প্লেটো তাঁর লেখা ‘দ্যা অ্যালিগেরি ইন দ্য কেভ’ বইতে বোঝাতে চেয়েছিলেন যে মানুষকে বারবার একই কথা বোঝালে বা বললে সেটিকে অনেকে সত্য বলে বিশ্বাস করেন, বের হয়ে আলোর পথে অনেকে আসতে চান না। যারা আসেন তারা মানুষকে সত্য পথের সন্ধান দেন।
যে দলটি দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিল তারা ধর্মনিরপেক্ষতা ও সামাজিক গণতন্ত্রের উপর জোর দিয়েছিলেন।
দেশের সবচেয়ে পুরনো এই দলটি দেশকে দেখেছে সকল মানুষের জন্য। কোন ধর্মকে প্রাধান্য দিয়ে সংখ্যালঘুদের অধিকার বিনষ্ট করতে চায়নি দলটি। এ কারণে বাংলাদেশ সংবিধানের ৮ নাম্বার অনুচ্ছেদে জায়গা নিয়েছে চারটি মূলনীতি: গনতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ। তেমনিভাবে দলটির গঠনতন্ত্রে উল্লেখ রয়েছে রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা, সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রাখা সর্বোপরি জনসাধারণের স্বাধীনতাকে যথাযথ গুরুত্ব দেবে।
যেহেতু এই দল মনে করে জনগণ সকল ক্ষমতার উৎস তাই তাদের মৌলিক মানবাধিকার রক্ষা ও প্রতিষ্ঠা করাই হবে দলের মূল কাজ। এছাড়া ও রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, ও সাংস্কৃতিক মুক্তি ও কল্যাণ করাই হবে এই দলের মূল কাজ।
স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় স্বাধীনতার রূপকার জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে জড়িত ছিলেন বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিপরিষদের সদস্য খন্দকার মোশতাক এবং কর্নেল ফারুক, কর্নেল রশিদের মতো সেনাবাহিনীর কয়েকজন সদস্য। আবার সুবিধাবাদী পাকিস্তানপন্থি ব্যক্তিবর্গ যেমন ছিলেন তেমনি বহিঃবিশ্বের সমর্থনও ছিলো বলে জানা যায়।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অনেক, দলের সংবিধানে উল্লেখ রয়েছে ১৭টি যা দলের মূল চালিকাশক্তি বলে বিবেচিত নয়।
অনেকে জাতীয়তাবাদকে দলের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বলেন যা শুধু মুসলিম বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীকে বোঝায়, অন্যদিকে ধর্মনিরপেক্ষতা দলের সংবিধানে না থাকার কারণে দলটিকে প্রশ্নবিদ্ধ হতে হয় সবসময়। দলের প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে দেখা যায় ধর্মীয় আদর্শবাদীরা যারা এখানে এসেছে তারা মুসলিম লীগের সদস্য। ধর্মকে গণতন্ত্রের আভরণে ব্যবহার করার প্রবণতা এই দলে যেমন লক্ষ্য করা যায় তেমনি বামদলের এমপিদের সংখ্যা অনেক বেশি ছিল। তবে এই দল প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে ডান ও বামপন্থিদের মধ্যে প্রবল সক্রিয় অংশকে একত্র করেছিল। একদিকে মোল্লা অন্যদিকে বামপন্থি উভয়ের কাছ হতে পরামর্শ ও সহযোগিতা নেয়া হত।
ইস্পাত কঠিন গণঐক্যের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা, রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা ও গণতন্ত্র সুরক্ষিত ও সুসংহত করাকে এক নাম্বার লক্ষ্য হিসাবে ধরা হলে ও জননিরাপত্তা বিঘ্নকারীদের তালিকায় এই দলকে দেখা যায়। ২০০৪ সালের ২১শে অগাস্ট অত্যন্ত ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা, ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট একটা দেশের ৬৩ টি জেলায় সঙ্ঘবদ্ধভাবে সিরিজ বোমা হামলা চালায় যে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন (জেএমবি) তাদের সাথে এই দলের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়।
১৩ টি গ্রেনেড দিয়ে প্রধান টার্গেট শেখ হাসিনাকে মেরে ফেলার যে চেষ্টা চালানো হয় এত নৃশংস ইতিহাস খুঁজে পাওয়া যাবে না। অথচ তাদের গঠনতন্ত্রে রয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার বিরোধী, গোপন সশস্ত্র রাজনীতিতে বিশ্বাসী সক্রিয়ভাবে সংশ্লিষ্ট কোন ব্যক্তি বা সমাজ-বিরোধী ও গণবিরোধী কোন ব্যক্তিকে এই সংগঠনের সদস্য পদ দেয়া হবে না।
