বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেটের সিংহভাগ পরিচালনা করা প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ ‘পিএইচপি’ (PHP)-তে ভয়াবহ ও সংকটজনক নিরাপত্তা ত্রুটি দেখা দেওয়ায় বিশ্বজুড়ে শোরগোল পড়ে গেছে। ওয়েবসাইটের নিরাপত্তা নিশ্চিতে বুধবার ও বৃহস্পতিবার টোকিও থেকে হেলসিংকি পর্যন্ত বিভিন্ন দেশের সরকার এবং বড় বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান তাদের গুরুত্বপূর্ণ ওয়েবসাইট ও অনলাইন সেবা বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। একই সঙ্গে একাধিক ক্লাউড নিরাপত্তা সংস্থা জানিয়েছে, ত্রুটিটি প্রকাশ পাওয়ার পর থেকেই বিশ্বজুড়ে হ্যাকিংয়ের চেষ্টার সংখ্যা কয়েক মিলিয়নে পৌঁছে গেছে।
এইচটিএমএল বা পাইথনের মতো পিএইচপি হলো ওয়েব প্ল্যাটফর্মের অন্যতম মূল ভিত্তি। এটি ব্যবহার করেই তৈরি হয় একটি ওয়েবসাইটেন ভুল ভিত্তি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে দীর্ঘ বছর ধরে পিএইচপির কোডে লুকিয়ে থাকা এই বিশাল নিরাপত্তা ত্রুটিটি সম্প্রতি শনাক্ত করা হয়।
বুধবার পিএইচপি ডেভেলপাররা এর জরুরি সংশোধন বা ‘প্যাচ’ প্রকাশ করে ব্যবহারকারীদের অবিলম্বে সিস্টেম আপডেট করার অনুরোধ জানান। বেলজিয়ান সাইবার সিকিউরিটি ফার্ম ‘আইকিডো সিকিউরিটি’-র সহ-প্রতিষ্ঠাতা ম্যাডেলিন লরেন্স জানান, নিরাপত্তা প্যাচ পুরোপুরি প্রস্তুত হওয়ার আগেই এই ত্রুটির বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ্যে চলে আসে। যার ফলে এখন সাইবার অপরাধীরা এআই ব্যবহার করে সিস্টেমে আক্রমণ চালাচ্ছে, আর কোম্পানিগুলো তার আগে আপডেট দেওয়ার জন্য সময়ের সঙ্গে রেস লড়ছে।
অনলাইন নিরাপত্তা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ‘ক্লাউডফ্লেয়ার’-এর সিইও ম্যাথিউ প্রিন্স সামাজিক মাধ্যম এক্সে জানান, ত্রুটির ঘোষণা দেওয়ার আগের ১০ ঘণ্টায় যেখানে কয়েক হাজার হ্যাকিংয়ের চেষ্টা হয়েছিল, ঘোষণা দেওয়ার দুই ঘণ্টার মধ্যে তা লাখে এবং পরবর্তীতে কয়েক মিলিয়নে পৌঁছে যায়। আমাজনও তাদের সিস্টেমে ব্যাপক হ্যাকিং চেষ্টার কথা স্বীকার করেছে।
এই ঘটনার প্রভাব পড়েছে বিশ্বজুড়ে। জাপানের প্রখ্যাত ব্রোকারেজ হাউস নোমুরা, শীর্ষ ব্যাংক মিটসুবিশি ইউএফজে, এয়ারলাইন কোম্পানি এএনএ, ইস্ট জাপান রেলওয়ে, পানীয় প্রস্তুতকারক আসাহি গ্রুপ এবং টোকিও মেরিন ইন্স্যুরেন্সের মতো জায়ান্ট প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের অনলাইন সেবা বা ওয়েবসাইট সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়। এমনকি জাপানের অর্থ মন্ত্রণালয়, আবহাওয়া অধিদপ্তর ও রাজস্ব বোর্ডও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অনলাইন সেবা আংশিক বন্ধ রাখে। ফ্রান্সে টেলিকম জায়ান্ট ‘অরেঞ্জ’ এবং ফিনল্যান্ডের সরকারি প্রযুক্তি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ‘ভালতোরি’ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে পিএইচপিভিত্তিক সরকারি সেবা বন্ধ করে দিয়ে রাতভর আপডেট চালুর কাজ অব্যাহত রাখে।
দক্ষিণ কোরিয়া ইতোমধ্যে তাদের বেসরকারি খাতের সাইবার নিরাপত্তার সতর্কতা বাড়িয়ে জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে এবং চীনও তাদের সব সংস্থাকে দ্রুত পিএইচপি আপডেট করার নির্দেশ দিয়েছে। জার্মানির ডিজিটাল ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের নিরাপত্তা প্রধান ফেলিক্স কুলেনকাম্প সতর্ক করে জানান, বড় বড় প্রতিষ্ঠান দ্রুত আপডেট করতে পারলেও ছোট ব্যবসা বা পুরনো পিএইচপি সংস্করণে চলা জটিল সিস্টেমগুলোর স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনাটি আবারও প্রমাণ করল কীভাবে বিশ্ব অর্থনীতি ও সরকারগুলো এমন কিছু শতাব্দীর পুরনো কোডের ওপর নির্ভরশীল, যা বজায় রাখা দিন দিন জটিল হয়ে উঠছে। জার্মানির এক অনুষ্ঠানে মাইক্রোসফটের সিইও সাত্য নাদেলা বলেন, আমি অনেক দীর্ঘ সময়ে এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখিনি। প্রযুক্তি ও আইটি নিরাপত্তা কর্মীদের জন্য এটি নিশ্চিতভাবেই একটি দীর্ঘ ও কঠিন রাত ছিল।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স