প্রতিবন্ধিতা খাতে চাই মানসম্মত সেবা, জবাবদিহি ও পেশাগত দক্ষতা

বাংলাদেশে গত এক দশকে প্রতিবন্ধিতা ও অটিজম বিষয়ে সামাজিক সচেতনতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। একসময় যে বিষয়গুলো লোকলজ্জা, ভয় কিংবা সামাজিক সংকোচের কারণে পরিবারগুলো আড়ালে রাখত, এখন তা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও আইন, নীতি, ভাতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার গুরুত্ব বাড়ছে। বর্তমান সরকার প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের অধিকার রক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে যে ধরনের ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।

তবে এই ইতিবাচক রূপান্তরের সমান্তরালে একটি উদ্বেগজনক বাস্তবতারও সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিবন্ধিতা ও অটিজম খাতটি এখন অনেকের কাছে ‘সেবামূলক’ ক্ষেত্রের চেয়ে ‘ব্যবসায়িক সুযোগ’ হিসেবে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। ফলে রাতারাতি দেশে অসংখ্য তথাকথিত ‘অটিজম বিশেষজ্ঞ’, ‘থেরাপিস্ট’ কিংবা ‘বিশেষ শিক্ষা বিশেষজ্ঞ’ গজিয়ে উঠছেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পর্যাপ্ত মান নিয়ন্ত্রণ ও মনিটরিং ছাড়াই ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠছে ‘স্পেশাল স্কুল’, ‘থেরাপি সেন্টার’ ও ‘অটিজম কেয়ার সেন্টার’। সবচেয়ে শঙ্কার বিষয় হলো, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের অসহায় অভিভাবকদের আবেগ ও অজ্ঞতাকে পুঁজি করে এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন।

একটি বিষয় আমাদের মনে রাখতে হবে—অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিশু কিংবা প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জীবন কোনো সাময়িক চিকিৎসা বা নিছক থেরাপির বিষয় নয়। এটি শিক্ষা, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি, মানবাধিকার এবং দীর্ঘমেয়াদি পারিবারিক সহায়তার সঙ্গে যুক্ত। এই সংবেদনশীল খাতে কাজ করার জন্য বিশেষায়িত জ্ঞান, পেশাগত নৈতিকতা এবং গভীর মানবিকতা থাকা আবশ্যক। অথচ দুঃখজনকভাবে, মাত্র কয়েক দিনের প্রশিক্ষণ, একটি নামমাত্র সার্টিফিকেট বা বিদেশ সফরের অভিজ্ঞতা নিয়েই কেউ কেউ নিজেদের ‘জাতীয় বিশেষজ্ঞ’ দাবি করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চটকদার ও বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালিয়ে অভিভাবকদের বলা হচ্ছে—‘ছয় মাসে কথা বলবে’ কিংবা ‘বিশেষ থেরাপিতে অটিজম দূর হবে’। বিশেষ শিক্ষা, স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি বা ক্লিনিক্যাল সাইকোলজির মতো বিষয়ে কোনো স্বীকৃত ডিগ্রি না থাকা সত্ত্বেও এই ধরনের অলৌকিক উন্নতির প্রতিশ্রুতি দেওয়া স্রেফ অনৈতিক ও এক ধরনের প্রতারণা।

বর্তমানে দেশে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা বহু বিশেষায়িত বিদ্যালয়ের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক নিবন্ধন বা মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নেই। একটি ছোট বাসা ভাড়া নিয়ে কয়েকটি চেয়ার-টেবিল বসিয়েই খুলে ফেলা হচ্ছে ‘অটিজম সেন্টার’। সেখানে সদ্য বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজ পার হওয়া কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণহীন বেকার তরুণ-তরুণীকে ‘থেরাপিস্ট’ সাজিয়ে অভিভাবকদের সামনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এই পরিস্থিতি শিশুদের উন্নয়নের চেয়ে ভুল থেরাপি বা অনুপযুক্ত আচরণ ব্যবস্থাপনার কারণে তাদের ভবিষ্যৎকে আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।

বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশে এখনো স্পিচ, অকুপেশনাল কিংবা বিহেভিয়ার থেরাপিস্ট এবং বিশেষ শিক্ষকের তীব্র সংকট রয়েছে। এই বিপুল চাহিদাকে পুঁজি করে অনেক প্রতিষ্ঠান একজন মাত্র দক্ষ পেশাজীবীর নাম ব্যবহার করে একাধিক শাখা চালাচ্ছে, অথবা একজন বিশেষজ্ঞের অধীনে কয়েকজন অদক্ষ কর্মীকে ‘সহকারী থেরাপিস্ট’ বানিয়ে কাজ করাচ্ছে। সরকার যদি সত্যিই এই খাতের উন্নয়ন চায়, তবে শুধু ঢালাও কেন্দ্রের অনুমোদন দিলেই হবে না; বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বিশেষ শিক্ষা ও পুনর্বাসন বিষয়ের মানসম্মত কোর্স বৃদ্ধি এবং লাইসেন্সিংয়ের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি দক্ষ জনবল তৈরিতে নজর দিতে হবে।

একই সঙ্গে এই খাতে রাজনৈতিক প্রভাব ও অনিয়ম বন্ধ করা জরুরি। অতীতে দেখা গেছে, রাজনৈতিক পরিচয় বা ব্যক্তিগত সম্পর্ক খাটিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক অনুমোদন ও আর্থিক সুবিধা নেওয়া হয়েছে। মাঠপর্যায়ের অসাধু ব্যক্তি থেকে শুরু করে উচ্চপর্যায়ের প্রভাবশালী মহলের সংশ্লিষ্টতার কারণে প্রকৃত সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো উপেক্ষিত হয়েছে। এই মানবিক খাতে যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ হওয়া উচিত; এখানে সিদ্ধান্ত হতে হবে কেবলই শিশু ও তার পরিবারের প্রয়োজনের ভিত্তিতে।

এখন সময় এসেছে একটি কার্যকর মনিটরিং ও মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জোরদার করার। সমাজসেবা অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগে নিয়মিত পরিদর্শন ও মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে। থেরাপিস্টদের জন্য বাধ্যতামূলক রেজিস্ট্রেশন, প্রতিষ্ঠানের জন্য নির্দিষ্ট নীতিমালা, থেরাপি ও শিক্ষার ফির স্বচ্ছতা, অভিভাবক অভিযোগ সেল গঠন এবং ভুয়া সার্টিফিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি।

পাশাপাশি অভিভাবকদেরও সচেতন হতে হবে। অটিজম কোনো জাদুমন্ত্রে দূর হয় না; এটি সঠিক শিক্ষা, থেরাপি ও পারিবারিক সহায়তায় ক্রমান্বয়ে উন্নত হয়। কোনো সেন্টারে সন্তানকে ভর্তির আগে তার নিবন্ধন ও শিক্ষকদের যোগ্যতা যাচাই করা উচিত। এমনকি চিকিৎসকদের একটি অংশের মধ্যেও অটিজম বিষয়ে আধুনিক ও ব্যবহারিক জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা দূর করা প্রয়োজন, কারণ কেবল একটি মেডিকেল ডিগ্রি থাকলেই কেউ অটিজম বিশেষজ্ঞ হতে পারেন না।

নীতি নির্ধারণে মাঠপর্যায়ের প্রকৃত পেশাজীবী, মনোবিজ্ঞানী ও বিশেষ শিক্ষকদের বাস্তব অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। বড় বড় সেমিনার বা ‘শো-পিস’ কার্যক্রমের চেয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন মা যেন তাঁর সন্তানের জন্য সঠিক সেবা পান, সেটিই লক্ষ্য হওয়া উচিত। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুরা করুণা নয়, অধিকার চায়; তারা ব্যবসা বা প্রচারণার উপাদান নয়, মানসম্মত সেবা ও বাস্তব সহায়তা চায়। রাষ্ট্র, সমাজ, পেশাজীবী ও পরিবার সম্মিলিতভাবে দায়িত্ব পালন করলেই কেবল একটি বৈষম্যহীন, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।

লেখক: নির্বাহী পরিচালক, মুনফ্লাওয়ার অটিজম ফাউন্ডেশন