মার্কিন দূতাবাসের পলিটিক্যাল অফিসার আইজেন ব্রাউন এই দল গঠনে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করেছিলেন। বিচারপতি সায়েম বঙ্গভবনে শেষ দিনগুলি বইয়ে লিখেছেন যে তার ভাবনায় ছিল না সেনাপ্রধান এবং সামরিক আইনের অধীনে প্রেসিডেন্ট অর্থাৎ ক্ষমতাসীন হয়েই নির্বাচনে জিয়াউর রহমান অংশ নিবেন। আন্থনি মাসকারেনহাস তার ‘বাংলাদেশঃ এ লিগেসি অব ব্লাড’ বইয়ে ‘জিয়া একটি নাম একটি কিংবদন্তী’ অধ্যায়ে ১৫৫ পৃষ্ঠায় লিখেছেন তার প্রশ্ন ছিল ‘জিয়া কেমন লোক ছিলেন?’ ফিসফিস করে জেনারেল জিয়ার উত্তর ছিল, “জিয়া এমন এক মানুষ ছিলেন, যিনি এক হাতে হত্যা অন্য হাতে আহার করতে পারতেন”।
আন্থনির মতে, ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান মাত্র ৪৩ বছর বয়সে বাংলাদেশের সপ্তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন বিচারপতি সায়েমকে এক ঘোষণায় যা তাকে বাধ্য করা হয়েছিল। ঘোষণাটি ছিল শারীরিকভাবে অসুস্থতার কারণে তিনি অক্ষম প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনে। বিচারপতি সায়েম তার প্রতিশ্রুতি মোতাবেক ফেব্রুয়ারী মাসে নির্বাচন দিতে চেয়েছিলেন। নির্বাচন স্থগিত করার মূল কারণ ছিল জিয়ার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ গড়ার পরিকল্পনা।
বিচারপতি সায়েম দেশে গণতন্ত্র কায়েমের জন্য একজন প্রেসিডেন্ট হিসেবে চেয়েছিলেন জিয়াকে সরিয়ে একজন কম উচ্চাভিলাষী লোককে নিয়ে আসতে। এ খবর কানে আসতেই জেনারেল জিয়া উচ্চপদস্থ সব সামরিক কর্তাব্যক্তিদের নিয়ে বঙ্গভবনে প্রেসিডেন্টের কাছে চলে আসেন এবং প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের পদটি তাঁর নিকট ছেড়ে দিতে বলেন।
আন্থনি আর ও বলেন, সায়েম জেনারেল জিয়ার অনুরোধ প্রত্যাখান করেন কিন্তু উপস্থিত কারও কোন সমর্থন না পাওয়ায় রাত ১টার দিকে নরম হন ও হস্তান্তর কাগজে সই করেন। এরপর সায়েমকে সরিয়ে বঙ্গভবনে প্রেসিডেন্ট পদ দখল করা শুধু সময়ের ব্যাপার হয়ে দাড়ায়। জেনারেল জিয়া ২০ এপ্রিল ১৯৭৭ সালের মধ্যরাতে বিচারপতি সায়েমকে সরিয়ে রাষ্ট্রপতি পদ হতে পদত্যাগ করতে বলেন ও পরের দিন নিয়ে রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন।
রাষ্ট্রপতি পদ দখলের আগেই তিনি রাজনৈতিক দল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। দায়িত্ব দিয়েছিলেন মসিউর রহমান যাদু মিয়াকে। ১৯৭৭ সালে রাষ্ট্রপতি হয়ে ৩০ মে অনুষ্ঠিত হয় গণভোট। কারণ বন্দুকের নল নয়, জনগণই তাঁর ক্ষমতার উৎস একথা প্রমাণের দরকার ছিল।
তিনি হ্যা-না ভোট নিয়েছিলেন। তৎকালীন নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুসারে, ওই নির্বাচনে দেশের ৮৮.৫০ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছে এবং তাদের মধ্যে ৯৮.৯ শতাংশ হ্যাঁ ভোট দিয়েছে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা দাবি করেন, পরিসংখ্যানটি মিথ্যা, বানোয়াট। এর আগে জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালের ৩০ এপ্রিল নিজের শাসনকে বেসামরিক করার উদ্দেশ্যে ১৯ দফা কর্মসূচি ঘোষণা দিয়েছিলেন।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম গার্ডিয়ান দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ‘এই নির্বাচনে অনেক কেন্দ্রে মিনিটে ১১০ থেকে ১২০ শতাংশ ভোট পড়ার বিরল রেকর্ড হয়েছে (প্রতি ৪০ সেকেন্ডে ১ ভোট)’। আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে রাজনৈতিক দল গঠন করে ক্ষমতা বৈধ করার উদ্যোগ নেয়া হয়। এ পর্যায়ে মসিউর রহমান যাদু মিয়া পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারেননি জিয়াকে। তাই এক চুক্তি তিনি করেন নাম ছিল ‘গণতন্ত্রে উত্তরণের প্রক্রিয়া’।
