বাঙালির মনন, শিল্প ও সাহিত্যের ইতিহাসে সুকুমার রায় (৩০ অক্টোবর,১৮৮৭ - ১০ সেপ্টেম্বর, ১৯২৩) এক বিচিত্র দ্যুতিময় পুরুষের নাম, যিনি স্বল্পায়ু জীবনের প্রতিটি ক্ষণকে যুক্তি, বিদ্রোহ ও কাব্যিক প্রহেলিকার এক দুর্লভ রসায়নে জারিত করে গিয়েছেন। এই ঐতিহাসিক-মনস্তাত্ত্বিক গবেষণায় এটি স্পষ্ট যে, তিনি জন্মেছিলেন এমন এক সন্ধিক্ষণে, যখন ব্রাহ্ম সমাজের প্রগতিশীল যুক্তিবাদ এবং বিজ্ঞান-চেতনা এক নতুন যুগের দ্বার উন্মোচন করছিল।
রসায়ন ও পদার্থবিদ্যায় স্নাতক, মুদ্রণ প্রযুক্তিতে উচ্চশিক্ষা লাভকারী এবং রয়েল ফটোগ্রাফিক সোসাইটির দ্বিতীয় ভারতীয় ফেলো নির্বাচিত এই মনীষীর শিল্পীসত্তা ও বৈজ্ঞানিক চেতনার বিরল সংমিশ্রণই তার সৃষ্টিতে এনেছিলো এক নিগূঢ় গাম্ভীর্য।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, যিনি সুকুমারকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন, তার সম্পর্কে যথার্থই বলেছিলেন: ‘তার স্বভাবের মধ্যে বৈজ্ঞানিক সংস্কৃতির গাম্ভীর্য ছিলো, সেজন্যই তিনি তার বৈপরীত্য এমন খেলাচ্ছলে দেখাতে পেরেছিলেন।’
বিজ্ঞানীর তীক্ষ্ণ মেজাজ, শিল্পীর উদ্দাম রঙ এবং দার্শনিকের অন্তর্দৃষ্টি—এই বিরল সমন্বয়ই সুকুমারের সৃষ্টিকে এক অননুকরণীয় ঐশ্বর্য দান করেছিলো, যা ছিলো যুক্তি-পরবর্তী শৈল্পিক সংবেদনশীলতার প্রারম্ভিক ঘোষণা।
তাকে কেবল স্থূল হাস্যরসের স্রষ্টা বলা তার সূক্ষ্ম মননশীলতার প্রতি এক অলক্ষিত অবিচার মাত্র। তার সাহিত্যকে বলা যায় ‘বাস্তবতার শিল্পিত বিচ্যুতি’, যা ইউরোপীয় ‘ননসেন্স’ ধারায় দেশীয় মেজাজে এক মুক্তিদায়ী অরাজকতা প্রতিষ্ঠা করেছিল।
তার ছড়াগ্রন্থ ‘আবোল তাবোল’ -এর প্রতিটি পঙ্ক্তিই যেন সমাজের প্রতিষ্ঠিত কাঠামোকে এক নিমেষে নস্যাৎ করে দেয়। ‘হাঁসজারু’ বা ‘বকচ্ছপ’ -এর মতো উদ্ভট প্রাণীরা কেবল খেয়ালের বশবর্তী হয়ে সৃষ্টি হয়নি; বরং তারা ফ্রয়েডীয় মনস্তত্ত্বের ‘Unconscious’ (নিজ্ঞান) -এর সেই রূপ, যা সচেতন মনের চাপিয়ে দেওয়া যুক্তির বেড়াজাল ভেঙে মুক্তি পেতে চায়। সুকুমার যেন শৈল্পিক পন্থায় আমাদের দেখালেন, কীভাবে মনোজগতের অসংগতিগুলি বাস্তবেরই প্রতিচ্ছবি: ‘হাঁস ছিলো সজারু, (ব্যাকরণ মানি না) / হয়ে গেল হাঁসজারু’ (আবোল তাবোল, খণ্ড কবিতা)।
শব্দ-কারিগরি হিসেবে তার নৈপুণ্য ছন্দে এনেছিলো এক অনন্য ধ্বনি-চিত্রকল্প। এই ধ্বনি-চিত্রকল্প সৃষ্টিতে তার বৈজ্ঞানিক মনন নিপুণভাবে কাজ করেছে: ‘চলে হন হন, / ছোটে পন পন, / ঘোরে বন বন, / কাজে ঠন ঠন।’ (আবোল তাবোল, খণ্ড কবিতা)
