দেশের চিকিৎসক সমাজ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। চিকিৎসকদের উপর ক্রমাগত হামলা এই নিরাপত্তাহীনতার মূল কারণ যা কোনভাবেই বন্ধ হচ্ছে না। যে কোন সময়, যে কোন অজুহাতে হামলা হতে পারে, এমন আতঙ্ক ও আশঙ্কা নিয়েই চিকিৎসকগণ কর্মস্থলে যাচ্ছেন, সেবা প্রদান করছেন। এই হামলার ব্যাপ্তি প্রত্যন্ত অঞ্চলের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে শুরু করে রাজধানীর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও বিশেষায়িত ইনস্টিটিউট পর্যন্ত বিস্তৃত। এই হার দেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র ও মফস্বলের হাসপাতালগুলোতেই সবচেয়ে বেশি। বেসরকারি স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোও এই হামলার বাইরে নয়।
সর্বশেষ যে ঘটনাটি ডাক্তারদের ভীষণভাবে ক্ষুব্ধ ও মর্মাহত করেছে তা শরীয়তপুর সদর হাসপাতালের। চিকিৎসাকালীন সময়ে হার্ট অ্যাটাকে একজন রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. নাসির ইসলাম রোগীর স্বজনদের দ্বারা নির্মমভাবে প্রহৃত হন। চিকিৎসায় অবহেলার কথিত অভিযোগে প্রায় ৭০-৮০ জন ব্যক্তি ডা. নাসিরের উপর চড়াও হন। ঘটনাটি মে মাসের মাঝামাঝি সময়ের, এর পরেও চিকিৎসক নিগ্রহের ঘটনা থেমে নেই। অনিয়মিত বিরতিতে ঘটেই চলেছে। সবশেষ সিলেটের ওসমানী মেডিকেলের ঘটনাও জাতীয় পর্যায়ে শিরোনাম হয়েছে।
শারীরিক আক্রমণ ও প্রাণঘাতী হামলার শিকার হওয়া চিকিৎসকদের প্রায় সকলেই কর্তব্যরত অবস্থায় হামলার শিকার হয়েছেন এবং বেশির ভাগ ঘটনাই ঘটেছে সরকারি স্বাস্থ্য কেন্দ্রে। দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক সেবাসমূহের মধ্যে অন্যতম স্বাস্থ্যসেবা । সরকারি স্থাপনায় রাষ্ট্রীয় কাজে নিয়োজিত সরকারি কর্মচারীর উপর হামলা নিঃসন্দেহে গুরুতর অপরাধ এবং তা সরকারি কর্মকান্ডে বাঁধা প্রদানেরই নামান্তর। এই ধরণের অপরাধের ক্রমাগত সংঘটন রাষ্ট্রের জন্য মোটেই ভালো লক্ষণ নয়। ঘটনার পর মামলা, গ্রেপ্তার, তদন্ত ইত্যাদি যে প্রতিকারের স্থায়ী সমাধান নয় অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে তা ইতোমধ্যে প্রমাণিত। প্রতিবারই ঘটনার পর স্বাস্থ্যকর্মীদের উত্তেজনা ও ক্ষোভ তাৎক্ষণিকভাবে প্রশমনের এই ধরণের প্রশাসনিক ‘টোটকা’ ব্যবস্থা নেয়া হয়। তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হয়। আপস ও সমঝোতার উদ্যোগ নেয়া হয়, বিশেষত ডাক্তাররা যেন কর্মবিরতিতে না যান সেই বিষয়ে জোর দেয়া হয়। বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করে। সমাজে সেই বিচারের রায়ের প্রভাব পড়ে না। ফলে ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়। অপরাধের পুনঃসংঘটনে দেশে আইনের শাসন প্রশ্নবিদ্ধ হয়। প্রশাসনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও তার প্রভাব পড়ার আশংকা তৈরি হয় এবং তা পড়ে।
