- হঠাৎ বিদ্যুৎহীন হওয়াকে বলা হয় ব্লাক স্কাই ইভেন্ট
- টানা তিন বিদ্যুৎ না থাকলে নেমে আসে মহাবিপর্যয়
- ৯ বেলা খাবার না পেলে ভেঙ্গে পড়ে সামাজিক শৃঙ্খল
- সুপেয় পানির অভাব ও ড্রেনেজ ঝুঁকিতে পড়বে ঘর
- বন্ধ হয়ে যাবে মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট সেবা
- যোগাযোগহীনতায় সমাজে ছড়াবে ভিত্তিহীন গুজব
২০১৫ সালের ডিসেম্বরের এক শনিবারের রাত। ল্যাঙ্কাস্টার ইউনিভার্সিটির সুরক্ষা ও বৈদ্যুতিক প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক রজার কেম্প নিজের বাড়িতে একটি স্ক্যান্ডিনেভিয়ান ক্রাইম ড্রামা দেখছিলেন। হঠাৎ করেই চারদিক ঘোর অন্ধকারে ডুবে গেল। শুধু তার ঘরের আলোই নেভেনি, জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে তিনি দেখলেন রাস্তার ল্যাম্পপোস্ট তো বটেই, এমনকি নদী পারের মোরক্যাম শহর থেকে আসা আকাশের স্বাভাবিক সোডিয়াম আলোর ঝলকানিটাও উধাও।
পরদিন সকালে রাস্তায় বের হয়ে তার মনে হলো তিনি যেন কোনো থ্রিলার বা 'জোম্বি' সিনেমার দৃশ্যপট দেখছেন। মোবাইল নেটওয়ার্ক পুরোপুরি গায়েব, দিশেহারা মানুষ শুধু একটু সিগন্যালের আশায় ফোনে চোখ রেখে হাঁটছে, আর শহরের একমাত্র চালু থাকা পে-ফোনের (পাবলিক টেলিফোন বুথ) সামনে দীর্ঘ লাইন।
ল্যাঙ্কাস্টার শহরের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া লুন নদী প্লাবিত হওয়ার পর মুহূর্তেই বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল শহরের প্রায় ৬১,৫০০ মানুষ। আর তার পরদিনই প্রকট হয়ে ওঠে আমাদের তথাকথিত ডিজিটাল ও অত্যাধুনিক সভ্যতার চরম ভঙ্গুর রূপ।
এক নিমিষেই থেমে যাওয়া এক শহর: বিদ্যুৎ যাওয়ার সাথে সাথেই বন্ধ হয়ে যায় মানুষের ঘরবাড়ির হিটিং ও আলো। বৈদ্যুতিক পাম্প বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পানির সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়। একে একে বন্ধ হয়ে যায় ট্রেন স্টেশন, পেট্রোল পাম্প, দোকানপাট এবং এটিএম বুথ। এমনকি ট্রাফিক লাইটগুলোও বন্ধ হয়ে যায়।
সেই চরম বিপদের মুহূর্তে পুরো শহরের জন্য যোগাযোগের মাত্র দুটি মাধ্যম টিকে ছিল, একটি তামার তারের অ্যানালগ ল্যান্ডলাইন ফোন, আর অন্যটি এফএম রেডিও। স্থানীয় বাণিজ্যিক রেডিও স্টেশনের একটি নিজস্ব এমার্জেন্সি জেনারেটর এবং একটি ল্যান্ডলাইন চালু ছিল। শহরবাসীকে মূলধারার সংবাদের সাথে যুক্ত রাখতে সেটিই হয়ে উঠেছিল একমাত্র ভরসা।
অধ্যাপক কেম্পের ভাষায়, যে সমাজে আমরা ডিজিটাল প্রযুক্তির ওপর অন্ধের মতো নির্ভর করছি, সেখানে চরম বিপদের দিনে সংবাদ পাওয়ার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হয়ে উঠল ১৯৬০-এর দশকের পাইরেট রেডিও প্রযুক্তির মতো এক পুরোনো এফএম রেডিও স্টেশন।
ল্যাঙ্কাস্টারের এই ঘটনা আন্তর্জাতিক বেসামরিক জরুরি সংস্থাসমূহের চোখ খুলে দেয়। এটি কেবল একটি সাময়িক বিদ্যুৎ বিভ্রাট ছিল না; এটি ছিল এমন এক সংকটের মহড়া, যা রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও প্রকৌশলবিদ্যায় ‘ব্ল্যাক স্কাই ইভেন্ট’ নামে পরিচিত।
সহজ কথায়, ‘ব্ল্যাক স্কাই ইভেন্ট’ হলো এমন এক বিপর্যয় বা ব্ল্যাকআউট, যার কারণে কোনো দেশ বা বড় অঞ্চলের সম্পূর্ণ বিদ্যুৎ নেটওয়ার্ক, পরিবহন, ডিজিটাল যোগাযোগ ও সুপেয় পানির ব্যবস্থা টানা কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহের জন্য অচল হয়ে পড়ে।
জরুরি দুর্যোগ মোকাবিলা বিশ্লেষকদের মধ্যে একটি বহুল প্রচলিত বাক্য রয়েছে- আমরা নৈরাজ্য থেকে মাত্র ৯ বেলা খাবারের দূরত্বে আছি। অর্থাৎ, টানা তিন দিন খাবার বা সুপেয় পানির সরবরাহ না থাকলে যেকোনো আধুনিক ও সুশীল সমাজ এক মুহূর্তেই বিশৃঙ্খলা ও আইন অমান্যের আখড়ায় পরিণত হতে পারে।
