ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইতালি তার ইউরোপীয় অংশীদার, জি৭ এবং বহুপাক্ষিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে একযোগে যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠা, হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত করা এবং মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে, সংঘাত শেষ হলে প্রণালীতে নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে গঠিত আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষামূলক জোটে অংশ নেওয়ার ইচ্ছাও আমাদের দেশ প্রকাশ করেছে।
সম্প্রতি ইতালির সংসদীয় কমিটিতে দেওয়া আমার বক্তব্যে আমি যেমন উল্লেখ করেছি, আমাদের সরকারের কাছে হরমুজ অবরোধ শুধু একটি আঞ্চলিক সংকট নয়; এটি এমন এক বৈশ্বিক ধাক্কা যা জ্বালানি নিরাপত্তা, শিল্প প্রতিযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ভারসাম্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলবে। এই ঝুঁকি শুধু অঞ্চলের দেশগুলোর জন্য নয়, ইতালির মতো রপ্তানিনির্ভর দেশের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে রপ্তানি জিডিপির প্রায় ৪০ শতাংশ।
হরমুজ প্রণালী বৈশ্বিক বাণিজ্যের একটি কৌশলগত কেন্দ্র। বিশ্বের মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানির এক-চতুর্থাংশ এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য অপরিহার্য বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। বাণিজ্যিক রুটের অনিরাপত্তা এবং জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ইতোমধ্যেই ইউরোপীয় পরিবার ও ব্যবসায়িক খাতে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। বৈশ্বিক বাণিজ্যের মন্দা এবং শুল্কের প্রভাব সত্ত্বেও, ২০২৫ সালে ইতালির রপ্তানি ৩.৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা প্রমাণ করে সামুদ্রিক বাণিজ্যপথের স্থিতিশীলতা জাতীয় অর্থনীতির জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
তবে আমাদের উদ্বেগ শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ শিল্পখাত নিয়ে নয়। আফ্রিকা ও বৃহত্তর ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের দুর্বল দেশগুলোর ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। বিশ্বের মোট সার রপ্তানির প্রায় ৩০ শতাংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে যায়, যা বহু ঝুঁকিপূর্ণ অর্থনীতির খাদ্য নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুদানের উদাহরণ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, যেখানে বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকট এখনো চলছে। জ্বালানি ও সারের মূল্যবৃদ্ধি কৃষি উৎপাদন কমিয়ে দিতে পারে, মুদ্রাস্ফীতি বাড়াতে পারে এবং অস্থিতিশীলতা, দুর্ভিক্ষ ও ইউরোপমুখী অভিবাসন আরও তীব্র করতে পারে।
এই কারণেই মে মাসের শুরুতে আমরা আমার ক্রোয়েশীয় সমকক্ষের সঙ্গে যৌথভাবে একটি বৈঠকের আয়োজন করি, যিনি বর্তমানে MED9-এর সভাপতি, যেখানে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল, মধ্যপ্রাচ্য ও বলকান অঞ্চলের ৩০টি দেশ এবং FAO-কে আমন্ত্রণ জানানো হয়। সেখানে “রোম কোয়ালিশন ফর ফুড সিকিউরিটি অ্যান্ড অ্যাকসেস টু ফার্টিলাইজার্স” নামে একটি স্থায়ী ফোরাম গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়, যার উদ্দেশ্য দ্রুত ও বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজে বের করা।
আমাদের মূল্যায়ন হলো, হরমুজ সংকট আসলে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে কয়েক দশকের উত্তেজনার বহিঃপ্রকাশ। এই প্রেক্ষাপটে আমরা এখনো বিশ্বাস করি যে কূটনীতিই একমাত্র কার্যকর পথ, এবং আমরা পুনরায় জোর দিয়ে বলছি যে তেহরানের এমন পারমাণবিক অস্ত্র বা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা অর্জন করা উচিত নয় যা অঞ্চলকে আরও অস্থিতিশীল করতে পারে।
আমরা ইরানে তরুণদের আন্দোলনের ওপর দমন-পীড়নের বিষয়টিও ভুলে যেতে পারি না, যা নির্মমভাবে দমন করা হয়েছিল। আজও বিরোধীদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তার ও মৃত্যুদণ্ডের মাধ্যমে সেই দমন-পীড়ন অব্যাহত রয়েছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তেহরান উপসাগরীয় কয়েকটি দেশে নির্বিচারে আবাসিক এলাকা, হোটেল, হাসপাতাল এবং জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে। আমরা এসব হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছি এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান ও সৌদি আরবের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছি।
