পর্ব: দুই

বাংলাদেশ জেনোসাইডের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি: তত্ত্ব ও তথ্যের হোক সঠিক প্রয়োগ

প্রথম পর্ব

আমরা সৈয়দপুর গোলাহাট জেনোসাইডের কথা স্মরণ করতে পারি।

মূলত সৈয়দপুর ছিল অবাঙ্গালি অধ্যুষিত এলাকা। মাড়োয়ারী, বিহারী ও বাঙ্গালি জনগণের মধ্যে হিন্দু মুসলমান সব সম্প্রদায়ের লোকজনের বাস ছিল সেখানে। শহরের মাড়োয়ারি ব্যবসায়ী তুলসিরাম আগারওয়াল ‘তুলসিরাম বালিকা বিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭১-এর ১২ এপ্রিলে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাহিনী পরিকল্পিতভাবে রংপুর সেনানিবাসের অদূরে বিখ্যাত তুলসিরাম আগারওয়াল, যমুনাপ্রসাদ কেরিয়া, রামেশ্বরলাল আগারওয়ালকে হত্যা করে। ঊর্দূভাষী অবাঙ্গালিরা মাড়োয়ারী ও হিন্দুদের দোকান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে লুটতরাজ ও অগ্নিসংযোগ করে। এতে বাঙ্গালি ও অবাঙ্গালি হিন্দুদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

১৯৭১ সালের ১৩ জুন, সকাল ১০টা। সৈয়দপুর রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে ছিল একটি ট্রেন। কিছুদিন ধরে সৈয়দপুর শহরে, পাকিস্তানি সেনাদের পক্ষ থেকে মাইকে বলা হচ্ছিল, শহরে যেসব হিন্দু মাড়োয়ারি আটকা পড়ে আছেন, তাঁদের নিরাপদে ভারতে পৌঁছে দেওয়া হবে। এ জন্য একটা বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ট্রেনটি সৈয়দপুর রেলস্টেশন থেকে ভারতের শিলিগুড়ির উদ্দেশে ছেড়ে যাবে।

বাংলাদেশ জেনোসাইডের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি: তত্ত্ব ও তথ্যের হোক সঠিক প্রয়োগ
৪৬ বছর পর শ্যামলাল আগরওয়ালার বর্ণনা মতে, মাইকে ঘোষণা শুনে যুদ্ধে লুটতরাজের হাত থেকে তখনও যা কিছু সম্বল বেঁচে গিয়েছিল, তা-ই গোছাতে শুরু করে দেন মাড়োয়ারিরা। ১৩ জুন সকালে তাঁরা সমবেত হতে থাকেন সৈয়দপুর রেলস্টেশনে। প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ানো বিশেষ ট্রেনে, গাদাগাদি করে সবাই ট্রেনে উঠেন।

হত্যাযজ্ঞের প্রত্যক্ষদর্শী তপন কুমার দাসের বর্ণনা মতে, ঠিক সকাল ১০টার দিকে স্টেশন থেকে ছেড়ে যায় ট্রেনটি। চলছিল ধীরে ধীরে। শহর থেকে বেরিয়ে রেলওয়ে কারখানা পেরিয়েই হঠাৎ থেমে যায় ট্রেন। জায়গাটা স্টেশন থেকে দুই মাইল দূরে। নাম গোলাহাট। ট্রেন থামার কারণ অনুসন্ধানের চেষ্টা করেন তপন। বাইরে সারি সারি পাকিস্তানি হানাদার সেনা। সঙ্গে তাঁদের দোসর বিহারিরা। সেনা সদস্যদের হাতে রাইফেল। আর বিহারিদের হাতে ধারালো রামদা।

আরেক প্রত্যক্ষদর্শী গোবিন্দ চন্দ্র দাসের বর্ণনা মতে, ‘থেমে থাকা ট্রেনের কম্পার্টমেন্টে ঢুকেই পাকিস্তানি সেনারা চিৎকার করে উর্দুতে বলতে থাকেন, একজন একজন করে নেমে আসো। তোমাদের মারতে এসেছি আমরা। তবে পাকিস্তানের দামি গুলি খরচ করা হবে না। সকলকে এক কোপে বলি দেওয়া হবে।’ সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে যায় বেপরোয়া হত্যাযজ্ঞ। ধারালো রামদা দিয়ে কেটে ফেলে গলা। ওই হত্যাযজ্ঞে শিশু, বৃদ্ধ, নারীরাও রেহাই পাননি। বিভিন্ন সূত্রে বলা হয়, ওই ট্রেন হত্যাযজ্ঞে ৪৪৮ জনকে একে একে রামদা দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। (সূত্র: উইকিপিডিয়া, প্রথম আলো ১১ মার্চ ২০১৭)।

অন্যদিকে আমরা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতের অধ্যাপক মজিবর রহমান দেবদাসের কথা জ্বলন্ত প্রমাণ হিসেবে নিতে পারি।

