‘এবার যাওয়ার সময় হলো, ঠিক আছে?’- নিস্তব্ধ ঘরে শায়িত নিথর সন্তানের মাথায় হাত বুলিয়ে এই শেষ কথাগুলো যখন তাঁর মা বলছিলেন, তখন উপস্থিত সবার চোখেই ছিল পানি। উত্তরপ্রদেশের গাজিয়াবাদের এক শান্ত গলিতে এভাবেই শুরু হয় হরিশ রানার শেষ বিদায়যাত্রা।
পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র হরিশ দীর্ঘ ১৩ বছর বিছানায় পড়ে থাকার পর সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে পেয়েছেন ‘সম্মানের সাথে মৃত্যুর অধিকার’। ভারতের বিচারবিভাগীয় ইতিহাসে এটিই প্রথম প্যাসিভ ইউথেনেশিয়া বা পরোক্ষভাবে যন্ত্রণাহীন মৃত্যুর অনুমতি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ২২ সেকেন্ডের একটি ভিডিওতে দেখা গেছে হরিশের শেষ মুহূর্তগুলো। বিছানায় সংজ্ঞাহীন হরিশ, পাশে বিধ্বস্ত মুখে বসে আছেন তাঁর মা। ব্রহ্মকুমারী সংগঠনের এক দিদি হরিশের কপালে তিলক পরিয়ে দিচ্ছেন আর মাথায় হাত বুলিয়ে বলছেন, সবাইকে ক্ষমা করে দাও, সবার কাছে ক্ষমা চেয়ে নাও। এবার যাওয়ার সময় হয়েছে, ঠিক আছে?
ব্রহ্মকুমারী সংগঠনের সহায়তায় এবং পরিবারের দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর হরিশের কৃত্রিম জীবনদায়ক ব্যবস্থা সরিয়ে নেওয়ার অনুমতি দেয় দেশের সর্বোচ্চ আদালত।
হরিশের এই কষ্টের শুরু ২০১৩ সালে। চতুর্থ তলা থেকে পড়ে গিয়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়েছিলেন তিনি। সেই থেকে দীর্ঘ ১৩ বছর তিনি শয্যাশায়ী। শ্বাস নেয়ার জন্য গলায় ‘ট্র্যাকিওস্টোমি টিউব’ এবং খাবার খাওয়ার জন্য ‘গ্যাস্ট্রোজেজুনিস্টোমি টিউব’ ছিল তাঁর শরীরে।
চোখের সামনে ছেলের এমন তিল তিল মৃত্যু দেখতে দেখতে ক্লান্ত বাবা-মা শেষ পর্যন্ত আদালতের কাছে আবেদন জানিয়েছিলেন যেন ছেলেকে মুক্তি দেওয়া হয়।
ভারতের ইতিহাসে এই রায় এক যুগান্তকারী ঘটনা। এর আগে ১৯৭৩ সালে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে কোমায় চলে যাওয়া সেবিকা অরুনা শানবাগের জন্য ইউথেনেশিয়ার আবেদন করা হয়েছিল। ৪২ বছর কোমায় থাকার পর ২০১৫ সালে অরুনা মারা যান, কিন্তু সে সময় আদালত তাঁর জন্য ইউথেনেশিয়ার অনুমতি দেয়নি। হরিশ রানার ক্ষেত্রে সুপ্রিমকোর্ট সেই কঠোর নীতি থেকে সরে এসে মানবিকতাকে প্রাধান্য দিয়েছে।
বিচারপতি জেবি পারদিওয়ালা এবং বিচারপতি কেভি বিশ্বনাথনের বেঞ্চ এই রায় দেয়ার সময় আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। হরিশের বাবা-মায়ের ধৈর্য ও ভালোবাসার প্রশংসা করে আদালত বলে, কাউকে ভালোবাসা মানে শুধু তাঁর সুখের দিনে পাশে থাকা নয়, বরং তাঁর অন্ধকারতম সময়েও তাঁকে আগলে রাখা। গত ১৩ বছর ধরে এই আবেদনকারী কেবল যন্ত্রণা আর কষ্টই ভোগ করেছেন। কষ্টের বিষয় হলো, তিনি তাঁর যন্ত্রণার কথা কাউকে বলার ক্ষমতাটুকুও হারিয়েছিলেন।
বিচারপতিরা আরও বলেন, এই সিদ্ধান্ত শুধু যুক্তি বা বিজ্ঞানের ভিত্তিতে নয়, বরং ভালোবাসা, ক্ষতি, চিকিৎসা এবং করুণার মেলবন্ধনে নেয়া হয়েছে। এটি মৃত্যুকে বেছে নেয়া নয়, বরং কৃত্রিমভাবে জীবনকে টেনে হিঁচড়ে বড় না করার একটি প্রচেষ্টা।
হরিশ রানাকে দিল্লি এইমস হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, যেখানে চিকিৎসকরা ধীরে ধীরে তাঁর লাইফ সাপোর্ট সরিয়ে নেবেন। ১৩ বছরের এক নিঃশব্দ লড়াই শেষে হরিশ হয়তো এবার শান্তির ঘুম দেবেন, আর তাঁর পরিবারের জন্য রয়ে যাবে অপূরণীয় শূন্যতা এবং তাঁর দীর্ঘ কষ্টের অবসান ঘটার এক অদ্ভুত প্রশান্তি।
তথ্যসূত্র: এনডিটিভি