ভারতে ‘ককরোচ’ আন্দোলনের পরবর্তী পদক্ষেপ কী?

ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পর 'ককরোচ জনতা পার্টি' (সিজেপি) তাদের তুমুল আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিলে, মধ্য দিল্লির জন্তর মন্তর এবং সংলগ্ন পার্লামেন্ট স্ট্রিটে শনিবার মধ্যরাতে এক গভীর নীরবতা নেমে আসে। কেননা, হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও তরুণ আন্দোলনকারী ভারতের সংসদ ভবনের কাছে অবস্থান নিয়ে শিক্ষা সংস্কারের দাবি জানাচ্ছিলেন, যা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ডানপন্থী সরকারের জন্য অন্যতম বড় এক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছিল।

আল জাজিরাকে দেওয়া বিশ্লেষকদের সাক্ষাৎকার অনুযায়ী, ধর্মেন্দ্র প্রধানের এই পদত্যাগ ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) চালিত সরকারের জন্য এক বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে এবং এটি মোদীর শক্তিশালী নেতা ভাবমূর্তিকে আরও ক্ষুণ্ণ করেছে। রাস্তা ফাঁকা হয়ে যাওয়ার পরই কর্তৃপক্ষ পেইন্ট রোলার ও বালতি নিয়ে নেমে পড়ে এবং জন্তর মন্তরের চারপাশের দেয়াল থেকে এই 'জেন-জি' বিপ্লবের যাবতীয় চিহ্ন ও আঁকিঝাঁকি মুছে ফেলতে শুরু করে।

শনিবার এই আন্দোলনস্থলে দেওয়া শেষ বক্তব্যে সিজেপি প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে বলেন, এটিই শেষ নয়। শিগগিরই আবার আমাদের দেখা হবে। তাহলে ভারতের এই তরুণ আন্দোলনকারীদের জন্য সামনে কী অপেক্ষা করছে? দেশটির তরুণ প্রজন্ম কি নতুন কোন ইস্যুতে আবারও রাজপথে নামতে পারে?

Cockroach Movement 03
আন্দোলনকারীদের দাবির বর্তমান অবস্থা কী?

গত কয়েক সপ্তাহে আন্দোলনের মূল গতিধারায় কিছু দাবি যুক্ত ও বাদ হলেও, প্রধান দুটি দাবি অপরিবর্তিত ছিলো; প্রথমটি শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ এবং দ্বিতীয়টি ভারতের লাখ লাখ শিক্ষার্থীকে প্রভাবিত করা প্রশ্নপত্র ফাঁস ও পরীক্ষা বাতিলের জেরে যেসব শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন, তাঁদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেয়া।

ক্ষতিপূরণ: শনিবারের এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে, যেখানে জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীদের পাশে সিজেপি মুখপাত্রদের বসে থাকতে দেখা যায়, সরকার বিধি অনুযায়ী যতটা সম্ভব সর্বোচ্চ ক্ষতিপূরণ দিতে রাজি হয়। আন্দোলনকারীরা এমন প্রায় ২০টি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের প্রত্যেককে এক কোটি টাকা করে দেয়ার দাবি তুলেছিলেন।

ফৌজদারি মামলা প্রত্যাহার: গত ২০ জুলাই সংসদে অভিমুখে পদযাত্রার সময় পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ওপর চড়াও হলে ১০০ জনেরও বেশি আন্দোলনকারী আহত হন। এই ঘটনার পর সিজেপি’র আন্দোলনটি দেশজুড়ে সর্বাত্মক সমর্থন লাভ করে।

এরপর সিজেপি আরও দুটি নতুন দাবি যুক্ত করে: কোনো আন্দোলনকারী বা সংগঠকের বিরুদ্ধে যেন কোনো ফৌজদারি মামলা না চালানো হয় এবং এই দমন-পীড়নের জন্য দিল্লি পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী 'র‌্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স'-কে ক্ষমা চাইতে হবে।

সরকার সিজেপিকে আশ্বাস দিয়েছে, বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা চালানো হবে না এবং বিদ্যমান সব মামলা প্রত্যাহার করে নেয়া হবে।

Cockroach Movement 02
'ককরোচ আন্দোলন' এবার কোন পথে এগোবে?

ভবিষ্যতে এই আন্দোলন কোন পথে এগোবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো উত্তর দেয়া এড়িয়ে চলেছে সিজেপি। চলতি বছরের মে মাসে এক্সে প্ল্যাটফর্মে অভিজিৎ দীপকের একটি নৈমিত্তিক পোস্ট থেকে দলটির উত্থান ঘটেছিল। তিনি লিখেছিলেন, যদি সব আরশোলা এক হয়ে যায় তবে কী হবে? এটি ছিল ভারতের প্রধান বিচারপতির একটি মন্তব্যের ব্যঙ্গাত্মক জবাব, যেখানে তিনি বেকার যুবকদের ‘আরশোলা’ এবং ‘পরজীবী’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন।

বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত দিয়েছেন, অভিজিৎ দীপকে একজন দলিত সম্প্রদায়ের মানুষ, ভারতে বর্ণপ্রথার জটিল বিন্যাসে যারা ঐতিহাসিকভাবে নিপীড়িত হয়ে আসছে, যা সামনের দিনগুলোতে বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক হতে যাচ্ছে। শিক্ষামন্ত্রীকে পদচ্যুত করার আন্দোলন সফল করার পর সিজেপি নেতারা নয়াদিল্লির বিক্ষোভকারীদের বলেন, শিগগিরই তাদের আবারও দেখা হবে।

