দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে (প্রতিষ্ঠা পায় যুদ্ধ শেষে) ইংরেজী অভিধান নতুন একটি শব্দ লাভ করে যা বর্তমান বিশ্বরাজনীতির একটি আলোচিত বিষয়ও বটে, যাকে আমরা ‘জেনোসাইড’ নামে চিনি। এই শব্দটির স্থানীয় কোন সঠিক ভাষান্তর সহজ নয়, বরং করতে গেলে বিভ্রান্তি তৈরী হবার সম্ভাবনা রয়েছে।
যদিও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইহুদী ‘জেনোসাইডের’ পর ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া ‘জেনোসাইড’ সবচেয়ে বড় জেনোসাইডের ঘটনা, তবুও তা আজও জাতিসংঘ ও বিশ্ব স্বীকৃতি পায়নি।
বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় সংগঠিত নারকীয় ঘটনা এবং এর উদ্দেশ্য বিশ্লেষণ করে আন্তর্জাতিক তাত্ত্বিকেরাও এখানে ‘জেনোসাইড’ হয়েছে বলে মত দিয়ে আসছেন। যতদূর জানি ১৯৭১ সালেই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এবং প্রখ্যাত বাঙ্গালি চলচ্চিত্র পরিচালক জহির রায়হান ‘ষ্টপ জেনোসাইড’ নামে চলচ্চিত্রে নির্মাণ করেন, যেখানে ‘জেনোসাইড’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়।
এরপরেও এখনো দেশের একাডেমিশিয়ান এবং বড় বড় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে দেখা যায়, অনেকের মধ্যেই তত্ত্বগত ও তথ্যগত কিছু বিভ্রান্তি বিদ্যমান। ‘জেনোসাইডের’ জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রাপ্তিতে বর্তমানে সরকার ও বেসরকারি উদ্যেগে কিছু কাজ হচ্ছে। কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থা বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে ‘জেনোসাইড’ হয়েছে বলে স্বীকৃতি দিয়েছে।
১৯৭১ এ মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনের সন্তান ড. তৌহিদ রেজা নূরের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জেনোসাইড বিশেষজ্ঞদের আন্তর্জাতিক সমিতি আইএজিএস (International Associations of Genocide Scholars) ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের নাগরিকদের উপর ‘জেনোসাইড’ হয়েছে বলে স্বীকৃতি দিয়েছে। এই স্বীকৃতির জন্য আইএজিএস-এ ২০২১ সালে আবেদন জানিয়েছিলেন ড. তৌহিদ রেজা নূর। তাঁর আবেদন ও প্রচেষ্টার পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৪ এপ্রিল প্রস্তাবের ওপর ভোট অনুষ্ঠিত হয়। প্রদত্ত ২১৮টি ভোটের মধ্যে ২০৮ জন বাংলাদেশের পক্ষে ভোট প্রদান করেন।
এর আগেও তাঁরই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর প্রাক্কালে ২০২১ সালের ৩১ ডিসেম্বর, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নৃশংসতাকে ‘জেনোসাইড’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ‘লেমকিন ইনস্টিটিউট ফর জেনোসাইড প্রিভেনশন’।
২০২২-এর ফেব্রুয়ারি মাসে আরেক আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘জেনোসাইড ওয়াচ’ একাত্তরের নৃশংসতাকে জেনোসাইড হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে প্রস্তাব পাসের আহ্বান জানায়। উল্লেখ্য, এটারও আবেদন করেছিলেন ড. তৌহিদ রেজা নূর।