যুক্তরাজ্য সরকারের প্রস্তুতি ও বিবিসির গোপন পরিকল্পনা: সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের জাতীয় সুরক্ষা সম্পর্কিত এক সম্মেলনে ব্ল্যাক স্কাই ইভেন্ট মোকাবিলায় ন্যূনতম ৭২ ঘণ্টা টিকে থাকার সক্ষমতা তৈরির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সরকার ইতোমধ্যেই সাধারণ মানুষকে প্রস্তুত রাখার প্রচারণার মাধ্যমে জরুরি পরিস্থিতিতে স্বনির্ভর থাকার পরামর্শ দিচ্ছে।
এমন পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্রিটেনের জাতীয় সম্প্রচার মাধ্যম ‘বিবিসি’ নিজেদের একটি অত্যন্ত গোপন ও বিশেষ 'ব্ল্যাক স্কাই পরিকল্পনা' তৈরি করেছে। এই পরিকল্পনার আওতায়:
- প্রায় ১০০ জন অভিজ্ঞ বিবিসির কর্মীকে নিয়ে একটি ‘জরুরি রেডিও স্টুডিও’ পরিচালনা করা হবে।
- এটি ইন্টারনেট বা ডিজিটাল সিগন্যালের ওপর নির্ভর করবে না। এই কেন্দ্রগুলোর নিজস্ব জ্বালানি, পানি ও খাবারের মজুদ থাকবে যেন বাইরের সাহায্য ছাড়া অন্তত তিন দিন অনায়াসে চালানো যায়।
- জেনারেটর চালানোর জন্য বিভিন্ন রেডিও ট্রান্সমিশন টাওয়ারে ৫,০০০ থেকে ৪০,০০০ লিটার পর্যন্ত ডিজেল মজুদ রাখা হয়েছে।
- যদি উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট ফোন অচল হয়ে পড়ে, তবে সাংবাদিকদের জন্য заранее নির্ধারিত প্রোটোকল ও নির্দিষ্ট স্থানে সশরীরে দেখা করার পয়েন্ট ঠিক করা আছে।
প্রশ্ন উঠতে পারে, স্মার্টফোনের যুগে কেন এই এফএম রেডিও? উত্তরটা সহজ, সাইবার হামলা বা সম্পূর্ণ ব্ল্যাকআউটেও এফএম রেডিও সিগন্যাল প্রায় সব জায়গায় সফলভাবে পৌঁছায় এবং ব্যাটারি চালিত রেডিও দিয়ে সহজেই শোনা যায়।
পানি ও স্যুয়ারেজ ব্যবস্থার ভয়াবহ ঝুঁকি: যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল প্রিপেয়ার্ডনেস কমিশনের প্রধান লর্ড হ্যারিস সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, বিদ্যুৎ যাওয়া মানে শুধু আলো নেভা নয়।
পানি সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি অচল হয়ে যাবে কারণ পাম্প চালাতে বিদ্যুৎ লাগে। আরও বড় বিপদ হলো নর্দমা বা স্যুয়ারেজ লাইনগুলো। পানি না চললে বর্জ্য জমে শক্ত হয়ে যাবে, পাইপ ব্লক হবে এবং উল্টো পথে সমস্ত মানববর্জ্য ড্রেন ও টয়লেট বেসিন দিয়ে ঘরে উঠে আসবে।
উল্টো পথে হাঁটছে পৃথিবী: ল্যাঙ্কাস্টারের শিক্ষা এবং ২০২৫ সালের এপ্রিলে স্পেন, পর্তুগাল ও ফ্রান্সে ঘটে যাওয়া ব্যাপক ব্ল্যাকআউটের পরও বিশ্বজুড়ে বিকল্প সিস্টেমগুলোকে দুর্ঘটনাবশত বাতিল করা হচ্ছে।
যেমন, যুক্তরাজ্যের শতবর্ষী তামার তারের অ্যানালগ ল্যান্ডলাইন নেটওয়ার্ক (যা বিদ্যুৎ ছাড়াই সরাসরি ক্যাবল থেকে পাওয়া পাওয়ারে চলত) ২০২৭ সালের জানুয়ারির মধ্যেই পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। ডিজিটাল ৪জি/৫জি নেটওয়ার্ক চালুর অজুহাতে ঐতিহ্যবাহী এফএম রেডিও বন্ধ করার প্রস্তাবও পর্যালোচনায় রয়েছে। জরুরি সেবা সংস্থগুলোকেও ডিজিটাল নেটওয়ার্কে স্থানান্তরিত করা হচ্ছে, যা মোবাইল টাওয়ার ডাউন হলে পুরো জরুরি সেবা অচল করে দিতে পারে।
অধ্যাপক কেম্প আক্ষেপ করে বলেন, ডিজিটাল যোগাযোগের দিকে আমরা যত দ্রুত এগোচ্ছি, বিপদের দিনের ব্যাকআপ বা বিকল্প পথ ততটাই ধ্বংস করছি। যদি বিদ্যুৎ না থাকে, তবে কীভাবে কথা বলবেন বা সংবাদ পাবেন, তা নিয়ে আসলেই কোনো গভীর চিন্তা করা হচ্ছে না।
আমাদের অতি-সংযুক্ত ডিজিটাল বিশ্ব যত বেশি প্রযুক্তিনির্ভর হচ্ছে, বিদ্যুৎ সংযোগ হঠাৎ বিচ্ছিন্ন হলে তার পরিণতি ততটাই ধ্বংসাত্মক হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে। আধুনিকতা ও দক্ষতার নামে যদি আমরা আমাদের মৌলিক ব্যাকআপ ব্যবস্থাগুলো হারিয়ে ফেলি, তবে একটি মাত্র বড় ধরনের বিদ্যুৎ বিপর্যয় পুরো মানবসভ্যতাকে চোখের পলকে আদিম যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স