আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই ইরানের বিরুদ্ধে অন্তত এক সপ্তাহব্যাপী বিস্তৃত সামরিক অভিযান চালাতে যৌথ প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। সম্ভাব্য এই হামলায় ইরানের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্ব, পারমাণবিক স্থাপনা, জ্বালানি খাত ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ ছড়ানো ঠেকাতে মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো শেষ মুহূর্তের তৎপরতা জোরদার করেছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন ও ইসরাইলি কর্মকর্তারা প্রায় সাত দিনব্যাপী এই সামরিক অপারেশনের রূপরেখা তৈরি করছেন। যদিও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনও তাঁর শেষ মতামত দেননি। তবে বার্তা সংস্থা এপি জানিয়েছে, ওয়াশিংটন এরিমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের সতর্ক করে দিয়ে সম্ভাব্য ইরানি পাল্টা আঘাতের মুখোমুখি হবার প্রস্তুতি নিতে বলেছে।
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, তাঁর লক্ষ্য কেবল ইরানের পারমাণবিক ক্ষমতা দুর্বল করাই নয়, বরং সেখানকার শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন (রেজিম চেঞ্জ) ঘটানো। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তিনি এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন বলেও জানান।
রণক্ষেত্রে নতুন সেনা ও পেন্টাগনে বড় রদবদল: পারস্য উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি অভূতপূর্ব পর্যায়ে উন্নীত করা হয়েছে। প্রায় ৯ হাজার সেনাসহ বিমানবাহী রণতরী ‘ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্ট’ ও উভচর যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করা হয়েছে। এর ফলে ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মোট সেনাসংখ্যা ২০ হাজার অতিক্রম করতে পারে, যার সঙ্গে প্রস্তুত রয়েছে শত শত যুদ্ধবিমান। এর মধ্যেই পেন্টাগনের স্ট্র্যাটেজি ও পলিসি বিষয়ক শীর্ষ কর্মকর্তা লেফট্যানেন্ট জেনারেল ব্রেট সিলভিয়াকে আকস্মিক বরখাস্ত করেছেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ, যা এই যুদ্ধের সামরিক পরিকল্পনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
যুদ্ধ এড়াতে কাতার, সৌদি ও ওমানের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা: যে কোনো মূল্যে নতুন সংঘাত এড়াতে সংযুক্ত আরব আমিরাত সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে। অন্যদিকে সৌদি আরব মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে তড়িঘড়ি না করে আলোচনার জন্য আরও সময় দেওয়ার তাগিদ দিয়েছে।
অ্যাক্সিওস জানায়, কাতার বর্তমানে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সমঝোতার চেষ্টা চালাচ্ছে। প্রস্তাবিত চুক্তি অনুযায়ী, পূর্বে হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার পরিদর্শকদের আবারও প্রবেশের অনুমতি দেয়া হতে পারে। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর থেকে তেল রপ্তানির ওপর কড়াকড়ি শিথিল এবং আটকে থাকা মানবিক ফান্ড হস্তান্তরের সুযোগ দিতে পারে। ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়িদ বদর আল বুসাইদি উপসাগরীয় দেশগুলো, ইরান ও ইরাককে নিয়ে একটি 'অনাগ্রাসন চুক্তি'র প্রস্তাব দিয়েছেন।
জেডি ভ্যান্সের মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা: চলমান থমথমে পরিস্থিতির মধ্যে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের মাধ্যমে ইরানের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ট্রাম্প। ট্রাম্প জানান, মূলত ওষুধ ও চিকিৎসা সহায়তার বিষয়ে আলোচনার জন্য তিনি ভ্যান্সকে অনুমতি দেন। তবে ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ ও ‘অ্যাক্সিওস’ দাবি করেছে, ভ্যান্স ও ইরানি কর্মকর্তাদের আলোচনায় পারমাণবিক আলোচনা পুনরুজ্জীবিত করার সম্ভাবনা নিয়েও কথা হয়েছে।
এদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, আত্মরক্ষার প্রস্তুতি রাখার পাশাপাশি তেহরান কূটনৈতিক সমাধানের দরজাও খোলা রেখেছে।
মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও যুদ্ধের ব্যয়: আট মাস ধরে চলা এই যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। পেন্টাগনের হিসাবমতে, এই যুদ্ধে মার্কিন করদাতাদের খরচ ইতোমধ্যেই ৪৭.১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। নির্বাচন সামনে রেখে অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষ রিপাবলিকানদের ব্যাকফুটে ঠেলে দিয়েছে। এই চাপের মুখে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই হয়তো এই সংঘাতের একটি চূড়ান্ত ফয়সালা হয়ে যাবে।