হয়তো প্রেমের গল্প নয়

আমৃত্যু নিজেকে ক্ষমা করতে পারেননি নাছিমা, স্বামীর শেষ অনুরোধ রক্ষা করতে না পারার আক্ষেপ তাকে পুড়িয়েছে সারাটি জীবন। স্বামী তাজুল ইসলাম খুব বেশি কিছু চাননি স্ত্রী নাছিমার কাছে। বেড়াতে আসা নাছিমাকে আরো এক বা দুই দিন বেশি থেকে যেতে বলেছিলেন, আশংকা থেকেই বলেছিলেন। সামনের কঠিন দিনগুলোতে আবার কবে দেখা হয় নাছিমার সাথে, সন্তানদের সাথে।

এলাকার সবাই যেমন চিনে তেমনই তাজুলকে চিনতেন নাছিমা। তাজুল ভালো ছাত্র। ক্লাস ফাইভ আর ক্লাস এইটে বৃত্তি পেয়েছে, পুরো চট্টগ্রাম বিভাগে প্রথম হয়েছে। ম্যাট্রিকে তিনটা লেটারসহ ফার্স্ট ডিভিশন। এরপর দেশের সেরা ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমেডিয়েট পাস করে ঢাকা ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে। পড়ছে দেশের মেধাবী ছাত্রদের পছন্দের বিষয় অর্থনীতিতে। ভালো খেলোয়াড়ও, স্কুল হকি টিমের ক্যাপ্টেন। মতলবের মানুষজনের খুব প্রিয় মুখ, পরিচিত মুখ।

এমন ছেলের ভবিষ্যৎ যে উজ্জ্বল তাতে সন্দেহ কি! সিএসপি অফিসার হবে, দেশের বড় আমলা। পাত্র হিসাবে ফুল মার্ক। নাছিমার বাবার পাত্রের পছন্দের তালিকায় তাজুলের নাম থাকা খুবই স্বাভাবিক। কন্যার বিয়ে ঠিক করলেন তাজুলের সাথে । শুরুতে নাছিমা বিয়েতে রাজি ছিলেন না। কেঁদে-কেটে বিয়ে ঠেকাতে চেয়েছিলেন, পারেন নি। বিয়ের কথা পাকা হয়ে গেল, বিয়ে হবে পড়াশোনা শেষে। এই গল্প ১৯৬৭ সনের।  


কিন্তু পড়াশোনা শেষ হবার আগেই নাছিমার সাথে তাজুলের বিয়ে হয়ে গেল। নাছিমার বাবা দেরি করতে চাননি, না করার সঙ্গত কারণ ছিল। কারণ যেই তাজুলকে তিনি দেখেছেন, জেনেছেন এবং ভেবেছেন সেই তাজুল বদলে যাচ্ছে। ভার্সিটির তাজুল যেন এক অন্য তাজুল হয়ে উঠছেন। রুটিন করে পড়াশোনা, ভালো রেজাল্ট আর নির্ঝঞ্জাট ক্যারিয়ার- এর সব থেকে তাজুল বের হয়ে যাচ্ছেন। মেধাবীদের চিরচেনা গলিতে তাজুল হাঁটছেন না। সময়টাও উত্তাল, টালমাটাল সত্তরের দশক। ভাষা, স্বাধিকার, মুক্তি সবকিছু এক মোহনার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তাজুল জড়িয়ে পড়েছেন রাজনীতিতে। এবং দিনে দিনে আরো গভীর হচ্ছে এই জড়িয়ে পড়া। নিজের একটি জীবনের চেয়ে শত-সহস্র জীবনের মিলিত মূল্য তাজুলের কাছে অনেক বড়। নাছিমার বাবা বিয়েটা এগিয়ে নিয়ে এলেন তাজুলকে বশ করার জন্য। সংসারের জোয়াল কাঁধে পড়লে মানুষ সোজা হয়ে যায়- এটাই মোক্ষম ওষুধ। এও এক কাহিনি।

মানুষ ভাবে এক রকম আর ঈশ্বর করেন আরেক রকম। এখানেও তাই হল।  বিয়ে তাজুলকে আটকাতে পারেনি। বিয়ের পরদিন ভোরে তাজুল চলে এলেন ঢাকায়। ছাত্র ইউনিয়নের সম্মেলনের প্রস্তুতি চলছে তখন। তাজুল ছাত্র ইউনিয়নের সাথে যুক্ত। ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিকেই তাজুল ধ্যান-জ্ঞান মেনেছেন। নাছিমার বাবা আরো কিছুদিন অপেক্ষা করলেন, বিয়ে যদি তাজুলের মতি-গতি ফেরায়। কিন্তু বিধি বাম! তাজুল আরো বশি জড়িয়ে পড়ছে সংগঠনের কাজে। যে পথে নেই অর্থ-বিত্ত-শৌর্য নেই সেই পথ থেকে ফেরানোর উদ্যোগ নিলেন। কন্যার উপরই দায়িত্ব পড়লো স্বামীকে ফেরানোর।

