নেপাল ও চীনের তিব্বত সীমান্তে বয়ে যাওয়া আকস্মিক প্রলয়ংকরী বন্যার পেছনে পানির অভূতপূর্ব গতিবেগ এবং সম্ভাব্য নতুন দুর্যোগ নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞেরা। তাদের মতে, পাহাড়ি ঢলের সাথে ধেয়ে আসা পানি ও কাদাস্রোতের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় প্রায় ৩০০ কিলোমিটার, যা পূর্বের সব ধারণাকে ছাড়িয়ে গেছে। একই সাথে সেখানে নতুন করে গঠিত তিনটি কৃত্রিম হ্রদের কারণে দ্বিতীয় দফায় আরও একটি বিধ্বংসী বন্যার চরম ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
পাহাড় ও হিমবাহ গবেষক ধনঞ্জয় রেগমি এনডিটিভি’কে জানান, উজান থেকে নেমে আসা এই ঢলের ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা ও গতি ছিল অত্যন্ত বেশি। পর্বতারোহী সঞ্জীত সিং বালের ব্যাখ্যা দিয়ে জানান, প্রায় পাঁচ হাজার মিটার উঁচুতে থাকা ল্যাংটাং লিরুং নামক সাত হাজার মিটার উঁচু পর্বতের উত্তর হিমবাহ থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এক প্রকাণ্ড অংশ ধসে পড়ে।
স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, প্রায় দুই বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত বরফ ও পাথরের বিরাট অংশ ভেঙে প্রায় তিন হাজার মিটার গভীরে নেমে আসে। খাড়া পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসার সময় তা প্রচুর কাদা, পাথর ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ সংগ্রহ করে এবং অত্যন্ত সংকীর্ণ গিরিখাতের মধ্য দিয়ে সেই বিপুল শক্তি ও পানি নিচে ধেয়ে এসে এই বিপর্যয় ঘটায়।
'স্নোস্কেপস'-এর ব্যবস্থাপনা অংশীদার আশুতোষ মিশ্র জানান, প্রথমে হ্রদ উপচে পড়ার কথা ভাবা হলেও পরে ডেটা থেকে স্পষ্ট হয় যে, মূল বিপর্যয়টি ঘটেছিল হিমবাহ ধসের কারণেই।
গবেষকেরা সতর্ক করেছেন, দুর্যোগের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ইতোমধ্যে তিনটি কৃত্রিম হ্রদের সৃষ্টি হয়েছে। যদি নতুন করে সামান্যতম পাথর বা পাহাড়ের অংশ ধসে পড়ে, তবে শৃঙ্খলিত প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে তিনটি হ্রদই একযোগে ভেঙে পড়তে পারে। এই ঝুঁকি এড়ানোর একমাত্র উপায় হলো নিয়ন্ত্রিত উপায়ে হ্রদগুলোর পানি নিষ্কাশন করা, তবে এখনো তেমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপের তথ্য মেলেনি। ফলে নদী অববাহিকার মানুষকে কেবল উঁচুতে আশ্রয় নেওয়া ছাড়া আপাতত অন্য কোনো উপায় নেই।
স্বজনদের সন্ধানে হাহাকার: ত্রিশূলি নদী উপত্যকা ও বাট্টার অঞ্চলে পানির তোড়ে ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া গ্রামগুলোর শত শত মানুষ নিজেদের নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন। বহু মানুষ এখনো নিখোঁজ থাকায় সেখানে তথ্যের জন্য এক হাহাকার অবস্থা তৈরি হয়েছে।
তবে এই ভয়াবহ দুর্যোগের মাঝেও এক অসাধারণ মানবিকতার ছবি ফুটে উঠেছে। নিজের নিখোঁজ ভাইয়ের ছবি হাতে নিয়ে ঘুরতে থাকা এক নেপালি নাগরিক জানান, আমাদের লোক ওখানে থাকুক বা না থাকুক, যিনিই আটকে আছেন তাকেই বাঁচানো দরকার। আমার নিজের ভাই না পেলেও, তার অন্য বন্ধুদের তো বাঁচানো যাবে। এই দেশের বাকি সবাই তো আমারই ভাই। এই কঠিন মুহূর্তে কারণ বা দ্বিতীয় বন্যার ভয় ভুলে মানুষ এখন একে অপরের জীবন বাঁচানোর লড়াইয়ে নেমেছেন।