ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত শেষ হলে মধ্যপ্রাচ্যে নিয়োজিত মার্কিন সামরিক সদস্য এবং গোয়েন্দা ঘাঁটির সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনার বিষয়টি নিয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোতে অতি গোপনে আলোচনা চলছে।
ছয়টি নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাতে জানা গেছে, ট্রাম্প প্রশাসন যদি এই সংঘাতের অবসান ঘটাতে সফল হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন উপস্থিতিতে একটি বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তন আসবে।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের ইরাক, আফগানিস্তান, সিরিয়া, ইরান, ইয়েমেন ও লিবিয়ায় যুদ্ধ পরিচালনা এবং সামরিক অভিযানের জন্য যে সুবিশাল অবকাঠামো গড়ে তুলেছিল, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে তা থেকে মার্কিন কৌশল অনেকটাই সরে আসবে।
ইরানের বিরুদ্ধে চলমান লড়াইয়ে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন অবকাঠামোর নানা স্পর্শকাতর দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে। ইরানি হামলায় একের পর এক ঘাঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং আমেরিকানদের আছে ক্রমেই অজনপ্রিয় হয়ে ওঠা এই যুদ্ধে অন্তত ১৮ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন আরও অনেকে।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে দুটি বিমানবাহী রণতরী ও এক ডজনেরও বেশি গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ারসহ প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনা ও বিশাল সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন রয়েছে। যুদ্ধের উত্তপ্ত মুহূর্তে সরিয়ে নেওয়া সিআইএ কর্মকর্তাদেরও আবার অঞ্চলে ফেরত পাঠানো হচ্ছে।
তবে সংঘাত থামলেও যেসব সেনা থেকে যাবে, তাদের সুরক্ষায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এড়াতে ঘাঁটিগুলো মাটির নিচে বা ভূগর্ভে নেয়া হবে। দীর্ঘদিন ধরে পেন্টাগনে এই আলোচনা থাকলেও সাম্প্রতিক ইরানি হামলায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের ভয়াবহতা উন্মোচিত হওয়ায় বিষয়টি এখন নতুন তাগিদ পেয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধের পরবর্তী ভবিষ্যৎ নিয়ে স্পষ্ট কোনো সুনির্দিষ্ট কৌশল না থাকায়, সেনা কমানোর সমর্থক প্রেসিডেন্টের পছন্দকে মাথায় রেখেই সামরিক কর্মকর্তারা এসব আগাম পরিকল্পনা সাজাচ্ছেন। কোনো প্রত্যক্ষ নির্দেশনা না থাকলেও ট্রাম্পের দ্রুত সিদ্ধান্ত বদলের অভ্যাসের কথা মাথায় রেখে স্ব-উদ্যোগেই পেন্টাগন ও সিআইএ এই পর্যালোচনা চালাচ্ছে।
ইরানের সাম্প্রতিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলোর মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সৌদি আরবের রিয়াদে অবস্থিত সিআইএ’র মূল ঘাঁটিটি ইরানি হামলায় প্রায় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। এছাড়া বাহরাইন, কাতার, সৌদি আরব এবং কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাসমূহে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে এবং সেখানে ক্ষতির পরিমাণ অত্যন্ত গুরূত্বর।
স্থায়ী ঘাঁটির বিশাল ব্যয় ও ঝুঁকি এড়াতে সিআইএ এবং বিশেষ সামরিক ইউনিটগুলো ভাবছে, স্থায়ী ঘাঁটি না রেখে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরাসরি এসে মিশন পরিচালনা করে আবার ফিরে যাওয়ার কৌশল নেয়া যায় কি না। এ কারণে ধ্বংসপ্রাপ্ত বা ক্ষতিগ্রস্ত পরিকাঠামো বিপুল খরচের কারণে পুনর্নির্মাণ না করার বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে। পেন্টাগন কম্পট্রোলার স্পষ্ট জানিয়েছেন, তারা ক্ষতিগ্রস্ত ঘাঁটিগুলো আদৌ পুনর্নির্মাণ করবেন কি না, তা নির্ভর করবে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের কৌশলগত অবস্থানের সিদ্ধান্তের ওপর।
১৯৯৮ সাল থেকে মধ্যপ্রাচ্যে ২৭,০০০ সেনা রেখে মার্কিন ঘাঁটি প্রসারের যে সূচনা হয়েছিল, ৯/১১-এর পর তা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের সময় সেই সংখ্যা দাঁড়ায় আড়াই লাখে। পরবর্তীতে বারাক ওবামা সেনা কমানোর উদ্যোগ নিলেও আইএস-এর উত্থান ও আঞ্চলিক নানা উত্তেজনার কারণে মার্কিন উপস্থিতি পুরোপুরি প্রত্যাহার করা সম্ভব হয়নি। এশিয়ামুখী হওয়ার প্রতিটি মার্কিন কূটনৈতিক প্রতিশ্রুতি শেষ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের নতুন কোনো না কোনো সংকটে চাপা পড়ে গেছে।
বর্তমানে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর নিজেদের সামরিক নিরাপত্তার ব্যয়ভার বেশি দেওয়ার চাপ সৃষ্টি করছে ওয়াশিংটন। সামরিক বিকল্পের মাধ্যমে ইরানকে কাবু করা সম্ভব নয় বলে সেনা কর্মকর্তারা প্রেসিডেন্টকে সতর্ক করার পর ট্রাম্প অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর নীতি নিয়েছেন।
অন্যদিকে, সিআইএ’র ক্ষেত্রেও ৯/১১-এর আগের সামরিক গোয়েন্দা কাঠামোর বদলে বর্তমান বাস্তবতায় নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। পঞ্চম নৌবহরের প্রধান দপ্তর বাহরাইনে শিগগিরই কর্মীদের স্থায়ীভাবে ফেরত পাঠানো সম্ভব নয় বলে মার্কিন নৌবাহিনী পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে।
তথ্যসূত্র: সিএনএন