সংবেদনশীল ও মানবতাবাদী মজিবর রহমান ১৯৭১ সালের মে মাসে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পাকিস্থানী জান্তাদের ক্যাম্প বসানোর প্রতিবাদ করে অবিলম্বে ক্যাম্প সরানোর দাবী করেন এবং একটি চিঠি লিখেন। চিঠিতে আরো উল্লেখ করেন ‘জেনোসাইডের’ কথা বিশেষ করে ‘হিন্দু জনগোষ্ঠীর’ উপর চালানো জেনোসাইড বন্ধে ব্যবস্থা নিতে বলেন। এর প্রতিবাদ স্বরুপ তিনি নিজের নাম পরিবর্তন করে রাখলেন ‘দেবদাস’ যখন জীবন বাঁচাতে অনেক হিন্দু নাম পরিবর্তন করে মুসলমান নাম ধারন করছিল।

বাংলাদেশ জেনোসাইডের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি: তত্ত্ব ও তথ্যের হোক সঠিক প্রয়োগ

তার মাসুল অধ্যাপক ‘দেবদাস’ কে চরমভাবেই দিতে হয় পুরো একাত্তর এবং তার পরবর্তী জীবনেও শারীরিক, মানসিক ও আর্থিক ভাবে। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাষ্টি মফিদুল হক তাঁকে নিয়ে বানিয়েছেন তথ্যচিত্র ‘কান পেতে রই’। বাংলাদেশ সরকার মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য একুশে পদকে ভূষিত করে ২০১৫ সালে।

কথাসাহিত্যিক মশিউল আলম ‘বিহারী বাবুলাল’ নামে একটি গল্প লিখেছেন যেখানে বিহারী ক্যাম্পে বসবাসরত বিহারী হিন্দুর টানাপোড়েন চিত্রায়িত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে।

মুক্তিযুদ্ধ গবেষক আফসান চৌধুরীর ‘হিন্দু জনগোষ্ঠীর একাত্তর’ বইটি একাত্তরে হিন্দু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে পরিচালিত জেনোসাইডের একটি প্রামান্য দলিল।

সিলেট ও মৌল্ভীবাজারের বেশিরভাগ চা বাগানে যে ব্যপক গণহত্যা ও নারী ধর্ষনের ঘটনা ঘটে তাতেও জেনোসাইডের সবগুলো বৈষিষ্ট দেখা যায়। মূলত চা বাগানের শ্রমিকদের উত্তর ভারত থেকে বৃটিশ সরকার নিয়ে এসেছিল। অবাঙ্গালী এসব শ্রমিক হিন্দু ধর্মাবলম্বী। অবাঙ্গালী হয়েও তারা ‘জেনোসাইডের’ শিকার হয়েছিল হিন্দু হবার কারনে। স্টার চা বাগান, লাক্কাতুরা ও কালাগুল চা বাগান, খাদিমনগর চা বাগান, মালনীছড়া চা বাগান, কেওয়াছড়া চা বাগান, খান চা বাগান, ভাড়াউড়া চা বাগান, দেওড়াছড়া চা বাগান, লালচান চা বাগান ও নালুয়া চা বাগান, তেলিয়াপাড়া চা বাগান ও সুরমা চা বাগান এর গল্পগুলো প্রায় সব একই রকম। এরমধ্যে কেবল একটি চা বাগানের ঘটনার বর্ননা পড়লেই ‘জেনোসাইডের’ প্রকৃতি ও মাত্রা সম্পর্কে ধারনা পাওয়া যাবে।

সিলেট শহরের তারাপুর চা বাগানে গণহত্যা চালানো হয় ১৮ এপ্রিল। চা বাগানের মালিক তখন গুপ্ত পরিবার। বংশ পরম্পরায় এই পরিবারের প্রধান হয়ে উঠেন রাজেন্দ্র গুপ্ত। ১৮ তারিখের কিছুদিন আগে পাকিস্তানিরা তারবাসভবনে এসে দেখা করে তার কাছে কোন বন্দুক আছে কি না জিজ্ঞেস করে। তিনি হ্যাঁ সূচক উত্তর দিলে তারা বন্দুকটি তাদের কাছে দিয়ে দিতে বলে। বন্দুকটি নিয়ে যাওয়ার সময় তাঁকে বলে যায় মুক্তিবাহিনীর লোক এলে তাদের খবর দিতে।

