টিপের ইতিবৃত্তঃ সেকাল-একাল

প্রভাষক লতা সমদ্দার শহরের মূল পথ ধরে যেকোনো দিনের মতোই ফিরছিলেন নিজ গন্তব্যে। সেই একই পথে ছিলেন পুলিশ কন্সটেবল নাজমুল। তবে একটি সাধারণ দিনের তুলনায় কিছুটা ভিন্ন দিকে মোড় নেয় সেদিনের ঘটনাপ্রবাহ- যখন কপালে টিপ পরায় লতা সমদ্দারকে হেনস্তার অভিযোগ আসে কন্সটেবল নাজমুলের বিরুদ্ধে। প্রাথমিক তদন্তে নাজমুলের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতাও পেয়েছে পুলিশ বিভাগ। এ ঘটনার পর 'টিপ' কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শুরু হয় তোলপাড়। নানান জন নানান মত তুলে ধরে ব্যক্ত করেন টিপের প্রাসঙ্গিকতা, প্রয়োজনীয়তা ও কারো কারো কাছে অপ্রয়োজনীয়তা। কেউ কেউ তুলে এনেছেন টিপ সংক্রান্ত ধর্মীয় নৈতিকতা ও দৃষ্টিকোণ। এসবের মাঝে একাত্তর অনলাইন করেছে টিপের উৎসের সন্ধান-

(হাজার বছর আগের ভারতই চিত্রকর্মে টিপ পরিহিত পুরুষ)


'ললাটে জ্বলিছে তব উদয়াস্ত আকাশের রত্নচূড় ময়ূখের টিপ,

কোন্ দূর দারুচিনি লবঙ্গের সুবাসিত দ্বীপ'

বাংলার শুদ্ধতম কবি জীবনানন্দ দাশের এই চারণের মতোই টিপের উৎস খুঁজতে গেলে আমাদের ভ্রমণ করতে হবে সুবাসিত এক সুদূর ইতিহাসের দিকে। 

উপমহাদেশের টিপের ইতিহাস বেশ পুরানো। কেবল নারী নয়, এই অঞ্চলের পুরুষের মাঝেও টিপের চর্চা ছিল বেশ নিয়মিত বিষয়। টিপ উপমহাদেশের ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলংকা, মৌরিতানিয়া, মায়ানমার থাইল্যান্ডে সাজ সজ্জার অতি প্রচলিত এক অনুষঙ্গ। 

অবশ্য সবসময় টিপ কেবলই সাজসজ্জার বিষয় হিসেবে দেখা হতো না। এর সাথে জরিয়েছিল সেই সময়ের মানুষের নানা বৈচিত্রময় ধ্যান ও ধারণা। প্রাচীন ভারতে টিপকে মনোযোগের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হতো। একইসাথে টিপকে তৃতীয় চোখের প্রতিনিধি হিসেবে বিবেচনা করতো অনেকে।

দুই ভ্রুর মাঝখানে অলঙ্করণ করা এই চক্রকে বিন্দিও বলা হয় আমাদের উপমহাদেশের বেশিভাগ স্থানে, বিন্দি শব্দটি বিন্দু থেকে এসেছে। বিন্দুকে মহাবিশ্বের সূচনার প্রতীক হিসেবে বৈদিক যুগের সাধকেরা টিপ পরিধান করতেন। বলা যেতে পারে, সাধুদের কাছে মহাবিশ্বকে কপালের মাঝখানে লালনের এক প্রতীক ছিল টিপ। এছাড়া প্রাচীন ভারতে বিন্দির (টিপের) লাল রঙ সম্মান, প্রেম এবং সমৃদ্ধিরও প্রতিনিধিত্ব করে।


অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মতে, হাজার হাজার বছর ধরেই বিশ্বের অনেক দেশের নারীদের মধ্যে টিপ পরার রীতি চালু রয়েছে। এটা শুধুমাত্র বাঙালি জাতি বা নির্দিষ্ট কোনো সম্প্রদায়ের কোন ব্যাপার ছিল না। আঠারো শতকে এ অঞ্চলে টিপের ব্যবহার খুব সাধারণ হয়ে উঠেছিল। সেই সময় সব ধর্মের নারীদের মধ্যেই টিপ পরার প্রচলন ছিল। তখনকার মুসলমানদের মধ্যেও টিপের প্রচলন ছিল উল্লেখযোগ্য। বিশেষ সাজগোজ করার সময় টিপকে শেষ উপকরণ হিসাবে ব্যবহার করতো নারীরা। সব ধর্ম, সব শ্রেণির নারীদের মধ্যেই এই রীতি চালু ছিল।

ইতিহাসের অলিগলি বইয়ে জিয়াউল হক টিপ প্রসঙ্গে লিখেছেন : টিপের রীতি চালু হয়েছে প্রায় ৯৫০০ থেকে ১১৫০০ বছর আগে। সেই সময় তৎকালীন সমাজে শ্রেণিভেদ প্রবল ছিল। সমাজে উচ্চ শ্রেণির মানুষেরা পবিত্রতার প্রতীক হিসাবে তারা কপালে চন্দনের সাদা বিন্দু ব্যবহার করতেন। 

এছাড়া যোদ্ধারা ক্ষিপ্ততা, হিংস্রতা ও সাহসের প্রতীক হিসাবে তারা কপালে লাল টিপ দিতো।

