কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার হোটেলগুলো কতটা নিরাপদ?

যেনতেন প্রকারে গ্রাহক টানাই লক্ষ্য। নিরাপত্তা ও সুরক্ষার দিকে বিন্দুমাত্র নজর নেই নিউমার্কেটের হোটেল গুলির। কলকাতায় কতটা নিরাপত্তা পান বাংলাদেশিরা, ভয়াবহ আগুনের ৯ জনের মৃত্যুর পর সেই প্রশ্ন আবারও জোরেশোরে উঠেছে। আনন্দের নগরীর আগুন নিরাপত্তা নিয়ে এখন হাজারও প্রশ্ন।

কলকাতার প্রাণ কেন্দ্র নিউমার্কেট এলাকায় ৫০০ টাকায় নন এসি আর ১০০০ টাকায় এসি ঘর পাওয়া যায়। পর্যটক ব্যবসা করতে এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ীরা কলকাতার পার্ক স্ট্রিট সংলগ্ন এলাকার ব্রিটিশ আমলের তৈরি বাড়ি ভাড়া নিয়ে আবাসিক হোটেল ও গেস্ট হাউসের ব্যবসা করছিল দুই দশক ধরে।

Screenshot 2026-08-20 150847
চিকিৎসা ও ঘুরতে কলকাতায় গিয়ে কম ভাড়ার হোটেলে ওঠেন বহু বাংলাদেশি পর্যটকরা। মঙ্গলবার গভীর রাতে কলকাতার নিউ মার্কেটের মির্জা গালিব স্ট্রীটে একটি আবাসিক হোটেলের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা আবারও একবার হোটেলের নিরাপত্তা ব্যবস্থার নাজুক অবস্থা চোখে আঙুল দেখিয়ে দিল।

কলকাতার ১৫জি, মির্জা গালিব স্ট্রীটের 'শিখা ইন' হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে এখনো ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ৭ জনই বাংলাদেশী নাগরিক। বাকি দুজন ভারতীয়।

কলকাতার মিনি বাংলাদেশে পরিচিত এই নিউ মার্কেটের কলিন স্ট্রিট, মির্জা গালিব স্ট্রীট, ফ্রী স্কুল স্ট্রিট, সদর স্ট্রিট, মার্কুইস স্ট্রিটসহ একাধিক জায়গায় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় এক হাজার থেকে ১,২০০হোটেল রয়েছে। নিউমার্কেটের মতো ঘিঞ্জি এলাকায় বেশিরভাগ ভবনই অনেক বছরের পুরনো। সেখানেই গজিয়ে উঠেছে একের পর এক হোটেল। ভিতর একেবারে ঘুণে খাওয়া। উপরটা সানমাইকা, প্লাইউড দিয়ে ডেকরেশন করা। আসলে সৌন্দর্যায়নের মাধ্যমে গ্রাহক টানাই মূল লক্ষ্য। নিরাপত্তা-সুরক্ষায় কোনও নজরদারি নেই।

Screenshot 2026-08-20 150823
স্থানীয় ব্যবসায়ী বিদেশি পর্যটকরা বলছেন, বেশিরভাগ গেস্ট হাউজেরই অবস্থা গোলক ধাঁধার মতো। কোনটা প্রবেশ পথ, কোনটা বের হওয়ার পথ বোঝা মুশকিল। ফলে একবার ঢুকলে হারিয়ে যাওয়ার সামিল! বেশিরভাগ হোটেলের ইলেকট্রিক ওয়ারিং অবস্থা করুন, যত্রতত্র ঝুলছে ইলেকট্রিকের তার। লিফট কয়েক দশক পুরনো, একটি ঘর থেকে আরেকটি ঘরে যাওয়ার জন্য রয়েছে সরু গলি, তা দিয়ে পাশাপাশি দুটো লোকও যাতায়াত করা কঠিন। অনেক জায়গায় আবার ব্যালকনি বলেও কিছু নেই।

নেই কোন অতিরিক্ত সিঁড়ি- যেখানে বিপদের সময় দুর্গত মানুষদের উদ্ধার করা যায়। এমন অবস্থায় দশকের পর দশক ধরে চলছে গেস্ট হাউজ, আবাসিক হোটেলগুলি। কেউ কেউ বলছেন কোন একটা দুর্ঘটনার পর কেবলমাত্র অর্থের বিনিময়ে স্থানীয় পৌরসভা, পুলিশ প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিসের একাংশ কর্মকর্তা অনুমতি দিয়ে দিচ্ছেন আর সেই অনুমতিতেই ফিরে অনৈতিকভাবে শুরু হচ্ছে ব্যবসা।

