ইরানে সরকার পরিবর্তনের উচ্চাশা নিয়ে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অথচ এই যুদ্ধের প্রভাবেই খোদ ওয়াশিংটনে তাঁর নিজের রাজনৈতিক ক্ষমতার ভিত নড়ে গেছে। আকাশচুম্বী জ্বালানি তেলের দাম আর দীর্ঘায়িত যুদ্ধের ক্লান্তিতে জর্জরিত মার্কিন ভোটাররা মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ তুলে দিয়েছেন ডেমোক্র্যাটদের হাতে।
এর ফলে এক কোণঠাসা ও দুর্বল প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের সামনে এখন দুটি পথ খোলা, একটি সম্মানজনক কূটনৈতিক সমঝোতা, অন্যটি আরও ভয়ংকর সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি।
তেহরান এবং মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের কাছে মার্কিন মধ্যবর্তী এই নির্বাচনকে সরাসরি ইরান যুদ্ধের ওপর এক ধরনের গণরায় হিসেবে দেখা হচ্ছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, ডেমোক্র্যাটদের ভূমিধস বিজয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর কর্মকর্তারা প্রথমে একেবারে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন। এমনকি এক সূত্র রসিকতা করে বলেই ফেলেছেন, আমেরিকাতে অবশেষে রেজিম চেঞ্জ ঘটিয়ে দিল ইরান!
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ বিমান হামলার মধ্য দিয়ে এই যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল। জবাবে তেহরানও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তু এবং হরমুজ প্রণালীতে জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটিয়েছিল। মার্কিন-ইসরাইলি যৌথ অভিযানে ইরানের সামরিক শক্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও যুদ্ধের কোনো চূড়ান্ত বা পরিষ্কার সুরাহা হয়নি, এমনকি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিও বন্ধ করা যায়নি।
উপসাগরীয় সরকারি মহলের ঘনিষ্ঠ দুই বিশেষজ্ঞের মতে, কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটরা চলে আসায় ট্রাম্পের সামরিক হাত অনেকটাই বাঁধা পড়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে তাঁর ওপর একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর চাপ অনেক বেশি। ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে সীমিত আকারে কিছু হামলা চালিয়ে সেগুলোকে বড় বিজয় হিসেবে প্রচার করে ট্রাম্প এই সংঘাতের ইতি টানার চেষ্টা করতে পারেন, বিশেষ করে যখন চীন সংকট সমাধানে মধ্যস্থতার চেষ্টা জোরদার করেছে।
তবে ইরান যদি এমন কোনো বিজয় দাবি করে যা ট্রাম্পকে পরাজিত হিসেবে প্রতিপন্ন করে, তবে তা মার্কিন প্রেসিডেন্টকে আরও বেপরোয়া করে তুলতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করছেন বিশ্লেষকরা।
এদিকে ঠিক এক সপ্তাহ আগে ইসরাইলের নির্বাচনেও এই যুদ্ধের অন্যতম কুশীলব প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বড় ধাক্কা খেয়েছেন। ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে তাঁর ডানপন্থী জোট ১২০ আসনের কংগ্রেসে মাত্র ৫৩টি আসন পেয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাতে ব্যর্থ হয়। ফলে দুই রাজনৈতিক নেতা—ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু, উভয়েই এখন নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ রক্ষায় সংঘাত কমানোর বদলে নতুন কোনো উত্তেজনার পথ বেছে নেন কি না, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে তীব্র শঙ্কা।
আবুধাবির এমিরেটস পলিসি সেন্টারের প্রধান ইবতেসাম আল-কেতবি মনে করেন, মার্কিন নির্বাচনের ফল ট্রাম্পের জন্য সমঝোতাকে জরুরি করে তুলেছে, তবে ইরানের জন্য তা সহজ করেনি। তেহরান যদি এই পরিস্থিতিকে আমেরিকার মনোবল ভেঙে পড়ার প্রমাণ হিসেবে ভুল বোঝে, তবে তা ট্রাম্পকে নতুন কোনো সামরিক বাড়াবাড়ির দিকে ঠেলে দিতে পারে। উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো চায় হরমুজ প্রণালীতে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রেখে এই যুদ্ধের স্থায়ী অবসান ঘটুক, কোনো অস্থায়ী বা ত্রুটিপূর্ণ চুক্তি যেন ভবিষ্যতে আরেকটি বড় সংকটের বীজ না বোনে।
অন্যদিকে তেহরান ট্রাম্পের এই রাজনৈতিক বিপাকে উল্লাস প্রকাশ করলেও পূর্ণ সতর্কাবস্থায় রয়েছে। ইরানের প্রধান আলোচক একে ‘যুদ্ধের বিরুদ্ধে বড় ‘না’ সূচক রায়’ বলে অভিহিত করেছেন। তবে ইরানের সুপ্রিম লিডার মোজতামা খামেনি ‘বিনা শর্তে আত্মসমর্পণের সামান্য প্রবণতাও’ বরদাশত না করার হুশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালী নিয়ে নিজেদের অবস্থানে তারা একচুলও নড়বেন না। সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজনৈতিক বিশ্লেষক আব্দুলখালেক আব্দুল্লাহর মতে, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইলের চেয়ে এখন তেহরানের পক্ষ থেকেই বড় ধরনের ভুল হিসাবের ঝুঁকি বেশি রয়েছে।
সৌদিভিত্তিক গালফ রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান আব্দুল আজিজ সাগের সতর্ক করে বলেছেন, এই নির্বাচনী পরাজয় ট্রাম্পকে পিছু হটার বদলে বরং আরও আক্রমণাত্মক করে তুলতে পারে। কারণ তাঁর দ্বিতীয় ও শেষ মেয়াদ হওয়ায় এবং সামনে আর কোনো নির্বাচন না থাকায় হারানোর কিছু নেই; বরং নিজের প্রেসিডেন্ট পদ ও ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার সুরক্ষিত করতে তিনি ক্ষমতা ছাড়ার আগেই ইরান ইস্যুটির ‘পূর্ণ নিষ্পত্তি’ করতে চাইতে পারেন।
লেবানিজ রাজনৈতিক ভাষ্যকার সারকিস নাওম মনে করেন, এই পরাজয়ের ফলে তেহরানের সঙ্গে আলোচনায় ট্রাম্পের দরকষাকষির ক্ষমতা অনেকটাই কমে গেছে।
কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটরা ক্ষমতা নেওয়ার পর ট্রাম্প প্রশাসন, তাঁর পরিবার ও ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক তদন্ত শুরু করার পরিকল্পনা করছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের মিত্ররাও আশঙ্কা করছে, ওয়াশিংটনের এই ক্ষমতার পালাবদল কেবল ইরান যুদ্ধের গণ্ডি পেরিয়ে ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসায়িক স্বার্থের দিকেও তদন্তের হাত বাড়াতে পারে, যা নতুন রাজনৈতিক ঝড়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স