নাছিমাও তখন ছাত্র ইউনিয়নের সাথে যুক্ত। তাজুলকে বিয়ে না করার জন্য নাছিমা একদিন কেঁদেছিলেন। সেইদিন বদলেছে। তাজুলের সান্নিধ্যে এসে নাছিমা জেনেছেন মানুষের সততা ও নিষ্ঠার ক্ষমতা , মানুষের ব্যক্তিত্বের দৃঢ়তা এবং প্রজ্ঞার ঔজ্জ্বল্য। নাছিমা তখন  মুগ্ধ তাজুলে। তারপরও নাছিমা চেষ্টা করলেন কারণ বাবা বারবার চাপ দিচ্ছিলেন যদি ফেরানো না যায় তালাক দেয়ার জন্য। নাছিমা ব্যর্থ হলেন। ব্যর্থ হলেন তাজুলকে পার্টি আর রাজনীতি থেকে ফেরাতে।

তাজুল নিজেকে তুলনা করলেন, বিস্তৃত শাখা-প্রশাখার এক বৃক্ষের সাথে যার শিকড় রাজনীতির গভীরে প্রোথিত। শিকড় থেকে উপড়ে ফেললে শাখা-প্রশাখা শুকিয়ে যাবে, বৃক্ষের মৃত্যু হবে। প্রাণহীন বৃক্ষ নিয়ে নাছিমা কী করবেন! নাছিমার বলার কিছু থাকে না। ভালোবাসার মানুষটির পাশে দাঁড়ান নাছিমা। এরপর পার্টি নিয়ে, রাজনীতি নিয়ে কিছুই বলেন নি কখনো বরং সাধ্যমত সাথে ছিলেন। দুইজনে মিলে একই তরণী বেয়েছেন।

আঘাতটা এলো আপনজনের কাছ থেকে, হয়তো তা অনুমেয় ছিল। নাছিমার বাবা পড়াশোনার খরচ বন্ধ করে দিলেন। মেয়েকে আর নিজের মেয়ে বলে স্বীকার করতে চাইলেন না, মেয়েকে ত্যাজ্য করলেন। সে এক কঠিন সময়!


ভার্সিটির পাক চুকিয়ে তাজুল তার আরাধ্য পথেই গেলেন, বিপ্লবীর জীবন বেছে নিলেন। এমন জীবন যার কথা আমরা বলি বা ভাবি কিন্তু যাপনের সাহস করি না। সেই সাহস ও আবেগ তাজুলের ছিল। মানুষের জন্য ছিল বুকভরা ভালোবাসা। সমাজটাকে বদলানো যে খুবই জরুরি তাজুল তা বুঝেছিলেন। মেনেছিলেন সমাজতন্ত্র মানুষের মুক্তির সোপান। শ্রমিকরাই এই পরিবর্তনের মূল শক্তি। শ্রমিক হয়ে গেলেন তাজুল। ভার্সিটির জীবন থেকে একজন বদলি শ্রমিকের জীবনে, মধ্যবিত্ত থেকে মজদুরের জীবনে। আদমজী জুট মিল হলো তাজুলের নতুন ঠিকানা। একজন সাধারণ বদলি শ্রমিক আর তাজুলের জীবনের মধ্যে কোন পার্থক্য রইল না। কলোনির ঘুপচি ঘরে সংসার পাতলেন দুই জনে।