দলটির মুখপাত্ররা জানান, এই আন্দোলন নির্বাচনি রাজনীতিতে প্রবেশ করবে কি না, সে বিষয়ে এখনও স্পষ্ট কিছু সিদ্ধান্ত হয়নি। সিজেপি সদস্য সুধীর সাঙ্গওয়ান রোববার আল জাজিরাকে বলেন, আমরা বিশ্রাম নিচ্ছি এবং পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য নিজেদের গুছিয়ে নিচ্ছি। মূল ভাবনা হলো, একবারে একটি নির্দিষ্ট ইস্যুতে জোর দেয়া। আমরা এই আন্দোলনকে একদম তৃণমূল পর্যায়ে নিয়ে যেতে চাই।

Cockroach Movement 01
সিজেপি মুখপাত্র বৈষ্ণবী গৌর বলেন, তাদের মূল মনোযোগ এখন শুধু শিক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। আমাদের এজেন্ডা আরও বিস্তৃত হতে যাচ্ছে। তিনি জানান, দলটি সাধারণ মানুষ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সাথে সাক্ষাৎ করে মূল সমস্যাগুলো বোঝার এবং তার সমাধানের পথ খোঁজার চেষ্টা করবে। আল জাজিরাকে তিনি বলেন, আমরা টাউনহল-ভিত্তিক আলোচনা সভা আয়োজন করতে চাই। নিজেদের জন্য এটিই আপাতত প্রাথমিক একটি রূপরেখা।

২৯ বছর বয়সী এই মুখপাত্র আরও জানান, ককরোচ আন্দোলনের বয়স মাত্র দুই মাস, এবং আমাদের কারো কাছেই সময়সীমা নির্ধারণ করে এজেন্ডা তৈরি করার মতো পর্যাপ্ত সময় ছিল না। তবে, আমরা জানি এটি এখানেই শেষ নয়। সিজেপিকে একটি রাজনৈতিক দলে রূপান্তর করা একটি বড় সিদ্ধান্ত। আমরা নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে চাই এবং ধীরে ধীরে এগোতে চাই।

নয়াদিল্লি ভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক অসীম আলী বলেন, সিজেপি তাদের ভবিষ্যত পরিকল্পনা নিয়ে খুব একটা স্বচ্ছ নয়, যার কারণ হতে পারে-হয়তো তাদের কাছে কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা আপাতত নেই। তিনি বলেন, এই নেতাদের রাজনৈতিক পটভূমি নেই, তারা বরং যোগাযোগ মাধ্যমের লোক। তাৎক্ষণিকভাবে সরকারের সাথে তাদের নতুন কোনো সংঘাত বা মুখোমুখি অবস্থান তৈরির সম্ভাবনা আমি দেখছি না।

Rahul
ভারতের বিরোধী দলগুলো কী বলছে?

ভারতের প্রধান বিরোধী দল 'ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস'-এর নেতা রাহুল গান্ধী বলেছেন, গত ২০ জুলাই নয়াদিল্লিতে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর বলপ্রয়োগের ঘটনার জন্য তাঁর দল সংসদে মোদীর কাছ থেকে ক্ষমা চাওয়ার দাবি তুলবে। এক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে তিনি শিক্ষার্থীদের ওপর সহিংসতায় জড়িত দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।

বিরোধী দলগুলো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে ঘিরেও সোচ্চার হয়েছেন, যিনি দিল্লির পুলিশ প্রধান এবং মোদীর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত। এমনকি তারা মোদী ও শাহ- উভয় নেতারই পদত্যাগ দাবি করেছেন। রোববার অমিত শাহকে লেখা এক চিঠিতে রাহুল গান্ধী লেখেন, আমাদের শিক্ষার্থীরা একটি সুষ্ঠু ও জবাবদিহিমূলক শিক্ষা ব্যবস্থার দাবি জানাচ্ছিল। তাদের কথা শোনার বদলে, নিরাপত্তাবাহিনী তাদের ওপর প্রাণঘাতী অস্ত্র ও টিয়ার গ্যাসসহ নির্বিচারে বলপ্রয়োগ করে নির্যাতন চালিয়েছে।

শনিবার রাহুল গান্ধী অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও গবেষক নেহা বরার সাথে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলন করেন। নেহা বোরা জন্তর মন্তরে সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুকের সাথে অনশন কর্মসূচিতে বসেছিলেন এবং তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্যের জন্য ব্যাপক পরিচিত লাভ করেন।

cjp
সংবাদ সম্মেলনে নেহা বোরা বলেন, ধর্মেন্দ্র প্রধানকে অন্য কোনো মন্ত্রণালয়ে সরিয়ে নেয়া গ্রহণযোগ্য হবে। তবে ২০ জুলাইয়ের সহিংসতার জন্য জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। দিল্লির পুলিশ কমিশনার এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকেও এর জন্য জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

অন্যদিকে, বিরোধী সমাজবাদী পার্টির সংসদ সদস্য অখিলেশ যাদব ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগকে নতুন প্রজন্মের এক ঐতিহাসিক জয় বলে অভিহিত করেছেন এবং মোদী সরকারের মুখোমুখি দাঁড়ানোর জন্য তরুণ আন্দোলনকারীদের প্রশংসা করেছেন।

তিনি বলেন, সব রাজনৈতিক দলেরই এর থেকে শিক্ষা নেয়া উচিত, ভবিষ্যতে পরীক্ষা ব্যবস্থা এমনভাবে জোরদার করতে হবে যাতে আর প্রশ্নফাঁস না হয় এবং যুবসমাজের জন্য কর্মসংস্থানের পথ উন্মুক্ত থাকে।