রিয়াদ বিমানবন্দরে আগুন-বিস্ফোরণ, অচল আকাশপথ

ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি প্রতিরোধ যোদ্ধারা সৌদি আরবের অবকাঠামো ও বিমানবন্দর লক্ষ্য করে নজিরবিহীন ও ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে। সৌদির আকাশপথ এবং দেশটির অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র ও বিদ্যুৎ-জ্বালানি কেন্দ্রগুলো স্তব্ধ করে দেওয়ার লক্ষ্যে পরিচালিত এই হামলায় চলতি সপ্তাহে এ পর্যন্ত অন্তত তিনজনের প্রাণহানি ঘটেছে।

হামলায় রিয়াদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রাখা একটি বাণিজ্যিক বিমানে আগুন ধরে ধোঁয়ার কুণ্ডলী আকাশে উঠতে দেখা গেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থা ‘লুফথানসা’ এবং ‘এয়ার ইন্ডিয়া’ রিয়াদে তাদের সমস্ত ফ্লাইট সাময়িকভাবে স্থগিত ঘোষণা করেছে।

Yemen Attack 04
রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং তেল স্থাপনাগুলোতে হুতিদের চালানো জোড়া ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণের পর বিমানবন্দর সংলগ্ন এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বিমান চলাচল পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা 'সিরিয়াম'-এর তথ্য অনুযায়ী, রিয়াদ বিমানবন্দর থেকে ছেড়ে যাওয়ার নির্ধারিত প্রায় ৫০ শতাংশ ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে।

সৌদির প্রতিরক্ষা বাহিনীর দাবি, তারা রিয়াদ এবং খামিস মুশাইত অভিমুখে ছোঁড়া দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আকাশে ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে। তবে ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষের আঘাতে রিয়াদের একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুল ও একটি চিকিৎসাকেন্দ্র আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

Yemen Attack 02
বৃহস্পতিবার সকালে বিকট বিস্ফোরণের পর রিয়াদের কিং আবদুল্লাহ বাণিজ্যিক এলাকার বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মীদের ঘরে বসে কাজ করার (ওয়ার্ক ফ্রম হোম) নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ইয়েমেনের পুনরুজ্জীবিত গৃহযুদ্ধে আন্তর্জাতিক সমর্থিত সরকারি বাহিনীকে সৌদি আরব সামরিক সমর্থন দেয়ায় প্রতিশোধ হিসেবেই এই হামলা চালানো হচ্ছে বলে জানিয়ে দিয়েছে হুথিরা। অন্যদিকে হুতিদের দখল থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ড পুনরুদ্ধার করতে জাতিসংঘ স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে সব ধরণের সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে রিয়াদ।

এই যুদ্ধটি মূলত চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সরাসরি সামরিক সংঘাতের এক বিপজ্জনক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা বিস্তৃতি, যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। লোহিত সাগরের কৌশলগত বাবেল মান্দেব প্রণালী সংলগ্ন দক্ষিণ-পশ্চিম ইয়েমেনে হুতিদের অগ্রগতি রুখতে মিত্র দেশগুলোর কাছে সামরিক ও প্রযুক্তিগত জরুরি সহায়তার আবেদন জানিয়েছে সৌদি আরব।

Yemen Attack 01
সৌদি আরবকে কৌশলগত সুরক্ষা দিতে ইতোমধ্যেই এগিয়ে এসেছে ন্যাটো সদস্য তুরস্ক। আঙ্কারার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা সামরিক সরঞ্জাম, গোয়েন্দা তথ্য এবং অত্যাধুনিক অস্ত্র ব্যবস্থা পাঠিয়ে রিয়াদকে সহায়তা করছে। অন্যদিকে, নিজের দেশের দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ কাটিয়ে ওঠা সত্ত্বেও দামেস্ক এখন সৌদি আরবের প্রতিরক্ষায় বা হুতিদের বিরুদ্ধে যৌথ অভিযানে সেনা পাঠানোর বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছে বলে জানা গেছে।

২০২২ সালে অস্ত্রবিরতির মাধ্যমে ইয়েমেনের দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ কিছুটা ঝিমিয়ে পড়লেও সম্প্রতি তা নতুন করে তীব্র রূপ ধারণ করেছে। গত মাসে লোহিত সাগর উপকূল ও গুরুত্বপূর্ণ বাব এল-মান্দেব প্রণালীর বেশ কিছু অংশ হুতিরা দখল করে নিলে সৌদি সমর্থিত বাহিনী তাদের ওপর পাল্টা আক্রমণ চালায়।

তবে পার্বত্য অঞ্চলের জটিল যুদ্ধে হুতিরা ইয়েমেনের তৃতীয় বৃহত্তম শহর ‘তাইজ’ ঘেরাও করে ফেলে অগ্রগতি ধরে রেখেছে। আন্তর্জাতিক সমর্থিত সরকার ও হুতিদের এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত নতুন করে এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে, যার ফলে মাত্র কয়েক সপ্তাহে প্রায় দুই লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে বাধ্য হয়েছে।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স