শুরু হয়ে পারস্য উপসাগরের বিভিন্ন অংশে বিস্তৃত হবে। তিনি স্পষ্ট সতর্কবার্তা দেন, অনুমোদন ছাড়া কোনো জাহাজ এই এলাকায় প্রবেশ করলে তাকে ইরানের নিষেধাজ্ঞা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
রেজাই জানান, ইরান ও ওমানের জলসীমা জুড়ে একটি নতুন আন্তর্জাতিক নৌ-করিডোর তৈরির বিষয়ে উভয় দেশ একমত হয়েছে, যার ব্যবস্থাপনা থাকবে ইরানের হাতে। আগামী কয়েকদিনের মধ্যে এই সংক্রান্ত চুক্তিতে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষর করা হবে।
হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত রাখার বিষয়ে রেজাই বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যতক্ষণ পর্যন্ত না ইরানি তেল ও বাণিজ্যিক জাহাজে নাশকতা, হুমকি ও আক্রমণ বন্ধ করবে, ততক্ষণ আমরা হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি উন্মুক্ত রাখার ব্যাপারে কোনো প্রতিশ্রুতি দেব না।
উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলি যৌথ হামলার পর গত আগস্টে সামরিক তৎপরতা কিছুটা কম থাকলেও সেপ্টেম্বর থেকে তা আবার তীব্র রূপ নিয়েছে। সম্প্রতি ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) মার্কিন যুদ্ধজাহাজে আক্রমণ চালানোর পর, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড ইরানের তিনটি তেল ট্যাঙ্কারে হামলা চালায়, যার একটি ছিল ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপে।
বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় পাঁচভাগের একভাগ যা দিয়ে পরিবাহিত হয়, সেই হরমুজ প্রণালীতে নৌ-পরিবহন আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। গত ১০ দিনে গড়ে প্রতিদিন মাত্র ১০টি বাণিজ্যিক জাহাজ এই প্রণালী অতিক্রম করেছে, যা গত মে মাসের পর সর্বনিম্ন। শিপিং ডাটা অনুযায়ী, ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ০.৮ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ৯৭ ডলার ছাড়িয়েছে।
খার্গ দ্বীপে মুহুর্মুহু হামলা: ইরানের তেলমন্ত্রী মহসিন পাকনেজাদ জানান, তাদের প্রধান রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপে গত কয়েক মাসে প্রায় ৫৫০ বার হামলা চালিয়েছে মার্কিন ও ইসরাইলি বাহিনী। তা সত্ত্বেও কেন্দ্রটির কার্যক্রম সচল রাখা হয়েছে।
মার্কিন সেন্টকমের ব্লকড: সেন্ট্রাল কমান্ডের তথ্যমতে, মধ্য-এপ্রিল থেকে মার্কিন অবরোধ কঠোরভাবে বাস্তবায়নে তারা ৯২টি বাণিজ্যিক জাহাজের পথ ঘুরিয়ে দিয়েছে, ৩টি অকেজো করেছে এবং ২টি দখল করেছে।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ এক বক্তব্যে বলেন, মার্কিন প্রশাসনের বোঝা উচিত যে খেলার নিয়ম এখন বদলে গেছে। ইরানের স্বার্থ ও নিরাপত্তায় যেকোনো আঘাতের জবাবে আরও দ্রুত, কঠোর এবং বেদনাদায়ক প্রতিক্রিয়া জানানো হবে। গালিবাফ স্বীকার করেন যে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটিতে মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব এবং মুদ্রা বাজার চরম অস্থিরতার মুখোমুখি, তবে দেশের জনগণকে সাথে নিয়ে এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করা হবে।
অন্যদিকে, ইরানের অর্থনীতি মন্ত্রী আলী মাদানিজাদেহ জানিয়েছেন, মার্কিন অর্থনৈতিক চাপ ও অবরোধের জবাব ইরান নিজেদের অর্থনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে দেবে এবং ওয়াশিংটনের ট্রেজারি বিভাগের চাপ দেখে ইরান তার সিদ্ধান্ত বদলাবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি সচিব ক্রিস রাইট দাবি করেছেন, হরমুজ প্রণালী ও বিকল্প পাইপলাইনের মাধ্যমে বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ৯০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবাহিত হচ্ছে, যা যুদ্ধপূর্ব সময়ের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। তবে হরমুজ অবরুদ্ধ থাকার কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টির জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স