নাছিমা দাঁড়ালেন তাজুলের পাশে সাথী হয়ে, ভালোবাসা হয়ে। সংসার সামলানোর ভার নিজের কাঁধে নিলেন। নাছিমা চাকুরি পেলেন মতলবের আইসিডিডিআরবি কেন্দ্রে। নাছিমার বাবা রুষ্ট হলেন- জামাতা শ্রমিক কন্যা চাকুরে। এলাকায় কি তাঁর মান-সম্মান থাকে! তাজুলের সাথে সাথে নাছিমারও যুদ্ধের শুরু। ছিলেন স্বচ্ছল পরিবারে, স্বচ্ছন্দ জীবন যাপনে। সেখান থেকে যৎসামান্য আয়ে বেঁচে থাকার লড়াইয়ে, একজন সাধারণ শ্রমিকের স্ত্রী হয়ে, একজন রাজনৈতিক কর্মীর সহযোদ্ধা হয়ে, একজন বিপ্লবীর সাথী হয়ে। সন্তানদের জন্য দুধ কিনতে পারেননি। অনুযোগের উত্তরে তাজুল দেখিয়েছেন শ্রমিকদের সন্তানদের। বলেছেন, তোমার সন্তানেরা মাসে আট/দশ দিন মুখে দুধ তুলতে পারে, কিন্তু শ্রমিকের সন্তানেরা! এভাবেই তাজুলের লড়াইয়ের, নাছিমার লড়াইয়ের সাথী হন তাদের সন্তানেরাও।  একসময় প্রজেক্টে চাকুরি করেছেন নাছিমা, চাকুরির কারণে ট্যুরে যেতেন প্রায়ই। সেই সময় তাজুল সামলেছেন সংসার- দুই শিশু সন্তানের সাথে পার্টির কাজ। সহজ ছিল না মোটে! সব দিক সামলাতে না পেরে চাকুরি ছেড়েছেন, আর্থিক সঙ্গতির সাথে তাল মেলাতে বাসা পাল্টেছেন। তাতেও কুল না হওয়ায় শেষমেশ বাবার বাসায় উঠেছেন। ততো দিনে নাছিমার বাবা আপত্য স্নেহের কাছে পরাজিত হয়েছেন। নাতিদের সঙ্গ তার কাছে আনন্দময়।   এই বাসায় থাকতে থাকতেই নাছিমা সরকারী প্রাইমারি স্কুলে চাকুরি পান। চাকুরির কারণে নাছিমা সন্তানদের নিয়ে গ্রামে চলে গেলেন। সময়-সুযোগে ছুটি-ছাটায় সন্তানদের নিয়ে চলে আসতেন আদমজী জুট মিলের শ্রমিক কলোনির তাজুলের ঘুপচি ঘরে। নাছিমা পেতেন স্বামীকে, সন্তানেরা পেতো বাবাকে। খুব আদর করতেন সন্তানদের, হয়তো পুষিয়ে দেয়ার চেষ্টা করতেন।

দেশে তখন সামরিক শাসন। ১৯৮২ সনে সামরিক উর্দি পরে গৎবাঁধা বুলি  ‘দেশ ও জাতির ক্রান্তিলগ্নে (!)’-র দোহাই দিয়ে ক্ষমতা নেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল এরশাদ। শুরু থেকেই এরশাদ ও সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ছাত্ররা জোট বাঁধে। পরের বছরই মজিদ খানের গণবিরোধী শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন ছিল সামরিক-স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রথম বড় আঘাত। ধীরে ধীরে এই আন্দোলনে যুক্ত হতে থাকে সবাই। এরশাদ বিরোধী আন্দোলন দানা বাঁধতে থাকে, জোরালো হতে থাকে। এই আন্দোলনে যুক্ত হয় আদমজী জুট মিলের শ্রমিকেরাও। তাজুল হয়ে ওঠেন তাদের অভয়, তাদের কান্ডারি, তাদের সহযাত্রী। শ্রমিকদের জোটবদ্ধ করেন, সংগঠন গড়েন, লড়াই করেন। নাছিমা থাকেন সাহস হয়ে, প্রেরণা হয়ে।


১৯৮৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে শিক্ষকদের এক সম্মেলনে প্রতিনিধি হয়ে ঢাকা আসেন নাছিমা, সঙ্গে দুই সন্তান। এক সপ্তাহ ছিলেন সেবার। সন্তানদের দেখে খুব উচ্ছ্বসিত হয়েছিলেন তাজুল। সেই দৃশ্য মনে গেঁথে গিয়েছিল নাছিমার। সপ্তাহ খানেক পরে যখন সন্তানদের নিয়ে ফিরবেন তখন ছোট্ট একটু চাওয়া ছিল তাজুলের। নাছিমা যেন আরো দুই দিন থেকে যান সন্তানদের নিয়ে থেকে যান। বুঝতে পেরেছিলেন সামনে কঠিন দিন। ভেবেছিলেন সামনের লড়াইয়ে তার স্থান হবে কারাগারে। নাছিমাকে বলেছিলেন, এবার মনে হয় ওরা আমাকে ছাড়বে না। আবার কবে স্ত্রী-সন্তানদের দেখতে পাবেন তার নিশ্চয়তা নেই। এই অনিশ্চিত জীবনের ছোট্ট একটু চাওয়া আকুল হয়ে বেজেছিল তার সেই অনুরোধে। কিন্তু সেই অনুরোধে সাড়া দিতে পারেননি নাছিমা, তিনি তখন স্কুল শিক্ষিকার চাকুরি করেন। প্রধান শিক্ষক না থাকায় বাড়তি দায়িত্ব ছিল তার কাঁধে। কর্তব্যের ডাকে সাড়া দিয়ে তিনি চলে এলেন। এক সপ্তাহ পরে ফিরবেন সেই প্রতিশ্রুতি দিয়ে। সেইদিন তার দূরতম কল্পনাতেও আসেনি স্বামীর সাথে স্ত্রীর এবং সন্তানদের সাথে তাদের পিতার এই শেষ সাক্ষাৎ, শেষ আনন্দ, শেষ বেদনা। দিনটি ছিল ২২ ফেব্রুয়ারি, বুধবার।

