ইরানের ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্রের একের পর এক সীমিত সামরিক হামলা, বিপরীতে তেহরানের পারমাণবিক নীতি কৌশলগদ কেশম দ্বীপে সম্প্রতি মার্কিন হামলার পর আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে একটি প্রশ্ন: ডোনাল্ড ট্রাম্প কি ইরানে আরও বড় সামরিক অভিযান চালাতে যাচ্ছেন, নাকি শেষ মুহূর্তে কূটনীতির জয় হবে?
এরই মধ্যে সামাজিক মাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে চাউর হয়েছে, আসন্ন ৯ নভেম্বর কি যুক্তরাষ্ট্র ইরানে কোনো বড় ধরনের হামলা চালাতে পারে? এমনকি ইরানের ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক কেন্দ্র পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের মতো কাল্পনিক দৃশ্যপট নিয়েও আলোচনা চলছে।
কেশম দ্বীপে নতুন হামলা ও ট্রাম্পের হুমকি: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিশ্চিত করেছেন, মার্কিন বাহিনী কৌশলগত হরমুজ প্রণালীর কাছে কেশম দ্বীপে ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর ছোটখাটো হামলা চালিয়েছে। তার দাবি, মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে তারা একটি নতুন বিমান বিধ্বংসী ব্যবস্থা ধ্বংস করে দিয়েছে। এর আগে গত মঙ্গলবার মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের হারের পর ট্রাম্প বলেছিলেন, প্রয়োজন হলে আমাকে হয়তো বাকি দেশটাও ধ্বংস করতে হতে পারে, খুব শিগগিরই সব পরিষ্কার হবে। তবে পেন্টাগনের সীমিত এসব আক্রমণ নির্দেশ করে না যে, ট্রাম্প ইতিমধ্যেই বড় কোনো সর্বাত্মক যুদ্ধের চূড়ান্ত আদেশ দিয়ে ফেলেছেন।
আলোচনায় ৯ নভেম্বর এবং যুক্তরাষ্ট্রের সতর্কতা: ফক্স নিউজ এক প্রতিবেদনে বলেছে, পেন্টাগনের পরিকল্পনাকারীরা ৯ নভেম্বর থেকে নতুন করে অপারেশন শুরুর বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে ভাবছেন। এমনকি মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে নতুন চাঁদের কারণে অন্ধকার পরিবেশকে সামরিক সুবিধার জন্য উপযুক্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে বলে এতে উল্লেখ করা হয়। তবে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড এমন কোনো চূড়ান্ত নির্বাহী আদেশ পাওয়ার কথা অস্বীকার করেছে। অর্থাৎ ৯ নভেম্বর বহুল আলোচিত অনুমান মাত্র, নির্ধারিত সামরিক সময়সূচি নয়।
এদিকে, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত সকল মার্কিন নাগরিককে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছে ওয়াশিংটন। ইয়েমেনের হুথি এবং ইরানি সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় আমিরাতে মার্কিন মিশন ফ্লাইট বাতিল ও আকাশসীমা বন্ধ হওয়ার ঝুঁকির কথা তুলে ধরে ট্রাভেল এলার্ট জারি করেছে।
পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে পারমাণবিক হামলার আশঙ্কা: ইরানের নাতাঞ্জ পারমাণবিক কেন্দ্রের কাছেই পাহাড়ের তলদেশে অবস্থিত অত্যন্ত সুরক্ষিত একটি ভূগর্ভস্থ কমপ্লেক্সকে বলা হয় 'পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন'।
এটি কঠিন গ্রানাইট পাথরের ৮০ থেকে ১০০ মিটার (প্রায় ৩০০ ফুট) গভীরে অবস্থিত।
এটি এতই সুরক্ষিত যে সাধারণ 'বাঙ্কার-বাস্টার' বোমা দিয়ে এটি ধ্বংস করা প্রায় অসম্ভব বলে মনে করেন সামরিক বিশেষজ্ঞরা।
নিউজরুমে ও সামরিক বিশ্লেষণে জল্পনা ওঠে, এমন গভীর স্থাপনা ধ্বংস করতে কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র ছাড়া পথ নেই।
তবে ট্রাম্প প্রশাসন বা সামরিক সূত্রে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের কোনো তথ্য বা সিদ্ধান্তের সত্যতা পাওয়া যায়নি। ট্রাম্প নিজেও পূর্বে ইরানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়টি নাকচ করেছিলেন। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, সারফেস বা উপরিভাগে পারমাণবিক হামলা চালানো হলেও তার তেজস্ক্রিয় বর্জ্য বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়বে এবং বিস্তীর্ণ এলাকার বেসামরিক মানুষকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলবে।
আইওডিন ট্যাবলেট বিতরণের গুজব নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে আতঙ্ক ছড়ালেও ইরান স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তেজস্ক্রিয়তা প্রতিরোধী ট্যাবলেট বিতরণের খবরটি অস্বীকার করেছে।
ইরানের পারমাণবিক নীতি বদলের ইঙ্গিত: পরিস্থিতি জটিল করে তুলে ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, শীর্ষ নেতৃত্ব সিদ্ধান্ত নিলে দেশ তার পারমাণবিক নীতি পরিবর্তনের প্রস্তুতি নিতে পারে। তবে নীতি পুনর্বিবেচনার কথা বলার অর্থ এই নয় যে তারা পারমাণবিক বোমা বানিয়ে ফেলেছে। ইরান এখনো বজায় রেখেছে যে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বেসামরিক ও শান্তিপূর্ণ।
পর্দার আড়ালে কূটনীতি ও মধ্যস্থতা: সামরিক আক্রমণ আর পাল্টাপাল্টি হুমকির মধ্যেও কূটনৈতিক আলোচনার পথ কিন্তু পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি। কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আব্দুলরহমান আল থানি নিশ্চিত করেছেন যে, পরিস্থিতি যেন নিয়ন্ত্রণের বাইরে না যায় সেজন্য তারা ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার মধ্যস্থতা সক্রিয় রেখেছেন।
ট্রাম্প নিজেও স্বীকার করেছেন, ইরানের সঙ্গে চুক্তিতে পৌঁছাতে তারা বেশ কিছুটা অগ্রগতি অর্জন করেছেন। বর্তমানে কাতার মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইরানের কাছে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
একদিকে হরমুজ প্রণালীতে ট্যাঙ্কার ও ড্রোন কেন্দ্রিক উত্তেজনা, অন্য দিকে কূটনৈতিক সংলাপ, সব মিলিয়ে ইরান-আমেরিকা সংঘাত এখন এক সংকটজনক মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। আগামী দিনগুলোতে ট্রাম্পের পরবর্তী সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে মধ্যপ্রাচ্য শান্তির পথে হাঁটবে নাকি বড় কোনো সংঘাতের মুখোমুখি হবে।