কলকাতার নিউ মার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিটের হোটেলে গভীর রাতের সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ড আবারও উস্কে দিয়েছে গত দুই দশকে কলকাতা শহরের একাধিক আগুনের বিভীষিকাময় স্মৃতি। দীর্ঘ বিশ বছরে শুধু কলকাতা শহরই প্রত্যক্ষ করেছে অন্তত ৮টি বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড, যাতে প্রাণ হারিয়েছে দুই শতাধিক মানুষ।
প্রতিটি ঘটনার পর দেখা গেছে একই চেনা চিত্রনাট্য- তদন্ত কমিটি গঠন, উদ্ধার অভিযান, প্রশাসনিক তৎপরতা, রাজনৈতিক দোষারোপ এবং গ্রেপ্তারি। তবে, বছর ঘুরতে না ঘুরতেই নতুন কোনো অগ্নিকাণ্ড প্রমান করে দেয়, শহরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার মূল গলদ রয়ে গেছে আগের মতোই।
রাজনীতিতে ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটেছে বার বার- বাম আমল পেরিয়ে তৃণমূল জমানা, আর বর্তমানে রাজ্যে বিজেপির শাসন। তবে কলকাতার বহুতল, হোটেল কিংবা হাসপাতালের ফায়ার এস্কেপে তালা ঝুলতে থাকা এবং আগুনের ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে মৃত্যুর বিভীষিকা বদলায়নি।
আনন্দবাজার ডট কমের তথ্যানুযায়ী দু’দশকের প্রধান অগ্নিকাণ্ডগুলো হলো:
তপসিয়ার চামড়া কারখানা (২০০৬): ২২ নভেম্বর তপসিয়ার একটি চামড়া কারখানায় আগুন লাগলে একমাত্র দরজার চাবি না পাওয়ায় তালা ভেঙে বের হতে গিয়ে ৯ জন শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়।
স্টিফেন কোর্ট অগ্নিকাণ্ড (২০১০): ২৩ মার্চ পার্ক স্ট্রিটের ঐতিহ্যবাহী স্টিফেন কোর্ট ভবনে আগুন লাগলে বদ্ধ সিঁড়িতে আটকে পড়ে এবং ছাদ থেকে লাফ দিয়ে প্রাণ হারান ৪৩ জন মানুষ।
আমরি হাসপাতাল বিপর্যয় (২০১১): ৯ ডিসেম্বর ঢাকুরিয়ার আমরি হাসপাতালের বেসমেন্ট থেকে ছড়িয়ে পড়া বিষাক্ত ধোঁয়ায় আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ঘুমন্ত রোগীসহ ৯৩ জনের করুণ মৃত্যু হয়।
সূর্য সেন স্ট্রিট বাজার (২০১৩): ২৭ ফেব্রুয়ারি ভোরের দিকে শিয়ালদহের এই বাজারে আগুন লাগলে ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা ২০ জন শ্রমিকের মৃত্যু ঘটে।
নিউ কয়লাঘাট বিল্ডিং (২০২১): ৯ মার্চ স্ট্র্যান্ড রোডে পূর্ব রেলের এই ভবনে আগুন লাগলে ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে ফায়ার সার্ভিস কর্মী ও পুলিশ অফিসারসহ ৯ জন মারা যান।
মেছুয়াবাজার হোটেল (২০২৫): ২৫ এপ্রিল মেছুয়াবাজারের এক হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে দুই শিশুসহ ১৪ জনের প্রাণহানি ঘটে।
আনন্দপুর মোমো কারখানা (২০২৬): ২৬ জানুয়ারি সাধারণতন্ত্র দিবসের ভোরে নাজিরাবাদের একটি মোমো কারখানার গুদামে ভয়াবহ আগুনে ২৭ জন নিখোঁজ হয় এবং ১৮টি ছাই হয়ে যাওয়া দেহাংশ উদ্ধার করা হয়।
নিউ মার্কেটের ঘটনা ও রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ি: সবশেষ ১৯ আগস্টে নিউ মার্কেট এলাকার হোটেলে গভীর রাতে লাগা আগুন আবারও কাঠগড়ায় তুলেছে শহরের হোটেলগুলোর অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাকে। ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে বর্তমান দমকলমন্ত্রী কৌশিক চৌধুরী পূর্বতন তৃণমূল সরকারের অবহেলা ও গাফিলতিকে দায়ী করে বলেন, পূর্বতন সরকারের অভিশাপ আমাদের বহন করতে হচ্ছে। একই সুর মিলিয়ে পূর্তমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল জানান, অপরাধী বা গাফিলতি করা কেউ ছাড় পাবে না।
প্রশাসনের একের পর এক নির্দেশিকা ও কড়া বার্তার পরও মানুষের মনে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ির বাইরে বেরিয়ে কলকাতা কি আদৌ কোনোদিন নিরাপদ শহর হতে পারবে?
তথ্যসূত্র: আনন্দবাজার ডটকম