গত বছরের ২৪ মার্চ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের প্রচেষ্টার ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল কোয়ালিশন অব সাইটস অব কনসেন্স (আইসিএসসি) একাত্তরে বাংলাদেশে সংঘটিত নৃশংসতাকে জেনোসাইড হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
চলতি বছরের ২৯ থেকে ৩১ মার্চ বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগে জাতিসংঘের সদরদপ্তরে মুক্তিযুদ্ধের আলোকচিত্র প্রদর্শনী হয়। এই প্রদর্শনীরও পরোক্ষ উদ্দেশ্য জাতিসংঘের কাছে জেনোসাইড ’৭১-এর স্বীকৃতি আদায়। (সূত্রঃ জেনোসাইড ৭১: স্বীকৃতি, বাধা, অর্জন, হাসান মোরশেদ, সমকাল ৩০/০৪/২০২৩)
এছাড়া গত একুশে মে ২০২৩ দেশের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে প্রায় অভিন্ন শিরোনামের সংবাদ, “একাত্তরের জেনোসাইডের জাতিসংঘ স্বীকৃতি আর বেশি দূরে নয়”।
খবরে প্রকাশ “একাত্তরে বাংলাদেশের মানুষের উপর পাকিস্তানিদের বর্বরতাকে ‘জেনোসাইড’ হিসেবে জাতিসংঘের স্বীকৃতি পেতে আর বেশি অপেক্ষা করতে হবে না বলে মনে করছেন ডাচ রাজনীতিক হ্যারি ফন বোমেল।
তিনি বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো বাংলাদেশের বিরোধিতা করায় একাত্তরে জেনোসাইডের স্বীকৃতি পেতে দেরি হচ্ছে। তবে এখন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা বাংলাদেশে সংঘটিত জেনোসাইডকে স্বীকৃতি দিচ্ছে। খুব শিগগিরই জাতিসংঘ থেকেও এ স্বীকৃতি আদায় সম্ভব হবে।
রোববার জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। সোমবার সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠেয় ‘বাংলাদেশে জেনোসাইডের স্বীকৃতি অর্জনের জন্য আন্তর্জাতিক সম্মেলন’ উপলক্ষে এ সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করা হয়” (বিডিনিউজ ২৪ ডট কম ২১.০৫.২৩২৩)।
এদিন নেদারল্যান্ডসের পার্লামেন্ট সদস্য ও একাডেমিশিয়ানরা জাতীয় প্রেসক্লাব ও পরেরদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তব্য রাখেন। পরে তারা বিভিন্ন অঞ্চলে সশরীরে শহীদ পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলেন এবং জেনোসাইডের স্থান পরিদর্শন করেন।
এই সময়ে কিছু তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক ভুল আমাদের এমন গুরুত্বপূর্ন উদ্যোগকে ব্যর্থ করে দিতে পারে। তাই যেসব বিষয়ে নজর দিতে হবে সবার আগে তা বুঝে নেই।
দেশের বড় বড় পত্রিকায় ‘জেনোসাইড’ এর পরিবর্তে এখনো ‘গণহত্যা’ শব্দ ব্যবহার হতে দেখা যায়। জেনে নেয়া যাক ‘জেনোসাইড’ ও ‘গণহত্যা’র মৌলিক পার্থক্য।
প্রথমেই জেনে নেই বিশ্বে আজ তত্ত্ব হিসেবে যে ‘জেনোসাইড’ কে আমরা জানি তার জনক পোলিশ বংশোদ্ভূত ইহুদী অধ্যাপক রাফায়েল লেমকিন কোন জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে চালানো কর্মকান্ডের মধ্যে কী কী বৈশিষ্ঠ থাকলে তাকে জেনোসাইড বলা হয়, যা ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসঙ্ঘ কতৃক মানবাধিকার ঘোষনা গ্রহণের মধ্য দিয়ে গৃহিত হয়।
“জেনোসাইড বলতে একটি জাতি, নৃতাত্ত্বিক, বর্ণগত কিংবা ধর্মীয় গোষ্ঠীকে আংশিক অথবা সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করার উদ্দেশ্য নিয়ে নিম্নবর্ণিত যে কোন কর্মসাধনকে বোঝাবেঃ
ক. গোষ্ঠীর সদস্যদের হত্যা;
খ. গোষ্ঠীর সদস্যদের গুরুতর শারীরিক ও মানসিক ক্ষতিসাধন;