তিনি আরও লিখেছেন, সেই সময় যেসব নারীদের মন্দিরে উৎসর্গ করা হতো, তাদের চিহ্নিত করার জন্যও টিপ দেয়ার রীতি চালু হয়েছিল।

এই উপমহাদেশের সময়রেখার আকেবাকে চোখ মেলে তাকালেই টিপ ব্যবহারের বহু বৈচিত্রময় ইতিহাস খুঁজে পাওয়া যাবে। 

টিপের ইতিহাসের যেমনই হোক, এ অঞ্চলের নারীদের জীবনে টিপের আবেদন ও প্রাসঙ্গিকতা ভিন্ন এক রূপ নিয়েছে সাম্প্রতিককালে। 

বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই শিক্ষিত, আধুনিক ও মননশীল নারীদের ফ্যাশন আইকনে পরিণত হয় টিপ। 

ষাট-সত্তরের দশকের কিংবা এরও আগে সাদাকালো সিনেমা-গুলোয় বড় খোঁপার সঙ্গে কপালের ভ্রু’র বেশ কিছুটা ওপরে মাঝারি কিংবা ছোট্ট টিপ পরতে দেখা যএতো সিনেমার নায়িকাদের। 


৬০ কিংবা ৭০ দশক থেকে নাট্যজন ফেরদৌসী মজুমদার সবসময়েই পরেন বড় গোল টিপ। ভাস্কর মুক্তিযোদ্ধা ফেরদৌসি প্রিয়ভাষিণী সবসময়েই পরতেন বড় গোল টিপ। জনপ্রিয় নজরুল গীতি শিল্পী ফেরদৌস আরাকেও সবসময়ই শাড়ির সাথে ম্যাচিং টিপ পরতে দেখা যায় ।

ব্যান্ডদল লালন’র কণ্ঠশিল্পী সুমি। তার সাজের একটি বিশেষত্ব— সব পোশাকের সঙ্গেই তিনি সবসময় বড় টিপ পরেন। বাঙালি নারীর যে মাধুর্য, তা অনেকটা টিপের মাধ্যমেই ফুটিয়ে তোলা যায়— এমনটিই এক সাক্ষাৎকারে গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন তিনি।


শুধু বাংলাদেশের নারীরাই নয়, সর্বভারতীয়তার সাথে একাত্মতা পোষণ করতে বিভিন্ন সময় টিপ পরেছেন বিশ্বখ্যাত শিল্পি ম্যাডোনা , অন্যান্য সেলেব্রিটিদের ভেতর জেন স্টেফানি, লিজ হারলি, অ্যাঞ্জেলিনা জোলি, জুলিয়া রবার্টস, চেরি ব্লেয়ারসহ আরও অনেকে। ক্রমেই টিপ হয়ে উঠেছে এখন উপমহাদেশের  বাহিরেও একটি জনপ্রিয় ফ্যাশন আনুষাঙ্গিক।


টিপ নিয়ে ইসলামে ধর্মীয় বিধি-নিষেধ রয়েছে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির ইসলামিক বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মুখতার আহমেদ বলেন, শরীয়া দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বলতে গেলে, একজন মুসলমান নারী টিপ পরতে পারবেন কি পারবেন না, এ ব্যাপারে স্পষ্ট কোন দিক নির্দেশনা কোরান বা হাদিসে নেই। একজন নারী তার সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য অবশ্যই বিভিন্ন ধরনের অলংকার পরতে পারবেন। টিপও তার অলংকরণ বা সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য একটি উপকরণ হিসাবে তিনি ব্যবহার করতে পারবেন। টিপ পরা নিষিদ্ধ, এরকম কোন বক্তব্য কোরান বা হাদিসে নেই।

টিপে নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় যখন সোরগোল চলছে, তখনই টিপ কেন হারাম- এ সংক্রান্ত একটা তফসির ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। মূলত নবী ইব্রাহীম (আঃ)'কে বাদশাহ নমরুদ আগুনের কুন্ডুলিতে নিক্ষেপের সময় টিপ পরিহিত কিছু ব্যাভিচারী নারী নমরুদকে সাহায্য করেছিলেন বলে বর্ণিত আছে সেই তফসিরে। তবে ফ্যাক্ট চেক দেখা গেছে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের ২৫টি সূরায় ২০৪টি আয়াত বর্ণিত হয়েছে।

এই কয়েকশো আয়াতের মধ্যে বেশ কয়েকবার আগুণে নিক্ষেপের কথা এসেছে। কিন্তু কপালে টিপ পরা মহিলাদের বর্ণনা নেই কোথাও। এমনকি এই ধরনের কোনো ঘটনার হাদিসের কোথাও উল্লেখ পাওয়া যায়নি।

কপালে টিপ বাঙালি তথা আধুনিক বাঙালি নারীর প্রাত্যহিক জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে বহু আগেই। বাঙালি নারীদের ক্ষেত্রে কপালে একটি টিপ দেয়া সৌন্দর্য চর্চার অন্যতম এক অনুষঙ্গ। বর্তমানে অনেক নারী টিপ পরাকে আত্মবিশ্বাসের প্রতীক হিসবেও শোভা দেন কপালের মাঝখানে। ভারতীয় উপমহাদেশে সিংহভাগ নারীর জীবনেই টিপ দৈনিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে ইতিমধ্যেই।


একাত্তর/এসএ