মৃত্যুর উপত্যকাতেও অলৌকিক ঘটনা ঘটে! প্রলয়ঙ্করী বন্যায় ভেসে যাওয়া নেপালের ধ্বংসস্তূপ থেকে ঠিক যেন এক টুকরো অলৌকিক ছিনিয়ে আনলেন উদ্ধারকারীরা। বন্যায় লন্ডভন্ড রসুয়া জেলায় কাদা আর পাথরের থকথকে ধ্বংসাবশেষের নিচে দীর্ঘ তিন দিন বা প্রায় ৭২ ঘণ্টা আটকে থাকার পর ৬ বছরের এক শিশুকন্যাকে অলৌকিকভাবে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।
পুরো দেশজুড়ে যখন স্বজনহারানোদের কান্না আর হাজার হাজার লাশের গন্ধ, তখন এই নিষ্পাপ শিশুটির বেঁচে ফেরা যেন নরকের মাঝে এক চিলতে স্বস্তির আলো জ্বালিয়ে দিল।
রসুয়া জেলার টিমুড়ে গ্রামে ঘটে এই লোমহর্ষক ও রোমাঞ্চকর ঘটনাটি। ঘটে যাওয়া ভোটেকোশী নদীর ভয়াবহ প্লাবনে গ্রামটি তাসের ঘরের মতো গুঁড়িয়ে গিয়েছিল। শুক্রবার সন্ধ্যায় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর একটি উদ্ধারকারী দল কাদা-মাটির নিচ থেকে হঠাৎই খুব ক্ষীণ এবং অস্পষ্ট কান্নার শব্দ শুনতে পায়।
এক মুহূর্তও দেরি না করে জোয়ানরা খালি হাতে ও পাওয়া সরঞ্জাম দিয়ে মাটি খুঁড়তে শুরু করেন। শত চেষ্টার পর কাদার স্তূপ সরাতেই বেরিয়ে আসে ছোট্ট মানিষা মাগারের নিথরপ্রায় শরীর!
উদ্ধারের পরপরই তাকে টিমুড়ে সীমান্তে পুলিশ বাহিনীর ফার্স্ট এইড পোস্টের অস্থায়ী চিকিৎসা কেন্দ্রে নেওয়া হয়। কিন্তু সেখানে তার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটলে চিকিৎসকরা জরুরি ভিত্তিতে কাঠমান্ডুর বিশেষায়িত হাসপাতালে এয়ারলিফট করার পরামর্শ দেন।
আবহাওয়া ও প্রকৃতির সাথে লড়াই: শুক্রবার রাতে খারাপ আবহাওয়া ও ঘন কুয়াশার কারণে হেলিকপ্টার উড্ডয়ন করা সম্ভব হয়নি। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা শিশুটিকে পুরো রাত ধরে স্থিতিশীল রাখতে অমানুষিক লড়াই চালান উদ্ধারকারী দলের চিকিৎসকরা।
অবশেষে শনিবার বিকেলে আবহাওয়া কিছুটা স্বাভাবিক হলে চপার উড়িয়ে শিশুটিকে কাঠমান্ডুর একটি উন্নত হাসপাতালে নেয়া হয়। বর্তমানে সে নিবিড় চিকিৎসকদের নজরদারিতে জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তোলপাড়: শিশুটিকে কাদার ভেতর থেকে জীবিত বের করে আনার সেই রোমহর্ষক ও আবেগঘন ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই নেটিজেনরা এপিএফ জোয়ানদের সাহসিকতায় ভেসে যাচ্ছেন প্রশংসার বন্যায়। এক্সে এক ব্যবহারকারী লিখেছেন, অদম্য এপিএফ দলকে শ্রদ্ধা, যারা আশা হারিয়ে ফেলেনি। আরেকজন লিখেছেন, সব আশা যখন শেষ হয়ে গিয়েছিল, ঠিক তখনই অলৌকিক ঘটনাটি ঘটল।
এদিকে শিশুটির নাম মানিষা মাগার জানা গেলেও তার বাবা-মা বা কোনো স্বজনের এখনো পাত্তা মেলেনি। স্বজনদের কাছে খবর পৌঁছাতে সবাই তার ছবি ও গল্প সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করার আকুল আবেদন জানাচ্ছেন, যাতে দ্রুত তাকে পরিবারের কোলে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়।
বিলিয়ন ডলারের ধ্বংসযজ্ঞ: এই রোমাঞ্চকর উদ্ধারের আড়ালে নেপালের বন্যার প্রকৃত দৃশ্যটি কিন্তু অত্যন্ত ভয়াবহ। নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল শনিবার কাঠমান্ডুতে সাংবাদিকদের জানান, এই প্রলয়ঙ্করী বন্যার ক্ষত কাটিয়ে উঠতে এবং পুনর্নির্মাণে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ইতোমধ্যে হাত বাড়িয়েছে নেপাল সরকার। সরকারি হিসেব অনুযায়ী, বন্যায় মৃতের সংখ্যা দাড়িয়েছে ৭৫০ জনে এবং এখনো তিন হাজারেরও বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন!
তথ্যসূত্র: এনডিটিভি