সাহিত্য আঙিনায় সুকুমারের স্থান নির্ণয় করতে গেলে দেশি-বিদেশি সাহিত্যের সঙ্গে তার পার্থক্য ও সাদৃশ্য বিবেচনা করা জরুরি। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন এডওয়ার্ড লিয়র এবং লুইস ক্যারলের সমকক্ষ। সুকুমারের ‘হ-য-ব-র-ল’ ক্যারলের লেখা ‘এলিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড’ -এর মতো এক পরাবাস্তববাদী জগৎ সৃষ্টি করেছে। কিন্তু সুকুমারের জগতে সময়-চেতনা ও পরিচয়ের নৈরাজ্য আরও বেশি প্রকট, যা তাকে অস্তিত্ববাদী ভাবনার কাছাকাছি নিয়ে যায়। অন্যদিকে, দেশীয় সাহিত্যে তার অবদান ছিলো এক বৈপ্লবিক মোড়। রবীন্দ্রনাথের শিশুসাহিত্য যেখানে প্রকৃতির স্নিগ্ধতা, আদর্শ ও স্বপ্নচারিতা দ্বারা চিহ্নিত, সুকুমারের জগৎ সেখানে উদ্ভট বাস্তবতা ও সামাজিক অসংগতি নিয়ে হাজির। তার সাহিত্য কোনো নীতি বা আদর্শের প্রচার করেনি, বরং ‘সত্য-মিথ্যা-নীতি-অনীতি’ -এর বেড়া ভেঙে শৈল্পিক মুক্তির পথ দেখিয়েছে।
তার এই খেয়ালি মননের ফলস্বরূপ সুকুমার রায় বাংলা সাহিত্যে এক বিরল প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গিয়েছেন। তার প্রধান সাহিত্যকর্মগুলির মধ্যে সর্বাগ্রে আসে ছড়ার সেই অবিস্মরণীয় ভাণ্ডার, ‘আবোল তাবোল’, যা তার মৃত্যুর অব্যবহিত পরে ১৯২৩ সালে প্রকাশিত হয়ে বাংলা শিশুসাহিত্যকে এক নতুন দার্শনিক উচ্চতা দান করে। এর পাশাপাশি, তার অপরিসীম কল্পনা ও শব্দের জাদু দেখা যায় ‘হ-য-ব-র-ল’ উপন্যাসে, যা পরাবাস্তবতা ও অস্তিত্ববাদী কৌতুকের এক উজ্জ্বল উদাহরণ। তার রচিত কৌতুক নাটকগুলি—যেমন ‘অবাক জলপান’, ‘শব্দকল্পদ্রুম’ এবং ‘ঝালাপালা’—কেবল মঞ্চসফল নয়, এগুলি সমাজের প্রথা ও গোঁড়ামির উপর তার তীব্র ব্যঙ্গাত্মক প্রতিবাদের দলিল।
তিনি শুধু সাহিত্য রচনা করেই ক্ষান্ত হননি, বাবার প্রতিষ্ঠিত ‘সন্দেশ’ পত্রিকার সম্পাদনার গুরুভার বহন করে তাকে বাঙালি শিশু-কিশোরদের জ্ঞান, বিজ্ঞান ও বিশুদ্ধ আনন্দের এক মুক্তাঙ্গন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। ‘সন্দেশ’ -এ ‘আলো’ বা ‘বেগের কথা’ নিয়ে লেখা তার প্রবন্ধগুলো প্রমাণ করে, তিনি জটিল বিজ্ঞানকে সাহিত্যের ছোঁয়ায় কীভাবে সহজবোধ্য করে তুলতেন। তার সাহিত্য-আলোচনায় ‘ননসেন্স ক্লাব’ ও ‘মানডে ক্লাব’ প্রতিষ্ঠা এবং তার রচনায় উধো, বুধো, রামগরুড়ের ছানা-র মতো প্রতীকী চরিত্র সৃষ্টি—এ সবই সমাজের স্থিতিশীল নিয়মকে ক্ষণিকের জন্য ভেঙে দেওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
