ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক নজিরবিহীন ও রক্তক্ষয়ী ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সৌদির প্রধান কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ১৮ জন নিহত এবং ৩০০ জনেরও বেশি আহত হওয়ার ঘটনায় সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ সুরক্ষা ও ‘আর্লি ওয়ার্নিং’বা আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা নিয়ে তুমুল বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক এই প্রাণঘাতী হামলার ঠিক কয়েক দিন আগে থেকেই রিয়াদসহ বড় শহরগুলোতে হামলা সংক্রান্ত পাবলিক অ্যালার্ট বা মোবাইল সাইরেন বার্তা দেয়া রহস্যজনকভাবে বন্ধ রেখেছিল দেশটির সরকার।
যেখানে অন্যান্য উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশ, যেমন কাতার, বাহরাইন ও কুয়েত ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলার লক্ষণ দেখা মাত্রই সাইরেন বাজিয়ে ও মোবাইলে বার্তা পাঠিয়ে জনগণকে ঘরের মধ্যে বা নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার নির্দেশ দিয়ে থাকে, সেখানে সৌদি আরব সাম্প্রতিক সময়ে পুরোপুরি নীরব ভূমিকা পালন করে।
চলতি বছরের মে মাস থেকেই জাতীয় জরুরি ব্যবস্থা সংস্থা সাইরেন নোটিফিকেশন চালু করলেও হুথিদের হামলা বৃদ্ধি পাওয়ার পরই সেপ্টেম্বর থেকে হুট করে এই সতর্কবার্তাগুলো পাঠানো বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে কোনো পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই বিমানবন্দরে উপস্থিত বিমানযাত্রীদের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র এসে আছড়ে পড়ে, যার এক করুণ ও লোমহর্ষক চিত্র উঠে এসেছে দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত ভিডিও ফুটেজে।
পশ্চিমা এবং আরব কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, হামলা শুরুর আগেই মিত্র একাধিক পশ্চিমা দেশের পক্ষ থেকে সৌদি কর্তৃপক্ষকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, কেন এই অ্যালার্ট সিস্টেম বন্ধ করা হলো? এর জবাবে সৌদি কর্মকর্তারা অদ্ভুত যুক্তি দিয়ে জানান, মধ্যরাতে কিংবা অসময়ে বারবার অ্যালার্ট মেসেজ আসায় সাধারণ নাগরিকদের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটছে এবং তারা এ নিয়ে প্রচুর অভিযোগ জানাচ্ছিলেন! নাগরিকদের অস্বস্তি এড়ানো এবং দেশে এক ধরনের স্বাভাবিক পরিস্থিতি বজায় রাখার যে কৌশল রিয়াদ নেওয়ার চেষ্টা করেছিল, তা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক মধ্যপ্রাচ্য নীতি বিষয়ক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সৌদি সরকার একদিকে সামরিক অভিযান চালাতে চেয়েছিল, আবার অন্যদিকে দেশের ভেতরের জনগণ ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করতে চেয়েছিল যে দেশ সচল রয়েছে। কিন্তু আগে থেকে সতর্কবার্তা না দেওয়ার ফলে দেশের অভ্যন্তরে অনিশ্চয়তা ও আতঙ্ক আরও বহুগুণ বেড়ে গেছে। আন্তর্জাতিক একাধিক সংস্থা ও কূটনৈতিক মিশন সৌদি সরকারের এই ভূমিকাকে চরম ঝুঁকিপূর্ণ বলে আখ্যা দিয়েছে।
অন্যদিকে, তীব্র সমালোচনার মুখে সোমবার থেকে আবারও রিয়াদ এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় শহরগুলোর জন্য সতর্কবার্তা জারি করতে বাধ্য হয়েছে সৌদি সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত স্থান বা মিসাইল ধ্বংসের ছবি ও ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। রিয়াদে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ডাব্লিউপিসি এনার্জি কংগ্রেসে সৌদির জ্বালানিমন্ত্রী যুবরাজ আব্দুলআজিজ বিন সালমান দাবি করেছেন দেশ নিরাপদ, কিন্তু হামলার পর রক্তক্ষয়ী বিপর্যয় ও সতর্ক ব্যবস্থার ঘাটতি সৌদির সার্বিক আকাশ সুরক্ষাব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে এক বিরাট প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স