Screenshot 2026-08-20 150800
এমনকি এদিন যে হোটেলে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে, সেই 'শিখা ইন' নামক হোটেলেও ছিল না ফায়ার লাইসেন্স, অগ্নি নির্বাপন ব্যবস্থা, দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে অডিটও করা হয় নি। প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে এসির শর্ট সার্কিট থেকে এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। রাতে যখন আগুন লাগে তখন সবাই ছিলেন ঘুমন্ত। ফলে নিহতদের কেউই বেরিয়ে আসতে পারেননি। বিষাক্ত গ্যাসে দম বন্ধ হয়ে হোটেলেই মৃত্যু হয় তাদের। এমনকি ওই হোটেলে ফায়ার এক্সিটও ছিল না। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন ওঠে এত অপর্যাপ্ত থাকা সত্ত্বেও কিভাবে ট্রেড লাইসেন্স পেল ওই হোটেল কর্তৃপক্ষ।

প্রাথমিকভাবে কলকাতা পুলিশ ও দমকল বিভাগের তরফ থেকে যে তদন্ত করা হয়েছে তাতে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়েছে, দুর্ঘটনাগ্রস্থ ওই হোটেলটিতে কোন ফায়ার লাইসেন্স ছিল না, এমনকি দীর্ঘদিন ধরে কোনো অডিটও করা হয়নি। দেওয়াল তুলে এমার্জেন্সি গেট দিয়ে বের হওয়ার পথও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।

Screenshot 2026-08-20 150539
কলকাতায় চিকিৎসা করতে এসে দুর্ঘটনাগ্রস্ত ওই হোটেলেই উঠেছিলেন গাজীপুরের বাসিন্দা মোঃ আসাদুজ্জামান। কিন্তু আল্লাহর রহমতে কোনরকমে বেঁচে ফেরেন তিনি। কিন্তু ওই হোটেলে নিরাপত্তা সুরক্ষা ব্যবস্থা যে মোটেই ঠিকঠাক ছিল না তা নিজেই জানিয়েছেন আসাদুজ্জামান।

তিনি বলেন, পাঁচ তলায় ছিলাম। অগ্নিকাণ্ডের পরই কোনক্রমে নিজের পরনের গেঞ্জি নাক চাপা দিয়ে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছি। আর এক মিনিট হলেই আমিও হয়তো মারা যেতে পারতাম।

বিজেপির কনভেনার নবীন মিশ্রও হোটেলগুলো নিরাপত্তা সুরক্ষা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, আগের বামফ্রন্ট ও তৃণমূল কংগ্রেসের সরকারের আমলের অবৈধভাবে একের পর এক হোটেলকে লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। রেসিডেন্সিয়াল ভবনগুলিকে বাণিজ্যিক ভবন করে দেওয়া হয়েছে।

Screenshot 2026-08-20 150637
তার দাবি মুখ্যমন্ত্রীর কাছে তিনি অনুরোধ করবেন, যে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে একটা কমিটি গঠন করে যতগুলো অবৈধ হোটেল এবং গেস্ট হাউজ আছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার। সেক্ষেত্রে কাগজে-কলমে নয়, প্রকৃত অর্থেই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আর্জিও জানান তিনি।

যারা অবৈধভাবে অর্থের বিনিময় নথি তৈরি করে হোটেল চালাচ্ছেন তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হবে হোটেলগুলোকে সিলগালা করে দেওয়া হবে। শুধু তাই নয়, যদি কোন অবৈধ নির্মাণ বা স্থাপনা থাকে সে ক্ষেত্রে বুলডোজার দিয়ে ভেঙে দেওয়া হবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন নবীন মিশ্র।

সিপিআইএমের রাজ্য সম্পাদক মোহাম্মদ সেলিম বলেন, এই অঞ্চলের আবাসিক হোটেল, গেস্ট হাউজগুলির নিরাপত্তা ও সুরক্ষা ব্যবস্থা যে মোটেই যে ঠিক নেই তা স্বীকার করেছেন তিনিও। সেলিম বলেছেন, 'বাংলাদেশ থেকে প্রচুর মানুষ এই কলকাতায় আসে। অতিথি দেবতার সমান। কিন্তু তাদের জন্য কলকাতা পুলিশ রাজ্য সরকার কি ব্যবস্থা নিয়েছে? তার অভিমান এটা মানবতার লজ্জা।

Screenshot 2026-08-20 150514
তিনি যোগ করেন, বাংলাদেশেও যে আগুন লাগে না তা নয়! কিন্তু একটা আগুন লাগার পর দোষারোপ না করে কারণ খুঁজতে হয় এবং ভবিষ্যতে যাতে এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয় তার ব্যবস্থা নিতে হয়। কিন্তু যদি দুর্নীতি হয়, তবে পুরসভা, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ কিছু অর্থের বিনিময়ে বেআইনি কাজ করার অনুমতি দেবে।

যদিও স্থানীয় পাইওনিয়ার হোটেলের ম্যানেজার জানিয়েছেন নিরাপত্তা ও সুরক্ষার বিষয়টি তারা গুরুত্ব দিয়ে দেখে থাকেন এবং আগামী দিনও দেখবেন।