মুক্ত জলাশয়ে সাঁতারের যত সব স্বাস্থ্য ঝুঁকি!

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের জনপ্রিয়তা, শহরের 'ব্লু স্পেস' (সবুজ আঙ্গিনা) প্রচারণা এবং মানসিক চাপ কমানোর কম খরচের উপায় হিসেবে খোলা জলাশয়ে সাঁতার, যেমন নদী, লেক বা পুকুরে নামার প্রবণতা যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বজুড়ে আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাকৃতিক জলাশয়ের কাছাকাছি সময় কাটালে মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটে এবং মানসিক চাপ কমে। তবে, এর মুদ্রা পিঠও রয়েছে; নদীর পানি অনেক সময় ড্রেন ও পয়ঃনিষ্কাশনের বর্জ্য, খামার থেকে আসা রাসায়নিক এবং ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ও শৈবালে সয়লাব থাকে। ফলে অসতর্কভাবে সাঁতার কাটলে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

Open water swimming 05
পানি দূষণের প্রধান কারণসমূহ

১. পয়ঃবর্জ্য ও বৃষ্টির পানি: ভারী বৃষ্টিপাত বা ঝড়ের সময় ড্রেনেজ ও স্যুয়ারেজ ব্যবস্থা ওভারলোড হয়ে যায়। এই পরিস্থিতিতে পয়ঃনিষ্কাশন কেন্দ্রগুলো বর্জ্য সরাসরি নদীতে বা হ্রদে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় (যা ‘কম্বাইন্ড সিওয়ার ওভারফ্লো’ নামে পরিচিত)। ভারী বৃষ্টির পর অন্তত ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টা শহরের নদীগুলোর পানি অণুজীবঘটিত কারণে পানের বা সাঁতারের অনুপযোগী থাকে।

২. খামারের বর্জ্য: বৃষ্টির পানির সাথে কৃষিজমির বর্জ্য, গবাদি পশুর মল এবং সার ধুয়ে নদীতে এসে পড়ে। এটি পানিতে ব্যাকটেরিয়ার পরিমাণ বাড়িয়ে দেয় এবং শৈবাল গজাতে সাহায্য করে।

Open water swimming 04
৩. নীল-সবুজ শৈবাল বা সায়ানোব্যাকটেরিয়া
: ধীরগতির বা অপেক্ষাকৃত গরম পানিতে বিষাক্ত নীল-সবুজ শৈবাল জন্মায়। এই শৈবালের তৈরি টক্সিন মানুষের ত্বক ও চোখে জ্বালাপোড়া সৃষ্টি করে এবং কখনো কখনো যকৃৎ (লিভার) ও স্নায়ুতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে।

৪. লেপ্টোস্পাইরোসিস: এটি ইঁদুর ও অন্যান্য গবাদি পশুর প্রস্রাবের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি প্রাণঘাতী ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ। সাঁতারের সময় এই পানিতে থাকা ব্যাকটেরিয়া শরীরে প্রবেশ করলে শরীরের অঙ্গপ্রতঙ্গ ক্ষতি বা বিকল হতে পারে। খোলা জলাশয়ে সাঁতার কাটা অ্যাথলেটদের মধ্যে এই রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে।

৫. অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া: বর্জ্য শোধনাগার বা দূষিত পরিবেশ থেকে নদীতে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ই.কোলাই ব্যাকটেরিয়া ছড়িয়ে পড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত মুক্ত জলাশয়ে সাঁতার কাটা ব্যক্তিদের অন্ত্রে এই ধরনের ক্ষতিকর 'সুপারবাগ' থাকার ঝুঁকি বেশি। ফলে কোনো ইনফেকশন হলে সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে তা নিরাময় করা কঠিন হয়ে পড়ে।

Open water swimming 06
সাঁতার কাটার আগে যেসব সংকেত দেখে সতর্ক হবেন

অফিসিয়াল টেস্টের ফলাফলের ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে নিজের পর্যবেক্ষণ ব্যবহার করা অনেক বেশি কার্যকর। সাঁতার কাটার আগে পানি পরীক্ষা করে নিম্নলিখিত সংকেতগুলো খেয়াল করুন:

পানির রঙ ও ফেনা: পানি যদি ঘোলাটে সবুজ, মটরশুঁটির স্যুপের মতো ঘন সবুজ বা ফেনার মতো দেখায়, কিংবা পানির ওপর সবুজ রঙের আস্তরণ বা ফেনা জমে থাকে, তবে তাতে সাঁতার কাটা একেবারেই অনুচিত।

গন্ধ ও প্রবাাহ: পানিতে মলমূত্র, বর্জ্য বা কোনো রাসায়নিক পদার্থের দুর্গন্ধ থাকলে, অথবা পানি অতিরিক্ত কাদাটে ও বাদামী স্রোতযুক্ত হলে তা এড়িয়ে চলুন।

মৃত মাছ: পানিতে কোনো মৃত মাছ ভাসতে দেখলে বুঝতে হবে সেখানকার পরিবেশ বিষাক্ত।

আবহাওয়া: ভারী বৃষ্টি বা ঝড়ের পর অন্তত দুই থেকে তিন দিন নদীতে নামা এড়িয়ে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ।

Open water swimming 02
স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানোর উপায় ও সতর্কতা

পানি না গেলা: সাঁতার কাটার সময় কোনোভাবেই পানি পেটে যেতে দেওয়া যাবে না। গবেষণায় দেখা গেছে, পানি পানের পরিমাণের ওপর পেটের রোগ (যেমন ডায়েরিয়া, বমি বা পেটে ব্যথা) হওয়ার ঝুঁকি নির্ভর করে। শিশুদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি বেশি, কারণ তারা সাঁতার কাটার সময় অজান্তেই বেশি পানি গিলে ফেলে।

ক্ষত ঢেকে রাখা: শরীরে কোনো কাটা বা আঁচড় থাকলে তা ওয়াটারপ্রুফ ব্যান্ডেজ দিয়ে ভালো করে ঢেকে নিন, যাতে দূষিত পানি সরাসরি ক ক্ষতস্থানে প্রবেশ করতে না পারে।

সাঁতারের পর গোসল: সাঁতার শেষ করার সাথে সাথেই ভালো পানি দিয়ে পুরো শরীর ধুয়ে বা গোসল করে ফেলুন।

স্থান নির্বাচন: পয়ঃনিষ্কাশন ড্রেনের মুখ, বোট টার্মিনাল বা গবাদি পশুর খামার থেকে দূরে স্বচ্ছ ও প্রবাহিত পানিতে সাঁতার কাটা অপেক্ষাকৃত নিরাপদ।

Open water swimming 07
উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসা:
সাঁতার কাটার পর জ্বর, কাঁপুনি, মাথাব্যথা বা পেটের কোনো সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম এমন ব্যক্তি, অসুস্থ বা খোলা ক্ষত রয়েছে এমন ব্যক্তি এবং ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক জলাশয়ে সাঁতার কাটার বিষয়ে অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত, অথবা এটি পুরোপুরি এড়িয়ে চলাই শ্রেয়। প্রকৃতিকে উপভোগ করার পাশাপাশি স্থানীয় আবহাওয়া ও পানির অবস্থা সম্পর্কে সচেতন থাকাই মুক্ত জলাশয়ে সাঁতারের আনন্দ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে।

তথ্যসূত্র: বিবিসি