কূটনৈতিক পর্যায়ে আমি নিয়মিতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছি, যাঁর সঙ্গে সম্প্রতি রোমে আমার সাক্ষাৎ হয়েছে। আমরা উভয়েই ট্রান্স-আটলান্টিক সম্পর্ক অক্ষুণ্ণ রাখা এবং আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য যৌথভাবে কাজ করার প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে একমত হয়েছি। আমি পাকিস্তানে চলমান আলোচনার প্রতিও সমর্থন জানিয়েছি, কারণ আমরা মনে করি কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোলা রাখা অত্যন্ত জরুরি।
আমি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গেও সংলাপ অব্যাহত রেখেছি। সেখানে আমি তেহরানকে “সৎ উদ্দেশ্যে” আলোচনায় অংশ নিতে এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) সঙ্গে পুনরায় সহযোগিতা শুরু করার আহ্বান জানিয়েছি। একই সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্ক পুনর্গঠনের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছি।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে আমি চীন সফর করেছি, যেখানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-এর সঙ্গে বৈঠক করে বেইজিংকে তেহরানের সঙ্গে মধ্যস্থতায় আরও সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছি। একই সময়ে, রোম উপসাগরীয় আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বজায় রেখেছে, যাদের আমরা স্থায়ী কূটনৈতিক সমাধান এবং প্রণালীতে নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য অপরিহার্য অংশীদার বলে মনে করি।
অপারেশনাল পর্যায়ে, লোহিত সাগর, ভারত মহাসাগর এবং ভূমধ্যসাগরে ইউরোপীয় নৌ-মিশনে অর্জিত অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে ইতালি প্রস্তুত। বিশেষভাবে আমরা মনে করি ইউরোপীয় মিশন ASPIDES-কে আরও শক্তিশালী করা জরুরি, যেখানে বর্তমানে কেবল ইতালি ও গ্রিস লোহিত সাগরে টহল কার্যক্রমে যুক্ত রয়েছে, যাতে সামুদ্রিক পরিবহন নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।
হরমুজ প্রণালীতে যে বহুজাতিক মিশন গঠিত হবে, সেখানে ইতালি মাইন অপসারণ কার্যক্রম এবং বাণিজ্যিক নৌ-চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অবদান রাখতে পারে।
তবুও আমরা বিশ্বাস করি, লেবাননে স্থিতিশীলতা ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
ইতালীয় সরকার যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল ও বৈরুতের মধ্যকার সংলাপকে সমর্থন করে এবং উভয় পক্ষের সরাসরি আলোচনার আয়োজন করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। গত এপ্রিল মাসে লেবানন সফরের সময় আমি প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউনের কাছে ইতালির সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছি, যাতে বর্তমান যুদ্ধবিরতিকে একটি প্রকৃত শান্তি প্রক্রিয়ায় রূপান্তর করা যায়।
ওয়াশিংটন ও ব্রাসেলস ক্রমশ রোমকে বৈরুতের রাষ্ট্র কাঠামো শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখছে। এই বিষয়টি আমি সম্প্রতি ফারনেসিনায় লেবাননের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকেও আলোচনা করেছি।
আমরা UNIFIL মিশন, দ্বিপাক্ষিক MIBIL মিশন এবং ইতালির নেতৃত্বাধীন মিলিটারি টেকনিক্যাল কমিটি ফর লেবাননে কর্মরত আমাদের সামরিক সদস্যদের নিরাপত্তার বিষয়েও সম্পূর্ণ সজাগ রয়েছি। একই সঙ্গে, দক্ষিণ লেবাননের খ্রিস্টান অধ্যুষিত গ্রামগুলোসহ বিভিন্ন গ্রামে উগ্রপন্থী ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার পরিপ্রেক্ষিতে দেশটির খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের সুরক্ষার দাবি জানিয়ে যাব।
উগ্রপন্থী ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার বিষয়টি ব্রাসেলসেও আলোচিত হয়েছে, যেখানে ইউরোপীয় মন্ত্রীরা তাদের বিরুদ্ধে নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ নিষেধাজ্ঞা অনুমোদন করেছেন। একই অধিবেশনে হামাস সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধেও অতিরিক্ত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে, যাদের নিরস্ত্রীকরণ এখনো সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ইতালি গাজা ও ফিলিস্তিনি অঞ্চলগুলোর পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং মানবিক সহায়তা ও ভবিষ্যৎ পুনর্গঠন কার্যক্রমে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে, যার লক্ষ্য হলো এমন দুটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা যারা শান্তি ও নিরাপত্তার সঙ্গে পাশাপাশি বসবাস করতে পারবে।
এই প্রেক্ষাপটেই সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইতালিতে ৭২ জন ফিলিস্তিনি শিক্ষার্থীর আগমন ঘটেছে, যারা ইতালীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বৃত্তি পেয়েছে। আমরা এটিকে ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিনি নেতৃত্ব গঠনের অংশ হিসেবে বিবেচনা করি।
লেখক: আন্তোনিও তাজানি ইতালির উপ-প্রধানমন্ত্রী এবং দেশটির বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ।