বাব আল-মান্দেব প্রণালী নিয়ন্ত্রণে ইরানপন্থী গোষ্ঠি!

মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়া তীব্র সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই এবার লোহিত সাগরের অত্যন্ত কৌশলগত পয়েন্ট বাব আল-মান্দেব প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ জোরদার করতে শুরু করেছে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা। শুক্রবার চারটি সরকারি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, হুথিরা বাব আল-মান্দেব প্রণালীর কৌশলগত পেরিফ ও হানিশ দ্বীপের পাশাপাশি লোহিত সাগর উপকূলীয় গুরুত্বপূর্ণ শহর মোখা ও দুবাবের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। হরমুজ প্রণালীর অবরুদ্ধ পরিস্থিতির পর হুথিদের এই ঝটিকা অভিযানে বৈশ্বিক তেল পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থা এক অভূতপূর্ব সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে।

Yeman Crisis 02
পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালী ইরান কার্যত বন্ধ করে দেয়ায় বিশ্বের বৃহত্তম তেল রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরব লোহিত সাগরের বিকল্প এই রুট ব্যবহার করে আসছিল। তবে হুথিরা বাব আল-মান্দেব প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নেয়ায় সৌদি আরবের অপরিশোধিত তেল সরবরাহ মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) জানিয়েছে, হুথিদের হামলার কারণে আগস্ট মাসে সৌদির তেল সরবরাহ দৈনিক ২.৩ মিলিয়ন ব্যারেল কমে ৬০ লাখ ব্যারেলে নেমে এসেছে, যা তিন দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন। অন্যদিকে, মে মাসের পর এই প্রথম আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে।

একই সঙ্গে উপগ্রহ চিত্রে সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনের কাছাকাছি এলাকায় ধোঁয়া দেখতে পাওয়া গেছে। হরমুজ বন্ধ থাকায় বিকল্প হিসেবে রিয়াদ এই পাইপলাইন ব্যবহার করে লোহিত সাগরের বন্দরে তেল পাঠাচ্ছিল। তবে, কোনো দুর্ঘটনার খবর এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেনি সৌদি কর্তৃপক্ষ বা আরামকো।

Yeman Crisis 04
সৌদির মার্কিন সহায়তা প্রার্থনা:
পরিস্থিতি হাতছাড়া হয়ে যাওয়ায় সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে অন্তত দুবার টেলিফোনে যোগাযোগ করে হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের অনুরোধ জানিয়েছেন। তবে ওয়াশিংটন আপাতত সরাসরি কোনো সামরিক অপারেশনে না জড়িয়ে শুধু গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান ও লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে এই ক্রমবর্ধমান সংঘাত এবং তেলের ঊর্ধ্বগতির প্রভাব নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় বড় ধরনের ধস নামিয়েছে।

হুথিদের অবস্থান ও সরকারের পাল্টা প্রস্তুতির ঘোষণা: ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সৌদি-সমর্থিত সরকার স্বীকার করেছে, ক্ষিপ্র আক্রমণের মুখে তাদের সামরিক বাহিনী ওই এলাকাগুলো থেকে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে। সামরিক মুখপাত্র কর্নেল মাজেদ আল-নাজিলি জানিয়েছেন, কৌশলগত এলাকাগুলো পুনর্দখলে তারা বিমান ও ভারী অস্ত্র ব্যবহার করে পাল্টা অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবং সাধারণ মানুষকে সংঘাতপূর্ণ সড়কগুলো এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছেন।

অন্যদিকে হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিসা সারি জানিয়েছেন, সৌদি জাহাজ ছাড়া বাকি সব দেশের বাণিজ্যিক নৌযানের জন্য এই জলপথ উন্মুক্ত ও নিরাপদ থাকবে। তবে সৌদি হামলার অবসান না হওয়া পর্যন্ত তারা তাদের এই সামুদ্রিক অবরোধ ও সামরিক হামলা চালিয়ে যাবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

Yeman Crisis 03
ইরানের বিপ্লবী গার্ডসের প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় হুথিরা লোহিত সাগরে এই নতুন ফ্রন্ট খুলেছে বলে জানা গেছে। যদিও ইরান প্রকাশ্যে হুথিদের ওপর সামরিক নিয়ন্ত্রণের কথা অস্বীকার করে আসছে, তবে বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে লোহিত সাগর ও হরমুজ, দুই রুটেই তেহরানের প্রভাব বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর বিশাল চাপ সৃষ্টি করেছে। আগামী সোমবার ওমানে ইরাক ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের একটি কূটনৈতিক বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স