চীন-নেপাল সীমান্তে হিমালয় অঞ্চলে সংঘটিত প্রলয়ঙ্করী আকস্মিক প্লাবন ও ধসের ধ্বংসস্তূপ থেকে চার জনের অলৌকিক উদ্ধারের পর সোমবারও সুড়ঙ্গে আটকে পড়া ১০০ জনেরও বেশি জলবিদ্যুৎ কর্মীর খোঁজে উদ্ধার অভিযান জোরদার করেছে নেপালের সেনাবাহিনী ও উদ্ধারকারী দল।
হিমালয়ের দুর্গম পার্বত্য এলাকায় গ্রাম ও শহর মাটির নিচে চাপা পড়া এই ট্র্যাজেডির ১৩তম দিনে সারা দেশে যখন নিহত শত শত মানুষের জন্য প্রথাগত হিন্দু রীতি মেনে শোক পালন করা হচ্ছে, তখনো সুড়ঙ্গের ভেতর জীবনের স্পন্দন পাওয়ার আশায় লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা।
গত ২৬ আগস্ট তিব্বত সীমান্তে একটি বিশালাকার হিমবাহ ভেঙে কাদা ও পাথরের প্রকাণ্ড ধস নদীতে আছড়ে পড়ে। এতে তৈরি হওয়া জলোচ্ছ্বাস মুহূর্তের মধ্যে ঘরবাড়ি, সড়ক ও মহাসড়ক ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে। নেপাল ও চীন তিব্বত মিলিয়ে এ পর্যন্ত অন্তত ১,৩৮০ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে এবং প্রায় ৫,৫০০ জনেরও বেশি মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
উদ্ধারকর্মীরা জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোতে নিখোঁজ ৯০০ জনের মধ্যে প্রায় ১২১ জন সুরঙ্গের ভেতরে আটকা পড়ে থাকতে পারেন। ক্ষতিগ্রস্ত রাসাওয়া জেলার চিলিম জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে নিখোঁজ ছয়জনের মধ্যে অন্তত চারজন এখনো জীবিত থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
উদ্ধার কাজে যুক্ত নেপালি আইনপ্রণেতা শ্রী রাম নিউপানে জানান, চিলিম প্রকল্পের উদ্ধার অভিযানে বিশেষায়িত যন্ত্রপাতি ব্যবহারের কৌশল চিহ্নিত করা হয়েছে। সুড়ঙ্গগুলোর ভেতরে বাতাসের পকেট এবং আশ্রয় নেয়ার মতো পর্যাপ্ত খালি জায়গা থাকায় শ্রমিকদের এখনো জীবিত পাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
সম্প্রতি উদ্ধারকারী দলগুলো চারজনকে অলৌকিকভাবে জীবিত উদ্ধার করায় আশার আলো আরও উজ্জ্বল হয়েছে। গত শনিবার এক চীনা নাগরিককে একটি সুরঙ্গ থেকে জীবিত টেনে তোলা হয়। এর আগে শুক্রবার অন্য একটি সুরঙ্গ থেকে উদ্ধার করা হয় দুই জলবিদ্যুৎ কর্মীকে। একই দিনে, মাটি ও ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকা একটি ঘর থেকে এক নেপালি নারীকে জীবিত উদ্ধার করা হয়।
দুর্ঘটনার ১৩তম দিনে নিহতদের স্মরণে নেপালের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে দেশে ও বিদেশের সব সরকারি দপ্তরে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়েছে। তবে নিখোঁজদের সন্ধানে মূল অভিযান চালু থাকায় কোনো প্রাতিষ্ঠানিক আনুষ্ঠানিকতা রাখা হয়নি। জাতীয় জরুরি পরিচালনা কেন্দ্রে কর্মকর্তা ফণীন্দ্র পৌডেল জানান, উপদ্বুত এলাকায় জোর উদ্ধারকাজ চলায় সাধারণ কর্মসূচি স্থগিত রাখা হয়েছে।
দেশটির রাষ্ট্রপ্রধান রাষ্ট্রপতি রামচন্দ্র পৌডেল সোমবার দুর্যোগ কবলিত এলাকা পরিদর্শন করে ধ্বংসযজ্ঞের মাত্রা পর্যালোচনা করেন। আক্রান্ত এলাকায় উদ্ধার ও মহামারী প্রতিরোধ নিশ্চিত করতে নেপাল সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে জরুরি ভিত্তিতে ড্রোন, বেইলি ব্রিজ, ডিএনএ টেস্টিং কিট, টানেল রেসকিউ স্যুট এবং চিকিৎসা সামগ্রীর আকুল আবেদন জানিয়েছে।
তিব্বত সীমান্ত অংশে চীনা কর্তৃপক্ষ রবিবার আরও ১২টি মৃতদেহ উদ্ধারের কথা জানিয়েছে। তিব্বতের পবিত্র কৈলাশ পর্বত ও মানস সরোবর হ্রদ দর্শনে যাওয়া বহু ভারতীয় এবং ভারতীয় বংশোদ্ভূত পুণ্যার্থী এ ঘটনায় নিখোঁজ রয়েছেন। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বেইজিং উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রেখেছে এবং সার্বিক তথ্য দ্রুত শেয়ার করবে। বিদেশি পর্যটকদের পরিবারের চাপের মুখে চীন সরকার রোববার প্রথমবার রয়টার্সসহ ৮টি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকদের দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনের অনুমতি দিয়েছে।
অন্যদিকে, সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জেলা নুওয়াকোটে ২৬ আগস্ট বন্যা শুরুর সময় একটি কারাগার প্লাবিত হওয়ার আগেই সেনাসদস্যরা ৯২৪ জন বন্দীকে সুরক্ষিত উঁচু ভবনে সরিয়ে নিয়ে বড় বিপর্যয় থেকে রক্ষা করেন। বন্যার সুযোগে প্রাচীর ভেঙে পালানো ৫০ জন কয়েদিকেও দ্রুত পাকড়াও করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহ।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স