মানুষের মৃত্যু হলেও আয়কর আইন অনুযায়ী করদায় থেকে রেহাই পাওয়ার সুযোগ নেই। অর্থাৎ, একজন করদাতার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই তার আয়কর ফাইল স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যায় না। বরং কর নির্ধারণের আইনি প্রক্রিয়াটি চলমান থাকে এবং মৃত ব্যক্তির আইনগত প্রতিনিধিকে সেই করদায় নিষ্পত্তির জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হয়।
কোনো করদাতার মৃত্যুর পর তার আয়কর ফাইল যথাযথভাবে বন্ধ করা এবং বকেয়া কর পরিশোধ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য একটি কাজ। তবে আমাদের দেশে অনেক আইনগত প্রতিনিধি এই প্রক্রিয়াটি সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা রাখেন না। ফলে সময়মতো রিটার্ন দাখিল না করা কিংবা প্রশাসনিক জটিলতার কারণে প্রায়ই জরিমানার মতো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
আইনগত প্রতিনিধির দায়িত্ব ও প্রক্রিয়া আয়কর আইন অনুযায়ী, কোনো করদাতা মৃত্যুবরণ করলে তার মনোনীত প্রতিনিধি বা ‘এক্সিকিউটর’কে ফাইল সংক্রান্ত কার্যক্রম শুরু করতে হয়। মৃত ব্যক্তির আয়কর ফাইল বন্ধ করার প্রাথমিক ধাপ হলো—মৃত্যুর বিষয়টি সংশ্লিষ্ট আয়কর অফিসকে অবহিত করা এবং উপকর কমিশনারের কাছ থেকে একটি নোটিশ গ্রহণ করা। এরপর আইনগত প্রতিনিধি বা নির্বাহক হিসেবে নিযুক্ত ব্যক্তি করদায় নিষ্পত্তি ও ফাইল বন্ধের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেবেন। এক্ষেত্রে প্রতিনিধিকে আয়কর অফিসে নিজের নাম নিবন্ধন করতে হয়, যাতে ফাইলটি তার অধীনে চলে আসে। এরপর মৃত ব্যক্তির শেষ আয়কর রিটার্ন জমা দিতে হয়, যার মাধ্যমে তার করদায় চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হয়।
আইন অনুযায়ী ‘আইনগত প্রতিনিধি’ বলতে মৃত ব্যক্তির নির্বাহক, প্রশাসক বা তার সম্পত্তি পরিচালনাকারী যেকোনো ব্যক্তিকে বোঝায়। মৃত ব্যক্তির করদায় নির্ধারণের ক্ষেত্রে এই বিধানটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
আয়কর আইনের সংশ্লিষ্ট ধারা বাংলাদেশের আয়কর আইনের ধারা ১৯৪ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করলে তার আয়কর পরিশোধের যাবতীয় দায়ভার আইনগত প্রতিনিধির ওপর বর্তায়। অর্থাৎ, মৃত ব্যক্তির বকেয়া কর কেবল তার প্রতিনিধির মাধ্যমেই আদায় করা হবে। তবে এক্ষেত্রে কার্যক্রম শুরুর আগে উপ-কর কমিশনার প্রতিনিধিকে একটি নোটিশ প্রদান করবেন।
মৃত ব্যক্তির আয়কর সংক্রান্ত সব কার্যক্রম তার মৃত্যুর পরেও একইভাবে অব্যাহত থাকে। ওই ব্যক্তি জীবিত থাকলে যেসব আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যেত, তার সবই আইনগত প্রতিনিধির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি যে, এই করদায় কেবল মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া সম্পত্তি থেকেই পরিশোধযোগ্য। অর্থাৎ, আইনগত প্রতিনিধিকে মৃত ব্যক্তির সম্পত্তির সীমার বাইরে ব্যক্তিগতভাবে কোনো দায় বহন করতে হবে না।
নিবন্ধন বাতিল ও রিফান্ড আয়কর আইনের ধারা ২৬২ অনুযায়ী, করদায় পরিশোধের পর মৃত ব্যক্তির আয়কর নিবন্ধন (টিআইএন) বাতিলের জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করতে হবে। এই আবেদন পাওয়ার পর আয়কর কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই করবেন। তারা নিশ্চিত হবেন যে—মৃত ব্যক্তির কোনো কর বকেয়া নেই, কোনো কর নির্ধারণ প্রক্রিয়া বা আপিল চলমান নেই এবং আবেদনে দেওয়া তথ্য সঠিক। সব তথ্য প্রমাণিত হলেই কর্তৃপক্ষ নিবন্ধনটি বাতিল করবেন।
অন্যদিকে, ধারা ২২৭ অনুযায়ী, যদি মৃত ব্যক্তির কোনো পাওনা অর্থ (রিফান্ড) থাকে, তবে তার আইনগত প্রতিনিধি, ট্রাস্টি, অভিভাবক বা রিসিভার সেই অর্থ ফেরত পাওয়ার দাবি জানাতে পারবেন।
সচেতনতা ও স্বচ্ছতা আইনগত প্রতিনিধি যদি সময়মতো ফাইল বন্ধ না করেন, তবে রিটার্ন দাখিল না করা বা করদায়ের কারণে জরিমানা ও অন্যান্য আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি থেকে যায়। তাই ভবিষ্যতে আইনি জটিলতা এড়াতে আয়কর আইনের বিধান অনুসরণ করা অপরিহার্য। মৃত ব্যক্তির কর ফাইল বন্ধ ও করদায় নিষ্পত্তি করা প্রতিনিধির একটি নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব। এর মাধ্যমেই সুদ ও জরিমানা থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। সঠিকভাবে আইনি বিধান কার্যকর হলে উত্তরাধিকারীরা যেমন স্পষ্ট দিকনির্দেশনা পাবেন, তেমনি দেশের আয়কর ব্যবস্থাও আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর হবে।
লেখক: আর্থিক খাতের বিশ্লেষক (faysal.aqc@gmail.com)