রসালো আমের এমন অদ্ভুত সব নাম কেন?

চলে এসেছে মধু মাস জ্যৈষ্ঠ! আম-কাঁঠাল-লিচুর মতো রসালো আর মিষ্টি ফলের স্বাদ নেয়ার মৌসুম। এরিই মধ্যে ঘোষণা হয়ে গেছে দেশের বিভিন্ন এলাকার আমপঞ্জী। কিছু দিনের মধ্যেই বাজায় সয়লাব হয়ে যাবে নানা নামের নানা স্বাদ আম। যেমন তার গন্ধ, তেমন তার স্বাদ। আর নামগুলোও অদ্ভুত।

কিন্তু কখনও ভেবে দেখেছেন আমগুলোর নাম কেন এমন অদ্ভুত হলো? কোথা থেকে এলো এসব অদ্ভুত সব নাম, কে-ই বা দিলো আমের বিচিত্র সব নাম। হিমসাগর, লক্ষ্মণভোগ, গোপালভোগ, গোলাপখাস, ল্যাংড়া, ফজলি, আশ্বিনা, গুটি, চোষাসহ আরও কত কী নামে আম পাওয়া যায়, তার ইয়াত্তা নেই।

হিমসাগর গোটা উপমহাদেশে, বিশেষ করে বাংলায় একটি জনপ্রিয় ও বিখ্যাত আম। বাংলাদেশের রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও সাতক্ষীরা জেলাতেও এই আমের চাষ হয়। এই আমের মিষ্টি সুগন্ধ ও স্বাদ পৃথিবীর অন্যান্য আমের থেকে ভিন্ন। তাই সারা পৃথিবীতে স্বাদ ও গন্ধের জন্য এই আম বাণিজ্যিক ভাবে প্রচুর চাষ করা হয়।

হিমসাগরকে আমের রাজাও বলা হয়। এই আমের ভেতরের রং হলুদ-কমলা মিশেলে এবং কোন আঁশ নেই। প্রচুর পরিমাণে চাষের কারণেই এর নাম সম্ভবত সাগরের সঙ্গে মিলিয়ে রাখা হয়েছে। যদিও এর আদিঅন্ত খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে হিমসাগর খেলে কলিজা ঠাণ্ডা হয়ে যায় বলে আমপ্রেমীরা বলে থাকেন।

mango1

দুই বাংলায় আরেক জনপ্রিয় আম ল্যাংড়া। স্বাদে ও গন্ধে অতুলনীয়। এই আমি পাকা অবস্থায় মৌ মৌ গন্ধ ছড়াতে থাকে, অথচ সেই আমটির নামই ল্যাংড়া। জানা যায়, মুঘল আমলে এই আমটির চাষ বাংলাতে শুরু হলেও নাম পায়নি। পেয়েছে আঠারো শতকের দিকে, সেই কাহিনীও বড় অদ্ভুত।

ভারতের বিভিন্ন ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, আঠারো শতকের দিকে এক ফকির খুব সুস্বাদু এই আমের চাষ করেন। সেই ফকিরের পায়ে কিছু সমস্যা ছিল। সেই থেকেই নাকি ওই আমের নাম হয়ে যায় ‘ল্যাংড়া’। তবে সংশয়বাদীরা এই নিয়ে প্রশ্নও তুলেছেন, কারণ সেই ফকিরের নামটি জানা যায়নি বলে।

লক্ষ্মণভোগ আর গোপালভোগ আমের নামটি বেশি দিনের নয়। পশ্চিমবঙ্গের ইংরেজ বাজারের চণ্ডীপুরের বাসিন্দা লক্ষ্মণ একটি আম গাছ রোপণ করেন। স্বাদে-গন্ধে সেই আম ছিল তুলনাহীন। সেখান থেকেই নাম লক্ষ্মণভোগ। একই এলাকার নরহাট্টার গোপাল চাষির নামে আবার নাম হয় গোপালভোগের।

গন্ধের জন্য দারুণ বিখ্যাত গোলাপখাস। আর সেই গন্ধের সঙ্গে গোলাপ ফুলের মিষ্টি গন্ধের মিল খুঁজে পেয়ে ছিলেন এই দিকের আমপ্রেমীরা। ব্যাস, তাই আমটির নাম হয়ে গেলো গোলাপখাস। প্রাচীন বাংলার আমগুলো মধ্যে গোলাপখাস অন্যতম। এই আমের গায়ে গোলাপের রঙের লালচে আভাও থাকে।

mango2

চোষ বা চোষা আমও খুব জনপ্রিয়। গ্রাম বাংলার মানুষের কাছে এই আমটির বিশেষ কদর রয়েছে। এটি উচ্চ ফলনশীল জাতে আম, খুব বেশি মিষ্টি হয় না বলে দামেও অনেকটাই কম। খুঁটি বা যে কোনও ধারালো জিনিস দিয়ে আমের মাথাটি ফুটো করে চুষে খেয়েই এই আমের মজা। সে কারণেই এই আমের নাম চোষা।

চেহারায় ছোট ও গোলাকার আম খেয়ে সেই আঁটি নিজের বাগানে পুঁতেছিলেন মালদহের এক দরিদ্র কৃষক। সেই আঁটি থেকেই জন্ম নিয়েছিল আরেক ধরনের আমগাছ। কাঁচা অবস্থায় টক। কিন্তু পাকলে খুব মিষ্টি। আঁটি বা গুটি থেকে গাছটি জন্মায় বলে আমের নামও হয়ে যায় ‘গুটি’।

অনেকের বলেই আমের রাজা ফজলি। এর আকার এবং ভিন্ন স্বাদের কারণেই এমনটাই দাবি করেন রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ এলাকার মানুষরা। তবে ফজলি আমটি এসেছে পশ্চিমবঙ্গের মালদাহ জেলা থেকে। ১৮০০ সালে মালদহ জেলার কালেক্টর রাজভেনশ এই আমের নামকরণ করেন ‘ফজলি’।

কথিত আছে যে, ফজলি বিবি নামক এক প্রৌঢ়া বাস করতেন স্বাধীন সুলতানদের ধ্বংসপ্রাপ্ত গৌড়ের একটি প্রাচীন কুঠিতে। তাঁর বাড়ির উঠোনেই ছিলো একটি আমগাছ। ফজলি এই গাছটির খুব যত্ন নিতেন। এলাকার ফকির বা সন্ন্যাসীরা সেই আমের ভাগ পেতেন।

কালেক্টর সাহেব একবার ফজলি বিবির কুঠিরের কাছে ঘাঁটি করেন। তার আগমনের খবর পেয়ে ফজলি বিবি সেই আম নিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করেন। রাজভেনশ সেই আম খেয়ে খুবই তৃপ্ত হন। জানতে চান, সেই নামের নাম। কিন্তু ইংরেজি না বুঝে নিজের নাম বলে দেন ফজলি বিবি। সেই থেকেই এই আমের নাম হয় ‘ফজলি’।

mango3

অন্যদিকে আম মৌসুমের একবারে শেষ দিকে, অর্থাৎ আশ্বিন মাসে বাজারে আসে বলে তাকে ‘আশ্বিনা বলে চেনে বাংলা। প্রায় আগস্ট মাস পর্যন্ত বাজারে এই আম পাওয়া যায়। তবে এই আমটি দেখতে বড়সড় হলেও এর চাহিদা খুব বেশি হয় না। তবে আমের নাম যেমনই হোক না কেন, আমকেই ফলের রাজা মানেই সবাই।