১৮ তারিখ পাকিস্তানিরা আবারও আসে। এবার সবাইকে "ডান্ডি কার্ড" দেয়ার কথা বলে। বলে যে, এই ডান্ডি কার্ড প্রদান করার পর তারা অবাধে চলাফেরা করতে পারবেন। গুপ্ত পরিবারের সকল পুরুষ, বাগানের কর্মাচারী ও শ্রমিকদেরকে জড়ো করা হয় গুপ্ত বাবুর বাড়িতে। কার্ড ইস্যু করার জন্যে তাদের কে সিলেট রেসিডেন্সীয়াল মডেল স্কুল (ক্যাডেট কলেজ) এর দিকে মালনীছড়া হয়ে রওয়ানা দেয়। যাওয়ার সময় গুপ্ত বাবু বললনে, "সব পুরুষকে ধরে নিয়ে গেলে মেয়েরা ভয় পাবে। একজন পুরুষ মানুষকে থাকার অনুমতি দিলে ভালো হয়।" তাই ছোট ছেলে পঙ্কজ কুমার গুপ্তকে বাড়িতে থাকার অনুমতি দেয়। স্কুলে যাওয়া লাগে নাই, মালনীছড়া টিলাকেই পাকিস্তানিরাবেছে নেয়তাদের নৃশংস কাজের জন্যে। মালিক ও কর্মাচারীদের এক ভাগ এবং শ্রমিকদের দুইটা ভাগ – এই তিন ভাগে আলাদা ফেলা হয় তাদের। রাজেন্দ্র গুপ্তের ভাই, দুই ছেলে ও ভাইয়ের ছেলেও ছিলেন, সাথে ছিলেন মেডিকেল অফিসার ডা ক্ষীতিশ চন্দ্র দে।

তারপর এই মালনীছড়ারটিড়ার পাশেই গুলি করা হত্যা করা হয় মালিক, কর্মচারী ও শ্রমিকদের। তাদের মাঝে সদানন্দ ও গনেশ হালদার নামক দুই শ্রমিকসৌভাগ্যক্রমে বেঁচে চলে আসে।সদানন্দেরহাটুতে গুলি লেগেছিল আর গনেশের গুলি লাগেনি। জ্ঞান ফেরার পর দুজনে ফিরে এসে সবাইকে এই গনহত্যার ঘটনা বলে।

চা বাগানে তখন কান্নার রোল চলছে। আবারও আসে পাকিস্তানিরা। পিতার লাশ দেখাতে নিয়ে যেতে চাইলো রাজেন্দ্র গুপ্তের তিন মেয়েকে। রাজি না হলে জোর করে নিয়ে যাওয়া তাদের। বিকেলের দিকে একই গাড়িতে করে তিন বোনকে বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে যায় হায়েনার দল। ক্ষত বিক্ষত দেহে তিন বোনের তখন বিধ্বস্ত অবস্থা।

ঐদিনই রাজেন্দ্র গুপ্তের মেয়েরা, ডা ক্ষীতিশ এর পরিবার সহ আরো কয়েকটা পরিবার ভারতের দিকে রওয়ানা হয়। ১লা মে'র দিকে পাকিস্তানিরাআবারো আসে বাগানে। তিন মেয়েকে না পেয়ে আক্রোশে গুলি করে বাড়ির প্রহরীকে হত্যা করে। বন্দী করে নিয়ে যায় পঙ্কজ কুমার গুপ্ত, নরেশ চক্রবর্তী, তার ছেলে নারায়ন চক্রবর্তী, কাজের লোক দুর্গেশ দাস ও মহেন্দ্র পালকে। ঘোষপাড়া গ্রামে নিয়ে এসে পরিত্যাক্ত একটি বাড়িতে ঢুকিয়ে হত্যা করা হয় তাদেরকে। ছেলেমানুষ হিসেবে পঙ্কজ কুমার গুপ্ত কে ছেড়ে দেয় তারা। পরে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয় লাশগুলা। এটাও জানা যায় যে, পঙ্কজ কুমার গুপ্ত তখন নাকি গুলি করার আগ মুহূর্তে বলেছিলেন, "হামকো মাত মার, হাম মুসলমান হোযায়ে গা ..." ; পরে তাকে আমানত আলী নাম দিয়ে দর্জিপাড়ার এক মুসলিম বাড়িতে রাখা হয়।

রাজেন্দ্র গুপ্তের বেঁচে যাওয়া সেই ছেলে পঙ্কজ কুমার ১৯৮৮ সালে তারাপুর চা বাগানের কেন্দ্রস্থলেই ঐদিনের ৩৮ জন শহীদদের স্মৃতিতে নির্মাণ করেন 'শহীদ স্মৃতিসৌধ'। বাগানে ঘুরতে গেলেই এটা আপনার চোখে পড়বে।–সূত্রঃ https://m.somewhereinblog.net/mobile/blog/Khadhamati/30065778

কাজেই আমরা বলতে পারি যে চারটি জনগোষ্ঠীর যেকোন একটি জনগোষ্ঠীকে সম্পূর্ন বা আংশিকভাবে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চালানো নির্দিষ্ট কর্মকান্ডকে ‘জেনোসাইড’ বলা হয়, সেসব কর্মকান্ড ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে দুটি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সংঘঠিত হয়েছে। একটি ‘বাঙ্গালি জনগোষ্ঠী’, অন্যটি ‘হিন্দু জনগোষ্ঠী’ যা ইতিহাসে বিরল। আমরা যেন এই যুক্তিটি সফলভাবে ব্যবহার করি জাতিসংঘের স্বীকৃতি প্রাপ্তির আন্দোলনে।


প্রসূন তালুকদার, লেখক ও গল্পকার
prasunctg@gmail.com