এই চুক্তির কথা বিএনপির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মউদুদ আহমেদ, যাদু মিয়ার ভাই সিধু মিয়া ও মেয়ে রিটা রহমান সহ অনেকেই গণমাধ্যমে বলেছেন। চুক্তিতে যাদু মিয়াকে প্রধানমন্ত্রী করা, সংসদীয় গণতন্ত্রের পুনর্বহাল সহ অনেক বিষয় ছিল, কিন্তু যার কোনটাই রাখা হয় নাই এবং এক অজ্ঞাত কারণে ১৯৭৯ সালের ১২ মার্চ দুর্ঘটনায় আহত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। মসিউর রহমান যাদু মিয়ার সঙ্গে ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের পলিটিক্যাল কাউনসেলর আইজেন ব্রাউন নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন ও দল গঠনের বিষয়ে সহযোগিতা দিতেন।
দৈনিক প্রথম আলো ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১০ সালে সাংবাদিক মিজানুর রহমানকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে আইজেন ব্রাউন জানান যে, ‘পুরান ঢাকায় আমাদের গোপন বৈঠকগুলো হতো। এর সঙ্গে আমি সম্পৃক্ত ছিলাম। জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় ছিলেন।তিনি একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করেছিলেন’। সেনানিবাসে গোপন বৈঠকগুলোর খবর যে মসিউর রহমান যাদু মিয়ার কাছ থেকে পেতেন সে বিষয়কে নিশ্চিত করেন তিনি।
“১৯৭৮ সালের বসন্তে ঢাকার রাজনৈতিক বিষয় সম্পর্কে ওয়াশিংটনে প্রতিবেদন পাঠাতে পাঠাতে আমি ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। তখনকার বাংলাদেশের রাজনীতি সম্পর্কে তেমন কোন গল্প বলার কিছু ছিল না। তবে বাংলাদেশের অবসরপ্রাপ্ত কিছু ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে একটা সম্পর্ক বজায় রাখতে আমি সচেষ্ট ছিলাম”। প্রথম আলো কে দেয়া এক সাক্ষাতকারে মওদুদ আহমেদ বলেন মশিউর রহমান যাদু মিয়া এবং তিনি বিএনপি গঠন প্রক্রিয়ায় বড় ভূমিকা রাখেন।
১৯৭৮ সালের ১ মে জিয়াউর রহমানকে চেয়ারম্যান করে ৬টি দল নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট ঘোষণা করা হয়। অনেক জল্পনা-কল্পনার পর ১৯৭৮ সালের ১২ জুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেই নির্বাচনে জিয়াউর রহমান জয়লাভ করেন। ভাসানী-ন্যাপের সভাপতি মশিউর রহমান যাদু মিয়াকে প্রধানমন্ত্রীত্বের টোপ দিয়েছিলেন জিয়াউর রহমান তাই যাদু মিয়া নিজের দল ন্যাপ বিলুপ্ত করে বিএনপি গঠন করেন ও নিজ দলের প্রতীক ধানের শীষ ও দিয়ে দেন বিএনপিকে।
সে বছরেরই আগস্ট মাসে জিয়া জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট ভেঙে দিয়ে ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নামে একটি দল গঠন করা হয়। জিয়াউর রহমান কিন্তু তখনো সেনাপ্রধান। বৈধতার সঙ্কট অতিক্রমের জন্য দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশে ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৯ সালে অনুষ্ঠিত হয় । যার পুরষ্কার হিসেবে সংসদ নির্বাচনে ন্যাপের ৯২ জন নেতা বিএনপি হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়। যেখানে বিএনপির মোট এমপি ছিল ২০৬ জন। যা হোক মুন সিনেমা হলের মালিকানা নিয়ে রায়ে ১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত জারি করা সব ধরণের নির্দেশ অবৈধ ঘোষণা করে সংবিধানের পরিপন্থি হিসেবে রায় দেয় বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত।
লেখক: ড. আব্দুল আলীম, অধ্যাপক, আইন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
ইমেইল: alimlaw05@ru.ac.bd