নেপাল ও তিব্বতের বিশাল সীমান্তজুড়ে শুধুই ধ্বংসলীলা

নেপাল ও চীনের তিব্বত সীমান্তে হিমালয়ের পর্বতমালায় মাটি ও পাথরের এক বিশাল দেয়াল ধসে নদীতে পতিত হওয়ায় এক ভয়াবহ প্রলয়ংকরী বন্যার সৃষ্টি হয়েছে। বুধবার ঘটে যাওয়া এই ভয়াবহ দুর্যোগে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং নিখোঁজ হয়েছেন শত শত দেশি-বিদেশি পর্যটক। পরিস্থিতি এখনো আশঙ্কাজনক এবং উভয় দেশের সীমান্ত এলাকাতেই ক্ষয়ক্ষতির ব্যাপ্তি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

Nepal Flood 03
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ও যাচাইকৃত ভিডিওগুলোতে দেখা গেছে, পাহাড়ি ঢলের তোড়ে বহু মানুষ মুহূর্তের মধ্যে ভেসে যাচ্ছেন। দুর্যোগের কারণে নেপালের বসতবাড়ি, মহাসড়ক এবং জলবিদ্যুৎ প্রকল্প কাদা ও পানির নিচে তলিয়ে গেছে। অন্যদিকে চীনের তিব্বতের জিরোং কাউন্টিতেও সীমান্ত ক্রসিংয়ে কাদা ধসের ফলে ব্যাপক প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।

Nepal Flood 15
ভূমিকম্পের ফলে হিমবাহ ধসের আশঙ্কা:
প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ থেকে নেপালি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ওই এলাকায় ৪.৪ মাত্রার একটি ভূকম্পনের কারণে হিমবাহের নিচের অংশ ধসে পড়ে এই কাদা ও পানির তোড় তৈরি হয়ে থাকতে পারে। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, রসুয়াগাধি সীমান্ত থেকে ২০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে লেন্দে নদীতে বরফ ও পাথরের বিরাট ধস নেমে এই বিপর্যয় ডেকে আনে।

Nepal Flood 14
ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও মানবিক বিপর্যয়:
নেপালের পুলিশ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত অন্তত ১৫৭টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, যাদের পরিচয় এখনো শনাক্ত করা যায়নি। নেপাল পর্যটন মন্ত্রণালয় ও পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ৫৭৯ জন পর্যটক নিখোঁজ রয়েছেন, যার মধ্যে ৩৯১ জন বিদেশি এবং ৯৩ জন নেপালি নাগরিক। নিখোঁজ বিদেশি পর্যটকদের তালিকায় ১০০ জনেরও বেশি ভারতীয়, ৩ জন মার্কিন এবং ১২ জন ব্রিটিশ নাগরিক অন্তর্ভুক্ত। এই অঞ্চলটি তিব্বতের কৈলাশ মানসরোবর যাত্রার অত্যন্ত পরিচিত পথ হওয়ায় প্রতি বছরের এই সময়ে ভারতীয় পুণ্যার্থীদের ভিড় বেশি থাকে।

চীনা গণমাধ্যমের প্রাথমিক তথ্যমতে, তিব্বতের জিরোং সীমান্তে অন্তত তিন জন নিহত এবং ২৬৫ জন নিখোঁজ রয়েছেন। এছাড়া একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত দক্ষিণ কোরিয়ার ৮ জন নাগরিক নিখোঁজ থাকার কথা নিশ্চিত করেছে দেশটি।

Nepal Flood 13
উদ্ধার অভিযান ও সীমান্ত পরিস্থিতি:
চীনের সীমান্ত এলাকার সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, প্রচণ্ড গতিতে নেমে আসা কাদা, পাথর ও পানির বিশাল প্রবাহ দেখে মানুষ দিগ্বিদিক ছুটছেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই তা যানবাহন ও ঘরবাড়ি ধ্বংস করে ফেলে।

নেপালের রসুয়া জেলার স্যাপরু বেসি ও তিমুরে এলাকায় নদীর পানি স্বাভাবিক সীমার অনেক ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় উদ্ধারকারী হেলিকপ্টারগুলো অবতরণ করতে বেগ পাচ্ছে। বিদ্যুৎ সংযোগ ও টেলিযোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। নুয়াকোট ও ধাদিং এলাকার স্বজনেরা তাদের নিখোঁজ পরিবারের তথ্যের জন্য সেনা ট্রেনিং সেন্টারের সামনে ভিড় করছেন, যেখানে মোবাইল ফোনের আলো জ্বালিয়ে নিখোঁজদের তালিকা তৈরি করছেন পুলিশ সদস্যরা।

চীন জানিয়েছে, কাদা ধসের কারণে জিরোং পোর্টের সড়ক, যোগাযোগ ও বিদ্যুৎ সংযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ধ্বংসের সঠিক চিত্র ও উদ্ধারকাজ ত্বরান্বিত করতে চীনা সামরিক বাহিনী ড্রোন এবং উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার মোতায়েন করেছে।

Nepal Flood 11
ভারতে নদী অববাহিকায় সতর্কতা:
হিমালয়ের দুই হাজার মিটার উচ্চতা থেকে বিশাল পরিমাণ কাদাপানি দ্রুতগতিতে নিচের দিকে নেমে আসায় নেপাল সীমান্তবর্তী ভারতের উত্তর প্রদেশ এবং বিহার রাজ্যে বন্যা সতর্কতা জারি করা হয়েছে। বিহার কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে ছয়টি জেলা থেকে প্রায় ৫,০০০ মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছে এবং আরও ১০ থেকে ১২ হাজার মানুষকে সরিয়ে নেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।