পরের সপ্তাহ ছিল উত্তাল। ১ মার্চ হরতাল পালনের ডাক দিয়েছিল রাজনৈতিক দলগুলো। তার সাথে যুক্ত হয় শ্রমিক-কর্মচারীদের ডাকা ২৪ ঘন্টার ধর্মঘটের ডাক। তারই প্রস্তুতি চলে সারা দেশ জুড়ে। একতাবদ্ধ হতে থাকে শ্রমিক, জনতা, কর্মচারী, ছাত্র সবাই। ২৮ ফেব্রুয়ারি ছাত্রদের মিছিলে ট্রাক তুলে দেয় পুলিশ। রাজপথের কালো পিচের সাথে মিশে যায় সেলিম আর দেলোয়ারের রক্ত।  

দেশের বৃহত্তম পাট কল আদমজীতেও পৌঁছে যায় সেই ডাক। রাত-দিন চব্বিশ ঘন্টা বিরামহীন চলে আদমজী, সাইরেনের শব্দে শিফট ধরে হাজার হাজার শ্রমিক সচল রাখে মিলের চাকা। সেই চাকা যে কোন মূল্যে সচল রাখতে চায় এরশাদের সামরিক সরকার। দেখাতে চায়, স্বাভাবিকভাবে চলছে দেশ। আর শ্রমিকদের লক্ষ্য সেই চাকা থামিয়ে দেয়া।    

২৯ ফেব্রুয়ারি রাতে হরতালের সমর্থনে মিছিল বের করেন শ্রমিকেরা। ১ মার্চের হরতাল সফল করার অঙ্গীকার তাদের কন্ঠে, দৃঢ়তা তাদের ভঙ্গীতে। এই মিছিলে হামলা চালায় এরশাদের গুন্ডা বাহিনী, সাদু আর রবের নেতৃত্বে। তাজুলকে চিরতরে থামিয়ে দেয়া ছিল তাদের উদ্দেশ্য। তাই মারণঘাতী আঘাতের শিকার হন তাজুল। মারাত্মকভাবে আহত তাজুলকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনা হলে পরদিন ১ মার্চ সকালে তাজুল মারা যান। তাজুল আহত হওয়ার সাথে সাথেই মিলের কাজ বন্ধ হয়ে যেতে থাকে। ১ মার্চ সর্বাত্মক শ্রমিক ধর্মঘট পালিত হয়, দিন-রাত ২৪ ঘন্টা চলতে থাকা জুট মিলের সব কাজ বন্ধ হয়ে যায়।

সেই দিনই তাজুলকে দেয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ঢাকায় আসার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন নাছিমা। আদমজীর ছোট্ট বাসায় তাজুলকে গরমে কষ্ট পেতে দেখেছিলেন নাছিমা। ব্যাংকে গিয়ে অল্প অল্প করে জমানো এক হাজার টাকা তুলেছিলেন ফ্যান কিনে দেবেন বলে। পছন্দের বরই গাছ থেকে পেড়ে গুছিয়ে রেখেছিলেন। স্কুলে ক্লাস শেষে রওনা হবেন। তাজুলকেও বলে রেখেছিলেন যেন লঞ্চ ঘাটে নিতে আসেন। দুপুরের পরে বাবার মুখেই পেলেন মর্মান্তিক সংবাদ।  

এটা ১৯৮৪ সনের ফেব্রুয়ারি মাসের আদমজী পাট কলের একজন শ্রমিকের, একজন সাধারণ শ্রমিকের আনন্দ আর বেদনার গল্প। এটা নাছিমা আর তাজুলের গল্প। খুব সাধারণ তবুও অসাধারণ!