গ. উদ্দেশ্যমূলকভাবে গোষ্ঠীর জীবনযাত্রায় এমন কিছু আরোপ যা আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে এর কাঠামোগত ধ্বংস বয়ে আনবে;
ঘ. গোষ্ঠীর মধ্যে জন্মধারা রোধ করার লক্ষ্যে ব্যবস্থা আরোপ;
ঙ. গোষ্ঠীর শিশুদের বলপূর্বক অন্য গোষ্ঠীতে চালান দেয়া;
(সূত্র: জেনোসাইড নিছক গণহত্যা নয়, পৃ- ২৫, মফিদুল হক, বিদ্যাপ্রকাশ, তৃতীয় সংষ্করন, ২০১৭)।
আমরা দেখি ১৯৭১ সালে পাকিস্থান সামরিক সরকার বাংলাদেশের জনগণের উপর উপরিউক্ত সকল ধরনের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছে। মূলত রাফায়েল লেমকিন গ্রিক শব্দ ‘জেনোস’ (জাতি, উপজাতি) এবং ল্যাটিন শব্দ ‘সাইড’ (তথা হত্যা, যেমন হোমিসাইড, ফ্রাটিসাইড ইত্যাদি) যুক্ত করে ‘জেনোসাইড’ শব্দবন্ধটি তৈরী করেছেন। (সূত্র: জেনোসাইড নিছক গণহত্যা নয়)।
অন্যদিকে যেকোন কারণ সে রাজনৈতিক হোক কিংবা দলগত বা রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত যেকোন কারনে একাধিক ব্যক্তিকে একই সময়ে একই জায়গায় হত্যা করাকে বলা হয় ‘গণহত্যা’। গণহত্যায় পূর্বপরিকল্পিত ‘জেনোসাইডের’ মতো কোন অভিপ্রায় থাকেনা। তাই ‘জেনোসাইড’ বোঝাতে কখনোই তার স্থলে গণহত্যা শব্দবন্ধটি ব্যবহার করা উচিত নয়। এতে ‘জেনোসাইডের’ স্বীকৃতি পেতে যথাযথ ব্যবস্থা নেবার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্থ হয়।
অপরদিকে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে সংঘঠিত জেনোসাইডে এতোদিন আমরা কেবল ‘বাঙ্গালি জনগোষ্ঠী’র বিরুদ্ধে জেনোসাইড সংগঠিত হয়েছে বলে অভিযোগ করে আসছি। কিন্তু আসলে জেনোসাইড সংগঠিত হয়েছে দুটি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে। একটি ‘বাঙ্গালি জনগোষ্ঠী’ অন্যটি ‘হিন্দু জনগোষ্ঠী’ যা সন্দেহাতীত ভাবেই প্রমাণ করা যায়। বরং অনেক ক্ষেত্রে বাঙ্গালিদের মধ্যে যারা নিজেদের বাঙ্গালির আগে ‘মুসলমান’ প্রমাণ করতে পেরেছে তাদের হত্যা করেনি। ধৃত ব্যক্তিকে বরং হিন্দু কি-না পরীক্ষা করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে (পুরুষ হলে) উলংগ করে চেক করা হয়েছে এবং কলেমা জানে কীনা তারও পরীক্ষা নেয়া হয়েছে। এই পরীক্ষায় মুসলমান প্রমানিত হলে ছেড়ে দেয়া হয়েছে, কিন্তু হিন্দু প্রমাণিত হলে (বাঙ্গালি অবাঙ্গালি যে কোন) হত্যা করা হয়েছে।
জেনোসাইডের তাত্বিক বিশ্লেষণে যাবার আগে আমাদের সর্বাগ্রে স্মরণে রাখা উচিত মূলত ‘জেনোসাইডে’ মূখ্য ভুমিকা রাখে রাষ্ট্র। আমরা যদি পাকিস্থানের জন্ম থেকে দেখি তাহলে দেখব পাকিস্থান রাষ্ট্র জন্মের শুরু থেকেই তার নাগরিক কে অন্য পরিচয় মুছে ফেলে কেবল ‘খাঁটি পাকিস্থানী’ বানাতে চেয়েছে যার প্রাথমিক পরিচয় হবে ‘মুসলমান’। কাজেই শুরু থেকেই হিন্দু জনগোষ্টিকে পাকিস্থান তার ঐক্য ও ভিত্তির জন্য হুমকি বিবেচনা করে আসেছে। ১৯৪৭ সালে জন্মের পর থেকে ১৯৫০, ১৯৫২,১৯৬২, ১৯৬৫ (শত্রু সম্পত্তি আইন) সাম্প্রদায়িক আক্রমন, সব শেষে ১৯৭১ এ মুক্তিযুদ্ধের সময় চুড়ান্ত আঘাত হেনে স্তব্ধ করে দিতে চেয়েছে। তাদে বিশ্বাস ছিল বাঙ্গালী জাতিকে মুছে দিতে হলে সর্বাগ্রে সেই জাতি থেকে ধর্মীয় হিন্দু জনগোষ্টীকে নিশ্চিহ্ন করতে না পারলে বাঙ্গালিত্বকে মুছে ফেলা যাবেনা। কারণ বাঙালিত্বের বীজ নিহিত হয়েছে ‘হিন্দু কালচার’ এর মধ্যে। (চলবে)
প্রসূন তালুকদার, লেখক ও গল্পকার