‘মিস ট্রান্স পাকিস্তান’ শায়রার বদলে যাওয়া জীবন

ট্রান্সজেন্ডার নারীদের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য প্রতিযোগিতার নাম 'মিস ইন্টারন্যাশনাল কুইন'। আর এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়ার জন্য প্রথম পাকিস্তানি ট্রান্সজেন্ডার নারী হিসেবে আমন্ত্রণ পেয়েছেন শায়রা রয়। 

তবে আর্থিক কারণে এ প্রতিযোগিতায় শেষ পর্যন্ত অংশ নিতে না পারলেও শায়রার মতে, মিস ট্রান্স পাকিস্তানের মুকুট জিতে মিস ইন্টারন্যাশনাল কুইনে ডাক পাওয়া তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। 

শুধু মডেলই নন, একজন সঙ্গীতশিল্পী হিসেবেও নাম কুড়িয়েছেন শায়রা রয়। ‘কামলি’ ও ‘রাত’ নামে দুটি গান প্রকাশিত হয়েছে তার। 

২০২১ সালে মিস ট্রান্স পাকিস্তানে অংশগ্রহণ করে বিজয়ী হন শায়রা রয়। এর আগে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে জীবনযাপন করা শায়রার জীবন রাতারাতি পরিবর্তন হয়ে যায়। 

তবে তার আগ পর্যন্ত তাকে কম কাঠখড় পোহাতে হয়নি। তবে হুমকি, অপমান আর নির্যাতন সহ্য করেও দেশ ছাড়েননি তিনি। 


মিস ট্রান্স পাকিস্তান প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে জয়লাভের পর শুধু তার নিজের জীবনেই পরিবর্তন আসেনি। এর মাধ্যমে তিনি বুঝতে পারেন নিজের কাঁধে কত বড় দায়িত্ব বহন করছেন তিনি, আর সে অনুযায়ী তাকে আচরণ করতে হবে। 

শায়রা বলেন, 'মিস ট্রান্স পাকিস্তান হওয়ার পর আমি আমার প্রজেক্টগুলো নিয়ে আরও সচেতন হতে শুরু করি। পাকিস্তানের তরুণ ও ট্রান্স জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি হিসেবে কোনো গান বা স্ক্রিপ্ট নিয়ে কাজ করার আগে আমি নিজের দায়িত্বগুলো সম্পর্কে সময় নিয়ে চিন্তা করি।'

পেশাগত জীবনে এই মাইলফলক অর্জনের পর শুধু তার কমিউনিটির সদস্যদেরই এই পরিবর্তনের সাথে খাপ খাওয়াতে হয়নি। তার সাথে আশেপাশের সবার আচরণই বদলে যায়। 

'আমার মনে আছে আমি মিডিয়া ও ব্লগারদের পেছন পেছন ঘুরতাম, কিন্তু তারা আমাকে পাত্তা দিত না। তবে শিরোপা জেতার পর রাতারাতি আমার জীবন পাল্টে যায়', বলেন তিনি। 

নিজের ব্যক্তিগত পরিবর্তনের ব্যাপারে শায়রা বলেন, আত্মবিশ্বাসের সঠিক ভারসাম্য খুঁজে পেয়েছেন তিনি। 

‘আমি নিজেকে সুন্দর মনে করি, বিশেষ মনে করি এবং আমি আগের চেয়ে বেশি সম্মান পাই। একটা সময় ছিল যখন মানুষ আমাদের দিকে এমনভাবে তাকাত যেন আমরা এলিয়েন। কিন্তু এখন আমরা বিউটি কুইন আর পাকিস্তানের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এই শিরোপা জেতার পর সেটা নিয়ে গর্ব করা ও আরও বেশি উদযাপন করা থেকে নিজেকে থামাতে পারিনি’, বলেন তিনি। 

সরকারের কাছ থেকে কোনো সহায়তা পেয়েছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি হেসে বলেন, একসময় তার পরিবার তাকে বয়কট করেছিলো। পানি কিনে খাওয়ার টাকাও তার কাছে ছিল না। ঘরহীন হয়ে আশ্রয়ের খোঁজ করছিলেন তিনি। 

সাহায্যের জন্য এনজিও এবং তথাকথিত ট্রান্স সহায়তা সংগঠনের কাছে গেলে তারা তাকে ফিরিয়ে দেয়। এখন পর্যন্ত কোনো বৈধ ট্রান্স সংগঠন পাকিস্তান সরকারের কাছ থেকে সহায়তা পেয়েছে বলে তার জানা নেই। 

সৌন্দর্য প্রতিযোগিতায় তার সবচেয়ে পছন্দের অংশ কোনটি সে সম্পর্কে শায়রা বলেন, মেকওভারের জন্য প্রস্তুত হওয়া আর বিভিন্ন লুক ট্রাই করে দেখা তার সবচেয়ে পছন্দের অংশ। 

তিনি বলেন, 'প্রতিযোগিতায় নিজের শব্দচয়ন ও শরীরী ভাষা নিয়ে অভিজাত ও পরিপাটি হতে হয়। আমি এর সবকিছুই উপভোগ করি।' 

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সৌন্দর্য প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারীদের জন্য পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে কোনো প্রকার আর্থিক সহায়তা দেয়া হয় না। 

ফলে তাদেরকে এসবের এন্ট্রি ফি নিজেদেরই যোগাতে হয়। এ নিয়ে আক্ষেপও প্রকাশ করেন শায়রা। শেষ মুহূর্তে তার ব্যক্তিগত স্পন্সর টাকা দিয়ে অস্বীকৃতি জানানোয় তিনি শেষ পর্যন্ত মিস ইন্টারন্যাশনাল কুইন প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারেননি। 

উঠতি ট্রান্সজেন্ডার মডেলদের প্রতি শায়েরা বলেন, ‘নিজেদের অধিকার নিয়ে আওয়াজ তুলতে ভয় পাবে না। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হচ্ছে, পড়াশোনা করবে’।

তিনি চান না তার কমিউনিটির সদস্যরা রাস্তায় রাস্তায় ভিক্ষে করুক। তার মতে তাদের প্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিৎ মাফিয়া ছেড়ে ঐক্যবদ্ধ হয়ে পড়াশোনা করা।


একাত্তর/এসজে