হরমুজ প্রণালীতে সামরিক ইউনিট মোতায়েন করলো ইরান

বিশ্বের অন্যতম প্রধান ও স্পর্শকাতর জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালী ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে সামরিক আধিপত্য বিস্তারের চরম ও বেপরোয়া লড়াই শুরু হয়েছে। ওয়াশিংটনের অনমনীয় অর্থনৈতিক অবরোধ এবং কঠোর নিষেধাজ্ঞার জবাবে এবার হরমুজ প্রণালীতে নিজেদের নজরদারি ও সামরিক উপস্থিতি বহুগুণ বাড়িয়ে নতুন বিশেষ বলয় তৈরি করেছে তেহরান।

মঙ্গলবার ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম প্রেস টিভির এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ওমান সাগর এবং আরব সাগরের পূর্বাংশ জুড়ে ইরানি নৌবাহিনীর নতুন কৌশলগত সামরিক ইউনিট মোতায়েন করা হয়েছে। কোনো বাণিজ্যিক জাহাজ তাদের ট্রান্সপন্ডার বা সিগন্যাল বন্ধ রাখলে সেটিকে শত্রুভাবাপন্ন হিসেবে চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।

Strait of Hormuz
এছাড়া রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এক উচ্চপদস্থ ইরানি কর্মকর্তা জানান, যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে এবং ওয়াশিংটনের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করতে গত ১০ দিন ধরে হরমুজ প্রণালীতে তাদের হামলার ধরন ও গতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে।

গত ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে ইরান-ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর হামলার ঘটনা এখন রেকর্ড মাত্রায় পৌঁছেছে। সামুদ্রিক নজরদারি সংস্থা কেপলার ও যুক্তরাজ্যের ইউকেএমটিও-র দেয়া তথ্য অনুযায়ী, শুধু ৬ অক্টোবর থেকে ১৪ অক্টোবরের মধ্যে হরমুজ প্রণালীতে অন্তত ১৫টি আলাদা জাহাজে বিধ্বংসী হামলা চালানো হয়েছে।

Strait of Hormuz 02
বিশ্বব্যাপী অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ২০ শতাংশ সরবরাহকারী এই প্রণালী দিয়ে তেল পরিবহন নজিরবিহীনভাবে কমে গেছে। গত ৮ অক্টোবরেও যেখানে প্রতিদিন ২০.৮ মিলিয়ন ব্যারেল তেল হরমুজ হয়ে পরিবাহিত হতো, সেখানে ১১ অক্টোবর মাত্র ২.৯ মিলিয়ন ব্যারেল তেল পরিবাহিত হয়েছে, যা চলতি মাসের সর্বনিম্নে। এর জের ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের (ব্রেন্ট ক্রুড) দাম ব্যারেল প্রতি ১০৬.৫৮ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে।

এই সংঘাতের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশেষ জ্বালানি ট্রানজিট বা ‘শাটল সিস্টেম’ ধ্বংস করার ঘোষণা দিয়েছে ইরান। তবে মার্কিন কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ড (সেন্টকম) ইরানের এই দাবিকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে। সেন্টকমের পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বলা হয়েছে, ইরানি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নৌপ্রধানের আদতে কোনো কার্যকর নৌবাহিনীই নেই। আমেরিকান বাহিনী এবং তাদের আঞ্চলিক মিত্ররাই স্পষ্টত হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণ করছে।

Strait of Hormuz 01
মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্র তাদের রাডার সক্ষমতা ধ্বংস করে দেওয়ার পর ইরান এখন ছোট ছোট মাছ ধরার ট্রলার দিয়ে মার্কিন ও মিত্রবাহিনীর জাহাজের তথ্য সংগ্রহ করছে। সম্প্রতি মার্কিন বাহিনী এমন একটি গুপ্তচর ট্রলারকে সরাসরি ধ্বংস করে দিয়েছে।

যুক্তরাজ্যের ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির রাজনৈতিক বিশ্লেষক ক্রিস ফেদারস্টোন আল জাজিরাকে জানান, হরমুজ প্রণালীর ওপর আদতে একক কোনো দেশের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই। ইরান বারবার হামলার মাধ্যমে প্রমাণ করতে চাইছে যে ট্রাম্প প্রশাসনও জলপথটির নিরাপত্তায় ব্যর্থ। এর মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে যুদ্ধবিরতি এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি আদায় করাই তেহরানের প্রধান কৌশল। ফলে আসন্ন দিনগুলোতে বিশ্ব বাজারে অর্থনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা আরও চরম রূপ নেবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।