যে কোন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা মূলত সেবাদাতা ও সেবাগ্রহীতা উভয়ের পারস্পরিক আস্থার উপর নির্ভরশীল। ক্রমাগত হামলার ফলে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় এই পারস্পরিক আস্থা ও সহমর্মিতার সম্পর্কটি ভেঙে পড়ছে, যার ফলে উভয় পক্ষই ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন। প্রতিনিয়ত আহত হওয়ার ও প্রাণনাশের শঙ্কা নিয়ে কীভাবে একজন ডাক্তার সর্বোচ্চ সেবা উজাড় করে দেবেন! আর অসুস্থ ব্যক্তিই বা কীভাবে আশ্বস্ত বোধ করবেন! ফলে সেবা প্রদানের পরিমাণ ও গুণগত মান দুই-ই হ্রাস পাওয়ার চরম ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয় প্রান্তিক ও দরিদ্র জনগোষ্ঠী যাদের স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের বিকল্প কোন আশ্রয় নেই। এই ধরণের ঘটনায় দেশের মফস্বল ও গ্রামাঞ্চলে চাকুরিরত চিকিৎসকগণ এক ধরণের স্ব-আরোপিত সতর্কতার বন্ধনে বন্দি হন। চিকিৎসা সেবার মানের অবনমন হয়। হামলার ভীতি ও শঙ্কার কারণে ইচ্ছা বা অনিচ্চছায় মুমূর্ষু ও সংকটাপন্ন রোগিদের সামান্য জটিলতাতেই উচ্চতর স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে রেফার করে দেয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। এতে প্রারম্ভিক ও প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রে সেবা প্রদানের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ঝুঁকির মুখে পড়ে। এবং তাই হচ্ছে।
যে সকল ঘটনা গুরুতর শারীরিক আক্রমণ পর্যন্ত যায় তাই কেবল পত্র-পত্রিকার পাতায় বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসে। এর বাইরে গালি-গালাজ, মৌখিক হুমকি, দুর্ব্যবহারের অসংখ্য ঘটনা আমরা জানতেই পারি না। শারীরিক আক্রমণের বিষয়টি আমরা বিবেচনায় নিলেও চিকিৎসকদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বরাবরই উপেক্ষিত থাকছে। এই নিরাপত্তাহীনতা আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি ও হতাশার জন্ম দেয়। তীব্র উদ্বেগ-উৎকন্ঠা, নিদ্রাহীনতা ও পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত করে।
অবশ্যই স্বজনের অসুস্থতা ও মৃত্যু গভীর আবেগ ও মনোকষ্টের বিষয়। কিন্তু এই কারণে এই ধরণের ঘটনাকে ডাক্তার ও রোগীর স্বজনদের মধ্যে সংঘটিত সাময়িক উত্তেজনার প্রেক্ষিতে বিবেচনা করা মারাত্মক ভ্রান্তি। হামলার দ্রুত বিচার অবশ্যই যৌক্তিক দাবি ও প্রত্যাশা। কিন্তু শুধুমাত্র হামলার বিচারের মধ্যে সীমিত থাকলে তা কখনোই সুফল বয়ে আনবে না; চিকিৎসক ও সেবাগ্রহীতা উভয়ের স্বার্থ বিবেচনায় তা সত্য। আমাদের সংকটকে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ও চিকিৎসা শিক্ষার সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করতে হবে।
