লোহিত সাগরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালীর কৌশলগত উপকূলীয় এলাকা হাতছাড়া হয়ে সামরিক ও ভূ-রাজনৈতিকভাবে চরম বিপাকে পড়েছে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এবং সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনী। হুথি বিদ্রোহীদের আকস্মিক তাণ্ডবে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই অঞ্চল হারিয়ে সরকার এখন অস্তিত্ব সংকটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সৌদি জোটের বিপুল সামরিক সহায়তা ছাড়া ইয়েমেন সরকারের সামনে আপাতত ঘুরে দাঁড়ানোর কোনো পথ খোলা নেই।
ইয়েমেনের পশ্চিমের শহর তাইজ থেকে আসা খবর অনুযায়ী, সরকারি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা অঞ্চলগুলোর দিকে ক্রমশ ঘনিয়ে আসছে বিদ্রোহী আনসার আল্লাহ হুথি যোদ্ধারা। নিয়ন্ত্রণ ও ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারে সরকারি বাহিনী মরিয়া হলেও রণক্ষেত্রে বিদ্রোহী যোদ্ধাদের ঠেকানোর মতো পর্যাপ্ত স্থলশক্তি তাদের নেই।
সম্প্রতি পশ্চিম তাইজে অতিরিক্ত সৈন্য পাঠিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করা হলেও শেষ মুহূর্তে হুথিরা সেই ফ্রন্টলাইন ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ে।
ইউরোপিয়ান ইনস্টিটিউট অব পিসের জ্যেষ্ঠ ইয়েমেন উপদেষ্টা হিশাম আল-ওমাইসির মতে, সৌদি জোটের অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতার পূর্ণ সুযোগ নিয়ে হুথিরা এই অগ্রগতি হাসিল করেছে। ফলে লড়াই থামার কোনো লক্ষণ নেই, বরং রক্তক্ষয় আরও বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
তীব্র সহিংসতা ও মানবিক বিপর্যয়: গত ৩ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই ভয়াবহ সামরিক উত্তেজনার বলি হয়ে ইয়েমেনের তাইজ, আল-হুদায়দাহ এবং মারিব প্রদেশে ১৫০ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং অন্তত ২০০ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। ইয়েমেনের মানবাধিকার বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বরাতে সরকারি বার্তা সংস্থা 'সাবা' জানিয়েছে, হুথিদের ছোড়া ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, আত্মঘাতী ড্রোন এবং ভারী গোলাবর্ষণে সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি ও বাস্তুচ্যুতদের শিবির ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
সংঘর্ষের কারণে এলাকা ছেড়ে পালিয়েছেন প্রায় ৯০ হাজার মানুষ। সীমান্ত পেরিয়ে অন্তত ২,০০০ নাগরিক ইতোমধ্যে জিবুতিতে আশ্রয় নিয়েছেন, যা প্রকাশ করছে যে এই মানবিক সংকটের আঁচ এখন ইয়েমেনের সীমা ছাড়িয়ে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতেও ছড়াচ্ছে। ইয়েমেন সরকার জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোকে অবিলম্বে নিরীহ নাগরিকদের রক্ষা ও হামলা বন্ধে কড়া পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছে।
কৌশলগত হাতবদল ও চূড়ান্ত অনিশ্চয়তা: সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইয়েমেনের ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। বাব আল-মানদেব প্রণালীতে অবস্থিত কৌশলগত মায়্যুন দ্বীপসহ (পেরিম দ্বীপ) লোহিত সাগর উপকুলের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ডিস্ট্রিক্ট নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দাবি করেছে হুথিরা।
পাল্টা হিসেবে ইয়েমেন সরকার দাবি করেছে, তারা সৌদি সীমান্তঘেঁষা আল-জাওফ প্রদেশে কিছুটা অগ্রসর হয়ে প্রাদেশিক রাজধানী আল-হাজমের দিকে এগোচ্ছে এবং মোকহা, তাইজ, লাহিজ ও আল-ধালি প্রদেশে হুথিদের সামরিক যানবাহন ধ্বংস করতে বিমান হামলা চালিয়েছে।
২০১৪ সালে হুথিরা রাজধানী সানা দখল করার পর ২০১৫ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন আরব জোট সরকার সমর্থনে যুদ্ধে নামে। দীর্ঘ ১২ বছরের এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে কোনো পক্ষই অপর পক্ষকে সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করতে পারেনি। বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক ভারসাম্য বারবার থমকে দাঁড়ানোয় শেষ পর্যন্ত শান্তি আলোচনার টেবিল ছাড়া এই সংঘাত সমাধানের দ্বিতীয় কোনো পথ খোলা নেই।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা-আনাদোলু এজেন্সি