ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের নজিরবিহীন ও ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় থমথমে রূপ নিয়েছে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ। রাজধানীর আকাশ জুড়ে ক্ষণে ক্ষণে বিকট বিস্ফোরণের শব্দ ও মিসাইলের ধ্বংসাবশেষ পড়ে চরম আতঙ্ক তৈরি হয়েছে সাধারণ মানুষের মনে।
পরিস্থিতি এতটাই বেগতিক যে, আন্তর্জাতিক প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম 'দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল'-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ৪১ বছর বয়সী সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান (এমবিএস) এখন ভারী নিরাপত্তার বলয়ে বাঙ্কার সমৃদ্ধ একের পর এক সুরক্ষিত রাজপ্রাসাদে স্থান পরিবর্তন করে দিন কাটাচ্ছেন।
রিপোর্টে বলা হয়েছে, রিয়াদের ওপর হামলা তীব্র হওয়ার পর থেকেই নিজের ব্যক্তিগত সুরক্ষা বহর নজিরবিহীনভাবে বাড়িয়ে দিয়েছেন ক্রাউন প্রিন্স। গত মঙ্গলবার রক্তদান কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার পর থেকে আর তাঁকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি।
এদিকে গত শনি ও রোববার রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুথিদের রক্তক্ষয়ী হামলায় অন্তত ১২ জন প্রাণ হারান এবং শত শত মানুষ গুরুতর আহত হন। হামলায় দুটি টার্মিনালের ছাদ ধসে বিশাল ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। বিমানবন্দর ছাড়াও গত বৃহস্পতিবার মাঝআকাশে ধ্বংস করা এক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের বিধ্বংসী টুকরো শহরের একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুল ও ক্লিনিক কমপ্লেক্সে আছড়ে পড়লে বেসামরিক মানুষ চরম ঝুঁকির মুখে পড়ে।
হামলার পর রিয়াদের ফাইন্যান্সিয়াল ডিস্ট্রিক্ট, বিভিন্ন স্কুল এবং কূটনৈতিক পাড়া থেকে কর্মীদের অবিলম্বে ভবন খালি করা অথবা নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় পেট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের চরম সংকটে পড়েছে সৌদি আরব। বিশাল ভূখণ্ড ও রাজপ্রাসাদসহ জ্বালানি অবকাঠামো সুরক্ষায় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরাতে হিমশিম খাচ্ছে রিয়াদ।
হুথিদের এই হামলা সরাসরি আঘাত হেনেছে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের বহু কোটি ডলারের অর্থনীতি রূপান্তর প্রকল্প 'ভিশন ২০৩০'-এর ওপর।
‘নিয়ম’-এর মতো মেগাপ্রজেক্ট, ইস্টার্ন-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন এবং লোহিত সাগরের নৌপথ হুথিদের হুমকির মুখে পড়ায় বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা তলানিতে ঠেকেছে। চলতি অক্টোবরের শেষে রিয়াদে নির্ধারিত আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সম্মেলন বাতিল হওয়ার আশঙ্কার পাশাপাশি সৌদি অর্থ মন্ত্রণালয় সতর্ক করেছে, ২০২৬ সালে দেশটির অর্থনীতি ৩.৬ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে।
এই সংকটের মুখে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সামরিক সহায়তা দিতে দ্বিমত পোষণ করলেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, হুথিদের বিরুদ্ধে সৌদি হামলায় যোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। চরম আকাশ প্রতিরক্ষা সংকটে পড়া সৌদি আরব এখন পাকিস্তানসহ আন্তর্জাতিক বাজারের দ্বারে দ্বারে ঘুরছে নতুন এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমের খোঁজে। একসময় নিরাপদ ও বিলাসবহুল পর্যটনের স্বপ্ন দেখানো রিয়াদ আজ বাঙ্কার আর মিসাইল আতঙ্কে থমথমে এক সংঘাতপূর্ণ এলাকায় পরিণত হয়েছে।