নেপালে খাবার থেকে মরদেহও বহন করছে ড্রোন!

হিমালয় কন্যা নেপালে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া প্রলয়ঙ্করি বন্যা ও ভূমিধসের চরম ভয়াবহতার মাঝে এক অভাবনীয় প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ধার অভিযানের দৃশ্যপট তৈরি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা নুয়াকোটের দেবীঘাটে নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতিতে একটি ভারী ড্রোন উড়তে দেখা যায়, যার নিচে ঝুলছিল একটি মরদেহ।

যেসব দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে মানুষের পক্ষে পৌঁছানো সম্পূর্ণ অসম্ভব ছিল, সেখান থেকে মৃতদেহ নিরাপদে সরিয়ে আনতে এই বিশেষ ড্রোন প্রযুক্তি মোবায়েন করা হয়। দেবীঘাট-৩ থেকে দেবীঘাট-৫ এলাকা পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে ড্রোনটির মাধ্যমে মোট সাতটি মরদেহ আকাশপথে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া হয়।

Nepal Drone 04
মাত্র এক দশক আগে ২০১৫ সালের ৭.৮ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর আন্তর্জাতিক বিভিন্ন উদ্ধারকারী সংস্থা ত্রাণ সহায়তায় ও ক্ষতি মূল্যায়নে যে ড্রোন প্রথম নেপালে নিয়ে এসেছিল, বুধবার স্থানীয় নেপালি যুবকদের অদম্য উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতার ওপর ভর করে দেশটি দুর্যোগ মোকাবিলায় ড্রোনের অভূতপূর্ব ব্যবহার করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিচ্ছে।

বর্তমান সময়ে নেপালে ড্রোন শুধু ছবি তোলা বা আকাশপথের মানচিত্র তৈরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। চলতি বছরের বসন্তে এভারেস্ট বেস ক্যাম্প থেকে ঝুঁকিপূর্ণ খুম্বু আইসফলের ক্যাম্প-১ এ পর্বতারোহী ও শেরপাদের জন্য মাত্র ৬ থেকে ৭ মিনিটে জরুরি অক্সিজেন সিলিন্ডার, ওষুধ, দড়ি ও মই পৌঁছে দিয়েছে উন্নত ক্ষমতার ড্রোন, যা আগে মানুষের হেঁটে অতিক্রম করতে প্রায় ৭ ঘণ্টা সময় লাগত। জীবন বাজি রেখে শেরপাদেরকে আর অতি ঝুঁকিপূর্ণ খুম্বু আইসফল অতিক্রম করতে হচ্ছে না। একই সঙ্গে সচল গিরিখাত স্ক্যান ও বরফের দেয়ালের থ্রি-ডি ম্যাপিং করে শেরপা ও গাইডদের তুষারধসের পূর্বাভাসও জোগাচ্ছে এই ড্রোন প্রযুক্তি।

Nepal Drone 03
পাহাড়ের চূড়া ছাড়িয়ে এই প্রযুক্তি এখন প্লাবিত লোকালয়ে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। দেবীঘাট-৩ গ্রামে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত ড্রোন উড়ে উড়ে গ্রামবাসীদের অবস্থান অনুসরণ করে এবং ড্রোনটিতে যুক্ত স্পিকার চালু করে তাদের কাছে প্রয়োজনের কথা জানতে চায়। 'এয়ারলিফট টেকনোলজি'র পরিচালক ও ড্রোন পাইলট মিলন পান্ডে জানান, সংকেত ও ইশারার ওপর ভিত্তি করে মাত্র তিন দিনে আক্রান্তদের জন্য প্রায় ১.৫ টন খাদ্য ও জরুরি ওষুধ বিতরণ করা হয়েছে। এমনকি সোমবারে দেবীঘাটের একটি চারতলা স্কুলের ছাদে ড্রোন দিয়ে জরুরি ত্রাণ নামিয়ে দেয়ার পর তা স্থানীয় ওয়ার্ড চেয়ারম্যানের মাধ্যমে বণ্টন করা হয়।

Nepal Drone 02
উদ্ধার কাজে 'হামি নেপাল'-এর নেতৃত্বে গঠিত যৌথ ড্রোন দলে গরুড়এক্স, নেপাল পুলিশ, নেপাল সেনা বাহিনী ও সশস্ত্র পুলিশ দলের সদস্যরা যৌথভাবে কাজ করছেন। এতে ব্যবহৃত হচ্ছে ‘ডিজেআই ফ্লাইকার্ট ১০০’ মডেলের ভারী শিল্প পণ্যবাহী ড্রোন, যা সর্বোচ্চ ৮৫ কেজি ওজন বহনে সক্ষম এবং ৪ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে পারে। এছাড়া নদীর তীর ও জলসীমায় তাপমাত্রার তারতম্য শনাক্তকারী 'থার্মাল ড্রোন' ব্যবহার করে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া জীবিতদের সন্ধান করা হচ্ছে।

Nepal Drone 02
শুধুমাত্র উন্মুক্ত আকাশে নয়, মাটির গভীরেও নামানো হয়েছে ড্রোন। আপার ত্রিশূলী-১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের মাটির নিচের সুড়ঙ্গে, যেখানে ইন্ডিপেন্ডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার্স অ্যাসোসিয়েশন অফ নেপালের মতে প্রায় ৯০০ জন শ্রমিক নিখোঁজ রয়েছেন, সেখানে ড্রোন প্রবেশ করিয়ে অনুসন্ধান চালিয়েছে উদ্ধারকারী দল। প্রতিকূল আবহাওয়া, ব্যাটারির সীমাবদ্ধতা আর ভৌগোলিক দূরত্বের প্রতিবন্ধকতা থাকলেও হেলিকপ্টারের চেয়ে বহুগুণ সাশ্রয়ী ও দ্রুত হওয়ায় ড্রোন এখন নেপালে বিকল্পহীন হয়ে উঠেছে। বিশ্বব্যাংকের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দুর্যোগপ্রবণ হয়ে ওঠা এই হিমালয় অঞ্চলে নেপালের এই দেশীয় ড্রোন প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে বিশ্বের অন্যান্য দুর্যোগপ্রবণ দেশগুলোতেও রপ্তানি সম্ভব হবে। উপযুক্ত সরকারি নীতিমালা পেলে এই দেশীয় প্রযুক্তি নেপালের সার্বিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা খাতে এক নতুন বিপ্লব আনবে।

তথ্যসূত্র: কাঠমান্ডু পোস্ট