হিমবাহ ধস ও নেপালের বন্যার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তন!

গত আগস্টের শেষের দিকে নেপাল ও তিব্বতের বিশাল এলাকায় নজিরবিহীন ও প্রলয়ংকরী বন্যা সৃষ্টি করা ভয়াবহ হিমবাহ ধসের পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের হাত থাকার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন গবেষকরা। সম্প্রতি প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন’ (ডব্লিউডব্লিউএ)-এর এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত করেছেন, গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে এই অঞ্চলে তাপমাত্রা দ্রুত বৃদ্ধির কারণে হিমালয়ের বরফ গলছে এবং পারমাফ্রস্ট বা চিরহিমায়িত শিলাস্তর শিথিল হয়ে পড়ছে, যা প্রায় ১,৪০০ মানুষের জীবন কেড়ে নিয়েছে এবং হাজার হাজার মানুষকে নিখোঁজ করেছে।

লংটাং লিরুং পর্বত থেকে প্রায় ২ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে থাকা বিশাল বরফ ও শিলাস্তর খসে পড়ার সুনির্দিষ্ট কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, গত আগস্ট মাসে হিমালয় অঞ্চলে গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল, যার মধ্যে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা সরাসরি মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৃদ্ধি পেয়েছে।

Nepal Flood 03
এই অস্বাভাবিক উষ্ণতার কারণে তুষারপাতের বদলে বৃষ্টির পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা মাটির গভীরের স্থায়ী বরফ গালিয়ে পাহাড়ের গা ভঙ্গুর করে তোলে। লন্ডন ইম্পেরিয়াল কলেজের জলবায়ুবিজ্ঞানী ফ্রিডেরিকে অটো স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, হিমবাহের ক্ষয় এবং পারমাফ্রস্ট গলে যাওয়ার পেছনে মানুষের তৈরি জলবায়ু পরিবর্তনের অবদান নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, গত বছরের অক্টোবর ও নভেম্বরের অতিরিক্ত তুষারপাত বরফ গলে যাওয়া পানির পরিমাণ আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল, যা মূলত হিমবাহ ধসের সূচক হিসেবে কাজ করেছে। ২০০০ সাল থেকে এই অঞ্চলের হিমবাহগুলো বছরে গড়ে প্রায় আধা মিটার করে সংকুচিত হচ্ছে, যা পাহাড়ের শিলাস্তরের ওপর চরম চাপের পরিবর্তন আনছে। পাশাপাশি, ২০১৫ সালে ওই একই পর্বতে আঘাত হানা ৭.৮ মাত্রার শক্তিশালী ভূমকম্পনটিকেও এই ভূমিধসের অন্যতম অনুঘটক হিসেবে মনে করা হচ্ছে। ভূকম্পনটি পাহাড়ের ভিত দুর্বল করে দিয়েছিল বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা।

Nepal Flood 02
উট্রেখ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের মাউন্টেন হাইড্রোলজিস্ট ওয়াল্টার ইমারজিল এই পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বলেছেন, পর্বতটি ভূস্তাত্ত্বিকভাবে এমনিতেই অত্যন্ত সংবেদনশীল অবস্থায় ছিল। ২০১৫ সালের ভূমিকম্প হয়তো একে প্রাথমিক ধাক্কা দিয়েছিল, তবে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে হিমবাহ ও পারমাফ্রস্টের বিলুপ্তি, অস্বাভাবিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং অতিরিক্ত বরফগলা পানি চূড়ান্ত মুহূর্তে পাহাড়ের ওই ঢালকে সম্পূর্ণ অস্থিতিশীল করে তোলে। বিশ্ব উষ্ণায়নের এই মারাত্মক প্রভাব যেভাবে হিমালয় অঞ্চলের বাস্তুতন্ত্রকে হুমকির মুখে ফেলছে, তা পুরো দক্ষিণ এশিয়ার জন্য এক বড় সতর্কবার্তা।

তথ্যসূত্র: এনডিটিভি