অবকাঠামোগত দিক থেকে আমরা ভাল অবস্থানে থাকলেও যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য আবশ্যক অন্যান্য উপাদানের উল্লেখযোগ্য ঘাটতি বিদ্যমান। স্বাস্থ্যখাতে রাষ্ট্রের বরাদ্দ দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশকৃত হারের চেয়ে অনেক কম। এর প্রভাব পড়ে জনবল থেকে শুরু করে স্বাস্থ্যসেবার প্রতিটি ক্ষেত্রে। কেবলমাত্র স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন ডাক্তারদের সাড়ে নয় হাজার পদ শূন্য। এমনিতেই জনসংখ্যা অনুপাতে দেশে ডাক্তারদের সংখ্যা কম। একই অবস্থা নার্স এবং টেকনিশিয়ান ও অন্যান্য পদের ক্ষেত্রে। এর সাথে যোগ হয়েছে ভৌগলিক বৈষম্য- শহরাঞ্চলে প্রতি ১৫০০ জনের জন্য একজন চিকিৎসক থাকলেও গ্রামাঞ্চলে তা প্রতি ১৫ হাজারে একজন। এ অসামঞ্জস্যের কারণে গ্রামের জনগণ কাঙ্খিত সেবা থেকে বঞ্চিত হন এবং স্বাস্থ্যকর্মীরা সীমাহীন চাপের মুখে থাকেন। একই সাথে যুক্ত হয় রোগ নির্ণয়ের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও পরীক্ষার অভাব, ঔষধের অভাব ইত্যাদি। মুমূর্ষু রোগীর স্বজনদের এই বিষয়গুলো সহজেই ক্ষুদ্ধ করে তোলে।
রোগী দেখলাম, ঔষধ লিখলাম- শুধু এইটুকুই চিকিৎসা নয়। চিকিৎসা পেশা একটি মহৎ, মানবিক ও সেবাকেন্দ্রিক পেশা। এখানে পেশাগত দক্ষতার পাশাপাশি আবশ্যক মানবিক মূল্যবোধ, সহমর্মিতা, রোগীর স্বজনদের সাথে মতবিনিময় ও কার্যকর যোগাযোগের দক্ষতা এবং দুঃসংবাদ জানানোর সহনাভূতিসম্পন্ন কৌশল। আমাদের মেডিকেল শিক্ষাক্রমে এই সকল বিষয় যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে পড়ানো হয় না, যাও পড়ানো হয় তার প্রায়োগিক দিকটি সেইভাবে চর্চা করা হয় না। একই সাথে জনতুষ্টিবাদী রাজনীতি ও ক্ষমতা কেন্দ্রিক আচার-আচরণ ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীদের বলির পাঁঠা বানায়।
হামলার কারণ হিসাবে যে কারণগুলো উল্লেখ করা হয় তার অন্যতম ‘চিকিৎসায় অবহেলা’ বা ‘ভুল চিকিৎসা’ এবং বিলম্বিত চিকিৎসা প্রদান। কোন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ও তদন্ত ছাড়াই এই অভিযোগ করা হয়। ডাক্তাররা সব সময়ই রোগীদের সর্বোচ্চ সেবা দেয়ার চেষ্টা করেন। ব্যতিক্রম থাকতে পারে তবে তা কখনোই উদাহরণ নয়। চিকিৎসায় অবহেলা কোন ফৌজদারি অপরাধ নয়,অভিযোগ জানানোর জন্য বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (BMDC) এর মতো আইনগত প্রতিষ্ঠান রয়েছে, কিন্তু সাধারণ মানুষ তা জানে না। জনগনকে এই বিষয়ে সচেতন করার রাষ্ট্রীয় কোনো উদ্যোগও নেই।
পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার বিশাল কর্মযজ্ঞে ডাক্তার একটি অংশমাত্র। যে কোন অঘটন , দুর্ঘটনা ও অব্যবস্থাপনায় সকল দায়-দায়িত্ব ডাক্তারের কাঁধে চাপিয়ে দেয়া এক ধরণের নিয়মে পরিণত হয়েছে। এই আত্মঘাতী প্রবণতা বন্ধ না হলে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের রাষ্ট্রীয় লক্ষ্য ব্যাহত হওয়ার সাথে সাথে পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থাই পঙ্গু বা ভঙ্গুর হয়ে পড়বে।
লেখক: জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সাবেক অধ্যাপক, থরোসিক সার্জন এবং লেখক।