সুকুমার রায়ের সমাজ-বিদ্রুপের লক্ষ্য ছিলো সেই ঔপনিবেশিক আমলের গোঁড়ামি এবং অকর্মণ্যতা। তার তীক্ষ্ণ রেখাঙ্কনগুলি তার সাহিত্যকে সম্পূর্ণতা দিতো এবং তার ব্যঙ্গকে আরো দৃষ্টিগ্রাহ্য করত। তার ‘একুশে আইন’ ছড়ায় ব্রিটিশ আমলের প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে ব্যঙ্গ ছিল তীব্র: ‘টিকিট কেনা হয় নি যারা / একুশ টাকা দণ্ড তার দেখ্ রে বাপু ঠিক!’ (আবোল তাবোল, একুশে আইন)
এই সরল পঙ্ক্তিগুলো তৎকালীন আইনি স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে এক শান্ত কিন্তু স্পষ্ট প্রতিবাদ। আবার তাঁর নাটক ‘ঝালাপালা’-তে সমাজের পশ্চাৎপদতার ছবি: ‘ওরা কি বুঝবে বাবা? সব হাঁকডাক! — হাঁকডাকে জ্বর ক’মে যায় নাকি? এটা কি সেকালের টিকটিকি যে হুঁকো টেনেই পগার পার হয়ে যাবে? এক্কেবারে কালাজ্বর!’ (ঝালাপালা, নাটক)
কিন্তু এই খ্যাপা খেয়ালের স্রষ্টার জীবনের শেষ অধ্যায়টি ছিলো গভীর বিষাদে আবৃত। দুরারোগ্য কালাজ্বরে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ছত্রিশ বছর বয়সে তার জীবনাবসান হয়। এই ট্র্যাজেডিই তার হাসির আড়ালে এক নৈরাশ্যবাদী ছায়া ফেলেছিল। জীবনের চরম সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়েই তিনি লিখে গেছেন তার শিল্পীর ইশতেহার— ‘যাহা আজগুবি, যাহা উদ্ভট, যাহা অসম্ভব, তাহাদের লইয়াই এই পুস্তকের কারবার...’ (আবোল তাবোল, ভূমিকা)
তার শ্রেষ্ঠ কীর্তি ‘আবোল তাবোল’ প্রকাশিত হয় ১৯২৩ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর—তাঁর প্রয়াণের মাত্র নয় দিন পরে। সুকুমারের এই দার্শনিক নিরীক্ষা চূড়ান্ত রূপ পায় তাঁর বিখ্যাত পঙক্তিতে: ‘ঘনিয়ে এল ঘুমের ঘোর / গানের পালা সাঙ্গ মোর।’ (আবোল তাবোল, শেষ পঙক্তি)
এই কথাগুলো নিছক ছড়ার সমাপ্তি নয়, বরং স্বল্পায়ু শিল্পীর জীবন-বোধের মর্মান্তিক প্রতিচ্ছবি, যা এক গভীর দার্শনিক উপলব্ধি। সুকুমার রায়ের ট্র্যাজিক জীবনাবসানের পরও তার পুত্র সত্যজিৎ রায় তার শৈল্পিক ও বৈজ্ঞানিক উত্তরাধিকার বহন করেছিলেন, যা বাঙালি সংস্কৃতিতে রায় পরিবারের ‘বৈজ্ঞানিক সংস্কৃতি’র গাম্ভীর্যকে একটি পূর্ণাঙ্গ চক্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।
সুকুমার রায় তাই বাঙালির কাছে কেবল স্থূল হাস্যরসের স্রষ্টা নন। তিনি সেই মহৎ শিল্পী, যিনি তার যুক্তি-পরবর্তী শৈল্পিক সংবেদনশীলতাকে নৈরাশ্যবাদের বিরুদ্ধে এক শিল্পিত ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে গিয়েছেন। তার সাহিত্য আজকের যুগের জটিলতা বা তথাকথিত ‘ফেক নিউজ’ -এর যুগেও এক আত্মোপলব্ধির আলোকবর্তিকা, যা আমাদের শিখিয়েছে—যুক্তি ও অসংগতির মধ্যেও কীভাবে মুক্তির উল্লাস খুঁজে নিতে হয়।